২০০৯ সাল থেকে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির চলতি মূল্যে সবার শীর্ষে উঠে এসেছে বাংলাদেশের নাম। এই ১০ বছরে চলতি মূল্যে বাংলাদেশের জিডিপির আকার বেড়েছে ১৮৮ শতাংশ। তবে গত পাঁচ বছরের জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে শীর্ষস্থান ধরে রাখতে পারেনি বাংলাদেশ। এ তালিকায় বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে গেছে আয়ারল্যান্ড, আফ্রিকার দেশ ইথিওপিয়া ও পাশের দেশ ভারত।
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থা স্পেক্টেটর ইনডেক্সের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। তাতে জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে এগিয়ে থাকা বাংলাদেশের তিন কোটিরও বেশি মানুষ এখনো দৈনিক ১৬০ টাকার কম আয় করে জীবিকা নির্বাহ করছেন বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। দেশের ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য যে প্রকট হচ্ছে, তা বুঝা যায় দেশের সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ মানুষের হাতে মোট সম্পদের ২৬ দশমিক ৮ শতাংশ থাকার তথ্যে।
গতকাল সোমবার সচিবালয়ে স্পেক্টেটর ইনডেক্সের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে ১০ বছরে চলতি মূল্যে জিডিপিতে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি বিশ্বে সবার ওপরে বলে জানান অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। মন্ত্রী বলেন, বিশ্বের ২৬টি শীর্ষ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী দেশের তথ্যের ভিত্তিতে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে স্পেক্টেটর ইনডেক্স। যেখানে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ১৮৮ শতাংশ।
অন্যান্য দেশের মধ্যে চীন ১৭৭, ভারত ১১৭, ইন্দোনেশিয়া ৯০, মালয়েশিয়া ৭৮, অস্ট্রেলিয়া ৪১ এবং ব্রাজিল ১৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, গত ২৯ আগস্ট সংস্থাটি এ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
এ অর্জনের জন্য অর্থমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে। শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে চলমান অগ্রগতির ধারা অব্যাহত থাকলে খুব সহসাই বাংলাদেশ বিশ্ব অর্থনীতিতে আরও জোরালো দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।
অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের এ অগ্রগতি ধরে রাখার জন্য প্রধানমন্ত্রী সবাইকে বিশেষভাবে নির্দেশনা দিয়েছেন। অর্থনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী অর্জনের মাধ্যমে অচিরেই বাংলাদেশ তার অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জন করে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা বিনির্মাণ করবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
স্পেক্টেটর ইনডেক্সের ফেইসবুক পেজে গত ২ জুলাই ২৬টি দেশের ১০ বছরের প্রবৃদ্ধির হারের ছক প্রকাশ করা হয়েছে। ৭ ও ৮ জুলাই পাঁচ বছরের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কোন দেশের ১০ শতাংশ ধনীর হাতে ওই দেশের আয়ের কত অংশ রয়েছে এবং দৈনিক ২ ডলারের কম আয়ে কোন দেশের জনসংখ্যার কত শতাংশ জীবিকা নির্বাহ করছে, সে বিষয়েও তথ্য প্রকাশ করেছে।
এসব প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০০৯ সাল থেকে ১০ বছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জনে বাংলাদেশ শীর্ষে থাকলেও এর মধ্যে পরের পাঁচ বছরে বাংলাদেশকে টপকে গেছে আয়ারল্যান্ড, ইথিওপিয়া ও ভারত। গত তিন-চার বছর ধরেই দেশ তিনটি বাংলাদেশের চেয়ে উচ্চহারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করায় এটি সম্ভব হয়েছে। গত পাঁচ বছরে ৬৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে সবার ওপরে উঠে গেছে আয়ারল্যান্ড। ৬৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ইথিওপিয়া। ৫৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে ভারত রয়েছে তৃতীয় স্থানে। আর ৫৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে চতুর্থ স্থানে জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশ।
এই সময়ে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীনের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪৯ শতাংশ, মালয়েশিয়ার ৩৭ শতাংশ ও পাকিস্তানের ৩৪ শতাংশ।
দৈনিক ১ দশমিক ৯ ডলার বা প্রায় ১৬০ টাকা আয় করে জীবিকা নির্বাহ করেন এমন জনসংখ্যার হারের বিবেচনায় ২৪ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ চতুর্থ। নাইজেরিয়ার ৫৩ দশমিক ৫ শতাংশ এ কাতারে রয়েছে। দৈনিক ২ ডলারের কম আয় এমন জনগোষ্ঠী ইথিওপিয়ার মোট জনসংখ্যার ২৭ দশমিক ৩ শতাংশ। আর ভারতের ২১ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ দৈনিক ১ দশমিক ৯ ডলারে জীবন পার করে। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ এ কাতারে রয়েছে বলে স্পেক্টেটর ইনডেক্স জানিয়েছেন। তবে পাকিস্তানে এ ধরনের জনগোষ্ঠী দেশটির মোট জনসংখ্যার ৩ দশমিক ৯ শতাংশ ও চীনে দশমিক ৭ শতাংশ।
দেশগুলোর সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশের হাতে দেশগুলোর মোট আয়ের কী পরিমাণ রয়েছে তা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।
তাতে দেখা গেছে, বাংলাদেশের সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ মানুষের হাতে রয়েছে দেশের মোট আয়ের ২৬ দশমিক ৮ শতাংশ। পাকিস্তানের ১০ শতাংশ ধনীর হাতে রয়েছে দেশটির আয়ের ২৮ দশমিক ৯ শতাংশ। দেশওয়ারি সবচেয়ে বেশি সম্পদের মালিক দক্ষিণ আফ্রিকার ধনীরা। দেশটির ১০ শতাংম ধনীর হাতে রয়েছে মোট আয়ের ৫০ শতাংশেরও বেশি। ব্রাজিলে এটি প্রায় ৪২ শতাংশ ও চীনে ২৯ দশমিক ৪ শতাংশ।
১৯৮০ সালের পর থেকে বিভিন্ন দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৩৯ বছরে বাংলাদেশের জনসংখ্যা বেড়েছে ১০১ শতাংশ। এই সময়ে সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যা বেড়েছে সৌদি আরবের, ২৬৩ শতাংশ। পরের অবস্থানগুলোতে রয়েছে নাইজেরিয়া ও ইথিওপিয়া। পাকিস্তানের জনসংখ্যা এই সময়ে ১৫৪ শতাংশ বাড়লেও ভারতের বেড়েছে ৯৭ শতাংশ। এক সন্তান নীতির কারণে এই সময়ে চীনের সংখ্যা বেড়েছে মোটে ৪১ শতাংশ।
