হলের সিট দখল ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) ছাত্রলীগের দুপক্ষের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। গত শনিবার রাত সাড়ে ১২টা থেকে শুরু হয়ে গতকাল রবিবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত এই সংঘর্ষ চলে। এতে ছাত্রলীগের কমপক্ষে সাত নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। এছাড়া সংগঠনটির দুই কর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। সংঘর্ষে নিজেদের পক্ষের এক নেতাকে মারধরের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ সভাপতির পদত্যাগ দাবি করে ক্যাম্পাসে অনির্দিষ্টকালের জন্য অবরোধের ডাক দিয়েছে ছাত্রলীগের একাংশ।
অবরোধের অংশ হিসেবে গতকাল সকালে চট্টগ্রামের বটতলী স্টেশনে বিশ্ববিদ্যালয়গামী দুটি শাটল ট্রেনের সব হোসপাইপ কেটে ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেয় একদল যুবক। এছাড়া একটি ট্রেনের চালককেও অপহরণ করে তারা। এর আগে ভোরে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন পুলে থাকা বাসের চাকার হাওয়া ছেড়ে এবং তালায় সুপারগ্লু লাগিয়ে দেওয়ায় সকাল থেকে সব বাস চলাচলও বন্ধ হয়ে যায়। শাটল ট্রেন চলাচল ও শিক্ষক বাস চলাচল বন্ধ থাকায় কার্যত অচল হয়ে পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম। বর্তমানে ক্যাম্পাসজুড়ে থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে। এর আগে শনিবার রাত সাড়ে ১২টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সোহরাওয়ার্দী হল থেকে সংঘর্ষের সূচনা হয়। সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়া ছাত্রলীগের বিবদমান দুটি পক্ষ বিজয় ও সিএফসি গ্রুপ দুটি শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের অনুসারী হিসেবে ক্যাম্পাসে পরিচিত।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, এ সংঘর্ষে আহত হন শাখা ছাত্রলীগের সাত নেতাকর্মী। তারা হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ছাত্র ও শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ ইলিয়াছ, পরিসংখ্যান বিভাগের ছাত্র ও শাখা ছাত্রলীগের সাবেক ক্রীড়া সম্পাদক মাহফুজ আহমেদ, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ওবায়দুর রহমান লিমন, লোকপ্রশাসন বিভাগের নিলয় হাসান এবং ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের প্রিয়াম রায় প্রান্ত, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শোয়েবুর রহমান কনক এবং প্রাণিবিদ্যা বিভাগের জাহিদুল হাসান।
এদিকে সংঘর্ষ চলাকালে সিএনজি অটোরিকশায় পাথর নিয়ে যাওয়ার সময় দুই ছাত্রলীগ কর্মীকে আটক করে পুলিশ। তারা হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের ফারদিন রহমান এবং ইতিহাস বিভাগের মোখলেছুর রহমান।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কিছুদিন আগে সোহরাওয়ার্দী হলে সিএফসি গ্রুপের কর্মীদের রুম দখলে নেয় বিজয় গ্রুপের কর্মীরা। এ সময় তারা হল থেকে বিতাড়িত হয়। পরে শনিবার মধ্যরাতে সিএফসি গ্রুপের কর্মীরা তাদের রুম ফের দখলে নিলে দুই গ্রুপ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে বিজয় গ্রুপকে সোহরাওয়ার্দী হল থেকে বিতাড়িত করে আলাওল হলের দিকে ধাওয়া দেয় সিএফসি গ্রুপ। এরপর দুপক্ষের মধ্যে থেমে থেমে ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। পরে বিজয় কর্মীরা রবিবার দুপুর ১টার দিকে সোহরাওয়ার্দী হলের দিকে গেলে আবারও দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। এ সময় দুই গ্রুপ ইটপাটকেল নিক্ষেপসহ ধারালো অস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।
এদিকে শাটল ট্রেন ও শিক্ষক বাস বন্ধ থাকায় অনেক শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের আসতে পারেননি। ফলে অনেক বিভাগে পূর্বনির্ধারিত ক্লাস ও পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি। আবার অনেক বিভাগে পরীক্ষা থাকায় শিক্ষার্থীরা অতিরিক্ত টাকা ব্যয় করে বাসে বা সিএনজিতে করে ক্যাম্পাসে আসতে চরম ভোগান্তিতে পড়েন।
চট্টগ্রামের ষোলশহর স্টেশন মাস্টার জাফরুল্লাহ মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শাটল ট্রেনের চালক অপহরণ এবং ট্রেনের হোসপাইপ কেটে দেওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়গামী ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ট্রেন চলাচল শুরু হবে।’
সংঘর্ষের ব্যাপারে জানতে চাইলে বিজয় গ্রুপের নেতা ও শাখা ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক এইচ এম তারেকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি রেজাউল হক রুবেলের নির্দেশে আমাদের নেতাকর্মীদের ওপর অতর্কিত হামলা চালানো হয়। আমরা এ হামলার সুষ্ঠু বিচার দাবি করছি এবং দ্রুত তাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করার জন্য কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের কাছে দাবি জানাচ্ছি। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত অনির্দিষ্টকালের অবরোধ চলবে।’
অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি রেজাউল হক রুবেল বলেন, ‘বিজয় গ্রুপের নেতা ইলিয়াস হিযবুত তাহরীরের সঙ্গে যুক্ত এবং কিছুদিন আগে শাটল ট্রেনে পোস্টার লাগানোর কাজে যুক্ত ছিলেন। তিনি বিভিন্ন সময় অস্ত্র ঠেকিয়ে নেতাকর্মীদের হুমকি-ধামকি দিতেন। তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত না। তাকে দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানাচ্ছি।’
হাটহাজারী মডেল থানার ওসি বেলালউদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ছাত্রলীগের দুপক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ সময় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুজনকে আটক করা হয়েছে। তবে বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর (ভারপ্রাপ্ত) প্রণব মিত্র চৌধুরী বলেন, ‘আমরা দুই গ্রুপের নেতাদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করছি। আশা করি দ্রুত পরিবেশ ঠিক হয়ে যাবে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে শাটল ট্রেন চলাচলও শুরু হবে।’
