দিনের পর দিন ক্ষুধার জ্বালায় কাতরাচ্ছে ইয়েমেনের অসংখ্য নিরীহ মানুষ। এদের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় আছে দেশটির শিশুরা। বিগত চার বছরের গৃহযুদ্ধ সেখানে এমন পরিস্থিতি ডেকে এনেছে। ইয়েমেনের বর্তমান পরিস্থিতি এবং এর নেপথ্য কারণ নিয়ে লিখেছেন এস এম সোহাগ
বর্তমানের ভয়াবহ চিত্র
ক্ষুধার তাড়নায় জীর্ণ, ভঙ্গুর শরীর নিয়ে খাটের ওপর শুয়ে আছে মাত্র তিন বছর বয়সী আব্দো সালেহ। কথা বলা কিংবা হাঁটার কোনো শক্তি তার নেই। কাঠির মতো হাত-পা, মুখখানা যেন কঙ্কালসার। চলতি শতকের অভিশপ্ত ইয়েমেনের লাখো শিশুর প্রতিচ্ছবি এই আব্দো, যার ওজন মাত্র পাঁচ কেজি। গত বছর ডিসেম্বরে জাতিসংঘের সাহায্য সংস্থার অনুমান অনুযায়ী, ইয়েমেনের প্রায় দুই কোটি মানুষ দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে। ইরান সমর্থিত হুথি বনাম মার্কিন সমর্থিত সৌদি-আমিরাত জোটের সংঘাতে মধ্যপ্রাচ্যের দরিদ্র এই দেশটি চলমান বিশ্বে মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষের সবচেয়ে কাছে, যার মারাত্মক শিকার দেশটির শিশুরা। প্রায় চার বছরের যুদ্ধে দেশটি এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। নেই যথেষ্ট খাবারের মজুদ, দেশটির দুই-তৃতীয়াংশ নাগরিকই রয়েছে খাদ্যাভাবে। খাদ্যের অপ্রতুলতাই এ ক্ষেত্রে একমাত্র দায়ী নয়, দ্রব্যমূল্যই কারণ, খাদ্য সেখানে সামর্থ্যরে ঊর্ধ্বে। আমদানি নিষেধাজ্ঞার ফলে সেখানে খাদ্যপণ্যের মূল্য নাগালের বাইরে চলে গেছে, জ্বালানি ঘাটতির কারণে পরিবহনব্যয় আকাশছোঁয়া, মুদ্রাস্ফীতি ভয়াবহ আকার নিয়েছে এবং মানবসৃষ্ট প্রতিবন্ধকতা খাদ্য পরিবহনেও বিঘœ সৃষ্টি করছে।
সৌদি জোটের আরোপিত অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা দেশটিতে এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে, জাতিসংঘ যাকে বিশ্বের সবচেয়ের ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় বলে স্বীকার করেছে। গত বছর ইয়েমেনে ক্ষুধার মাত্রা নাটকীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সাহায্য সংস্থার এক জোট জানায়, আগের তুলনায় দেশটির ৬০ শতাংশের অধিক জেলায় জরুরি অবস্থার মতো পরিস্থিতি বিদ্যমান।
অবস্থা এমন শোচনীয় আকার ধারণ করেছে, বিশ্ব ইয়েমেনের দিকে দৃষ্টি দেওয়ার পরও বহু ইয়েমেনি সহায়তার বাইরেই থেকে যাবে। দেশটির প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এবং প্রতিদ্বন্দ্বী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর চলমান সহিংস হুমকি, দাতব্য সংস্থাগুলোর পক্ষে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়াকে ভয়ংকর করে তুলেছে। সৌদি সমর্থিত ইয়েমেন সরকার নিজে এতটাই ভঙ্গুর যে, অবস্থার উন্নতিতে এর পক্ষে প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত অসম্ভব।
বোমা আর মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে লড়াই
মার্কিন প্রভাবশালী গণমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টের কাছে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির সিনিয়র আঞ্চলিক মুখপাত্র আবির ইতেফার বলেন, ‘আজ অনেক ইয়েমেনিই দুটি যুদ্ধের মুখোমুখির কথা বলছে। প্রথম যুদ্ধটি আকাশ থেকে আসা (সৌদি জোটের বিমান হামলা), কখনো কখনো এটি তাদের জীবন কেড়ে নেয়, আবার কখনো তা তাদের ওপর প্রভাব ফেলে না। দ্বিতীয় যুদ্ধটি মুদ্রাস্ফীতির লড়াই, যা তাদের জীবনকে প্রতিদিন প্রভাবিত করে যাচ্ছে।’
সাহায্য সংস্থাগুলোর মতে, ইয়েমেনে যারা তুলনামূলক সম্পদশালী, তারা কিছুটা ভাগ্যবান। তবে, যারা গরিব তাদের জন্য জীবন সেখানে এক নরকযন্ত্রণা। ন্যূনতম প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবাও তারা পায় না। এমনকি হাসপাতালে পৌঁছানোর যাতায়াত খরচ চালানোর সামর্থ্যই অধিকাংশ পরিবারের নেই। অভাব ইয়েমেনি বাবা-মাকে এক ভয়াবহ যুদ্ধে জড়িয়েছে, তাদের প্রায়ই এমন কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়, যা যেকোনো বাবা-মার কাছে অভিশাপতুল্য। অসুস্থ সন্তানকে খাবার দেওয়ার পরিবর্তে সুস্থ সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার মতো নির্মমতায় বাধ্য হয় তারা।
আব্দোর জীবন এখন এক অনিশ্চয়তায় ঝুলছে। যদি কোনো চিকিৎসাকর্মী তাদের গ্রামে যান, কিংবা জেলার একমাত্র শিশু হাসপাতালের কোনো সেবিকা যদি স্বেচ্ছায় তার গ্রাম সফর করেন, তাহলে হয়তো শিশুটা বাঁচবে, যা প্রায় অনিশ্চিত। আব্দোর বাবা তার ছেলেকে বাঁচানোর সব আশা ছেড়ে দিয়ে এখন ‘সৃষ্টিকর্তার ভাগ্য পরিবর্তনের অপেক্ষায়’ আছেন। বাবা হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারছেন না দেখে আব্দোর মা ঘর ছেড়ে চলে গেছেন।
ইয়েমেন জুড়ে অতি সাধারণ দৃশ্য এসব। ২০১৮ সালের শিশুদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন সেইভ দ্য চিলড্রেন এক প্রতিবেদনে ক্ষুধার তাড়নায় দেশটিতে ইতিমধ্যেই ৮৫ হাজার শিশুমৃত্যুর কথা জানায়। বিদ্রোহী অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে অপুষ্টিজনিত রোগে প্রতিনিয়তই হাজার হাজার শিশু মারা যাচ্ছে। দেশটিতে যুদ্ধের শুরু থেকে খাদ্যপণ্যের মূল্য গড়ে ১৩৭ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
খাদ্যঝুঁকিতে ২ কোটি মানুষ
সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট তাদের এক প্রতিবেদনে জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফ এবং ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম (ডব্লিউএফপি) ও জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএওও) একটি যৌথ বিবৃতির কথা তুলে ধরে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘এ মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে মানবিক সংকটের নাম ইয়েমেন, যেখানে প্রায় দুই কোটি মানুষ খাদ্যঝুঁকিতে।’ ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্ল্যাসিফিকেশনের (আইপিসি) একটি খাদ্য সুরক্ষা সমীক্ষায় এক বিশ্লেষককে উদ্ধৃত করে জানানো হয়, ‘ইতিমধ্যেই ইয়েমেনে প্রতিদিন ১ কোটি ৫৯ লাখ মানুষ ক্ষুধা নিয়ে জেগে থাকে।’
কোনো দেশে দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করা হবে কি না, তা নির্ধারণকারী সংগঠন আইপিসি জানায়, ইয়েমেনের জনসংখ্যার প্রায় ৬৭ শতাংশ ‘চরম খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায়’ রয়েছে। আইপিসির এমন মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় জাতিসংঘের ইয়েমেন মানবাধিকার সমন্বয়ক লিসে গ্রান্দে বলেন, ‘আইপিসি যা বলছে তা উদ্বেগজনক।’
ডব্লিউএফপির প্রধান ডেভিড বেজলি বিশ্লেষণটিকে উদ্বেগের চূড়ান্ত সতর্কতা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘লাখ লাখ ইয়েমেনিকে উদ্ধার করতে আমাদের ব্যাপক সহায়তা বৃদ্ধি এবং ইয়েমেনের সব অঞ্চলে টেকসই প্রবেশের সুযোগ প্রয়োজন। যদি আমরা তা না করি, তাহলে ক্ষুধার বলি হয়ে ইয়েমেনের একটি সম্পূর্ণ প্রজন্মই হারিয়ে যাবে।’
কীভাবে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে
এই মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টির পেছনে বিশ্বের কিছু মানুষেরই হাত রয়েছে। ইয়েমেনের সংঘাতের পেছনে বিশ্বের দুই শক্তির বৈরিতাই দায়ী। সাম্রাজ্যবাদ, ক্ষমতা, নিয়ন্ত্রণ আর প্রভাব
বিস্তারকে কেন্দ্র করে শক্তিশালী দেশগুলোর লড়াইয়ে বলি হচ্ছে ইয়েমেনের মতো দরিদ্র আরব দেশগুলো। আরব বসন্তেই ইয়েমেন সংকটের শুরুটা রচিত হয়েছিল।
দীর্ঘদিন গৃহযুদ্ধে জড়িত আরব বিশ্বের সবচেয়ে গরিব এই দেশটিতে আরব বসন্ত সুদিন নিয়ে আসবে বলে ধারণা করা হলেও, ঘটেছে ঠিক তার উল্টো। বিবিসি নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশটির দীর্ঘদিনের প্রেসিডেন্ট আলি আবদুল্লাহ সালেহকে ২০১১ সালে তার ডেপুটি আবদারাবুহ মানসুর হাদির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে বাধ্য করা হয়। প্রেসিডেন্ট হাদিকে অনেকগুলো সংকটের মুখোমুখি হতে হয় তখন। আল-কায়েদার হামলা, দক্ষিণে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন, জিহাদি আন্দোলন, সালেহের প্রতি অনেক সামরিক কর্মকর্তার আনুগত্য। এর বাইরে দুর্নীতি, বেকারত্ব আর খাদ্য সংকট তো আছেই।
নতুন প্রেসিডেন্টের দুর্বলতার সুযোগে ইয়েমেনের সংখ্যালঘু যাইডি শিয়া মুসলিম নেতৃত্বের হুথি আন্দোলনের কর্মীরা কয়েক দশকের লড়াই করার পর অবশেষে সাডা প্রদেশ এবং আশপাশের এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। ২০১৪ সালের শেষদিকে দেশটির অনেক সুন্নিও তাদের সমর্থন করে, বিদ্রোহীরা ২০১৫ সালেই সানা অঞ্চলেরও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়।
সাবেক প্রেসিডেন্ট সালেহের প্রতি অনুগত হুথি আর নিরাপত্তা বাহিনীগুলো পুরো দেশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করে। তাদের পেছনে ইরান সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে বলে পশ্চিমা বিশ্ব ও সৌদি জোটের ধারণা। ২০১৫ সালের মার্চে দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দর এডেন থেকে পালিয়ে যান প্রেসিডেন্ট হাদি।
তবে, হাদিকে ফের ইয়েমেনে ক্ষমতায় আনতে সৌদি আরব আর অন্য আটটি সুন্নি দেশ এক জোট হয়ে ইয়েমেনে বিমান অভিযান শুরু করে। এই জোটকে লজিস্টিক আর ইন্টেলিজেন্স সহায়তা দেয় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য আর ফ্রান্স। হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে ইয়েমেন সরকার, সৌদি-আমিরাত জোটের যুদ্ধে দুই পক্ষকেই পর্যুদস্ত করে তুলেছে, একটি যুদ্ধবিরতির জন্য জাতিসংঘের তিনটি সংস্থার চেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছে। চার মাসের লড়াইয়ের পর সরকারপন্থি বাহিনী এবং দক্ষিণাঞ্চলের সুন্নি উপজাতীয় গোত্রগুলো বিদ্রোহীদের এডেনে আসা ঠেকিয়ে দিয়েছিল।
প্রেসিডেন্ট হাদি নির্বাসনে থাকলেও, তার সরকার অস্থায়ীভাবে এডেনে কার্যক্রম শুরু করে। তবে, হুথিরা সানা এবং তিয়াজে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে এবং সেখান থেকেই সৌদি আরবে মর্টার আর মিসাইল ছুড়ে মারছে। আর দুই পক্ষের এই বিরোধের সুযোগ নিচ্ছে আল-কায়েদা ইন দি আরব পেনিনসুলা আর ইসলামিক স্টেট জঙ্গিগোষ্ঠী। তারা দক্ষিণে বেশ কিছু স্থান দখল করে নিয়েছে।
২০১৭ সালের নভেম্বরে রিয়াদে ইয়েমেনের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর দেশটির চারদিকে অবরোধ জোরালো করে সৌদি আরব। জাতিসংঘ এই অবরোধকে দেশটিতে কয়েক দশকের সবচেয়ে বড় দুর্ভিক্ষ সৃষ্টির কারণ বলে ঘোষণা দেয়। জোট এই অবরোধকে বিদ্রোহীদের কাছে অস্ত্র সরবরাহের পথ বন্ধের উপায় বলে দাবি করে এবং হুথিদের কাছে অস্ত্র সরবরাহের জন্য তেহরানকে অভিযুক্ত করে। ইরান বরাবর এমন অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
২০১৮ সালের জুনে জোটবিদ্রোহী অধিষ্ঠিত লোহিত সমুদ্রের বন্দরনগরী হোদাইদাহতে একটি মারাত্মক আক্রমণাত্মক অভিযান পরিচালনা করে। বন্দরটি ইয়েমেনের জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের প্রধান লাইফলাইন হিসেবে ব্যবহৃত হয়। জাতিসংঘ আগেই এই বন্দর সম্পর্কে সতর্ক করে এসেছে, বন্দরটির যেকোনো ধরনের ক্ষতি বা অচলাবস্থা বিপর্যয় ডেকে আনবে।
একই বছর ডিসেম্বরে, সরকার এবং হুথি প্রতিনিধিরা হোদাইদাহ শহর ও বন্দরের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিলেন এবং চলতি বছর জানুয়ারির মাঝামাঝি নাগাদ তাদের স্ব-স্ব বাহিনীকে সরিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন। তবে, কোনো পক্ষের সরে আসা শুরু না হওয়াতে চুক্তিটি ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা বেড়েছে। চলতি বছর জুলাই-আগস্টেও হুথিরা সৌদির একাধিক বিমানবন্দর ও তেলক্ষেত্রকে লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।
হুথি আর সালেহ একটি জোট গঠন করলেও সেখানে এর মধ্যেই ফাটল দেখা দিয়েছে। ২০১৭ সালের নভেম্বরে সানার বড় একটি মসজিদের নিয়ন্ত্রণ নেওয়াকে কেন্দ্র করে একটি সশস্ত্র লড়াই হয়, যাতে বহু মানুষ হতাহত হয়। সালেহ তখন সৌদি আরবকে অবরোধ তুলে নিয়ে ইয়েমেনে হামলা বন্ধ করার প্রস্তাব দেন। এদিকে, হুথিরা পাল্টা জবাবে তার বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের অভিযোগ এনে বলে, তিনি এই জোটে কখনোই বিশ্বাস করতেন না। এরপর হুথিরা সানায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার অভিযান শুরু করে এবং ২০১৭ সালের ৪ ডিসেম্বর সালেহ রাজধানী থেকে পালানোর সময় নিহত হয়েছেন বলে তারা ঘোষণা দেয়।
এর সপ্তাহখানেক পর, সরকারি বাহিনীর মধ্যেও লড়াই বেঁধে যায়। বিচ্ছিন্নতাবাদীরা দক্ষিণ ইয়েমেনের স্বাধীনতা দাবি করে। ১৯৯০ সালে উত্তরের সঙ্গে দক্ষিণের যে ইউনিয়ন তৈরি হয়, সেটি ভেঙে আলাদা একটি রাষ্ট্র গঠন করার দাবি জানায় তারা। এ নিয়ে হাদির পক্ষের সৈন্যদের সঙ্গে তাদের বিরোধ তৈরি হয়।
তবে, ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে দক্ষিণের অন্তর্বর্তী কাউন্সিল (এসটিসি) নামে পরিচিত বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে হাদি সরকারকে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার জন্য অভিযুক্ত এবং প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে অপসারণের দাবি জানিয়েছিল। বিচ্ছিন্নতাবাদীরা এডেনের সরকারি দপ্তর আর সামরিক ঘাঁটিগুলোর নিয়ন্ত্রণও নিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। ফলে, এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, যা সৌদি জোটের মধ্যেও জটিলতার তৈরি করেছে। কারণ, সৌদি আরব হাদিকে সমর্থন করছে, অন্যদিকে জোটের শরিক সংযুক্ত আরব আমিরাত সমর্থন করছে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের।
আলোচনায় সৌদি যুবরাজ সালমান
ইয়েমেন বৈশ্বিক রাজনীতির এমন এক কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে, যেখানে ইয়েমেনিরা দলে দলে প্রাণ হারাচ্ছে। প্রায় চার বছরের দীর্ঘ এই যুদ্ধে এরই মধ্যে ১০ হাজারের বেশি মানুষের প্রাণ গেছে, আহত হয়েছে ৫৫ হাজারের বেশি ইয়েমেনি। যাদের অধিকাংশই বেসামরিক নাগরিক, সৌদি-আমিরাত জোটের বিমান হামলাই এর পেছনের মূল কারণ। যদিও, জোট বরাবর বেসামরিকদের লক্ষ না করার দাবি জানিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন এজেন্ডা বাস্তবায়ন ও প্রতিদ্বন্দ্বী ইরানের বিরুদ্ধের এই লড়াই ইয়েমেনের জন্য এক অভিশাপ বয়ে এনেছে।
ইয়েমেন বিপর্যয়ের ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অনেকেই পর্দার পেছনের খেলোয়াড় বলেছে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ইয়েমেনে ইরানি ভীতি ভেঙে দেওয়ার পেছনে মার্কিন দৃষ্টিভঙ্গিতেই লড়াই করছে জোট, আর তার নেতৃত্ব দিচ্ছে যুবরাজ সালমান। ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়, সমালোচকদের মতে ইয়েমেন সংকটের মূলে সৌদি আরবের ডি ফ্যাক্টো নেতা, ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান জড়িত। ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ইয়েমেনে বেপরোয়া উপায়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
বৈশ্বিক নেতারা এবং সংস্থাগুলো ইয়েমেন সংকটে যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করে এলেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তা অস্বীকার করে আসছেন। যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ইয়েমেনিদের বিপর্যয়ের কারণ, এমন সংবাদ বিশ্বে জোরালো প্রতিবাদ গড়ে তুললে, মার্কিন সিনেটে সৌদি জোটের পক্ষে মার্কিন সমর্থন শেষ করতে ভোটের আয়োজন করে। মার্কিন অস্ত্রের প্রধান সারির আমদানিকারক দেশ সৌদি। ট্রাম্পের সঙ্গে একাধিক অস্ত্রচুক্তিও করেছে দেশটি। যাকে সমালোচকরা মার্কিন মুখ বন্ধে সৌদির কৌশল বলেও মন্তব্য করেছে।
ইয়েমেনের দুর্ভিক্ষের জন্য তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নামটিও চলে আসে। দায় যে পক্ষেরই হোক, ক্ষুধার তাড়নায় মানবশিশুরা রোজ যুক্ত হচ্ছে মৃত্যুর মিছিলে, এই অভিশাপ থেকে মুক্তি আবশ্যক।
ইয়েমেনের হাসপাতালগুলোর বিছানায় শুয়ে আছে হাজার হাজার আব্দো, যাদের মুখে কোনো খাবার তুলে দিতে পারছে না পরিবার। হাসপাতালে হঠাৎ এক দিন আব্দোর মা এসে হাজির হয়, মাকে দেখে আব্দোর মুখে হাসি ফুটে ওঠে, দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে থাকা জাতির কাছে এতটুকু হাসিই যেন ক্ষুধা থেকে মুক্তির উপায়।
