দেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা যাতে মোবাইল ফোনের সুবিধা না পায়, সেজন্য দেশের সব মোবাইল অপারেটরকে ‘জরুরি’ নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা (বিটিআরসি)। সংস্থাটি অপারেটরগুলোকে আগামী সাত দিনের মধ্যে এ নির্দেশ কার্যকর করতে বলেছে। গত রবিবার বিটিআরসির পক্ষ থেকে সব অপারেটরকে চিঠি দিয়ে এ নির্দেশ জানিয়ে দিয়েছে।
এর আগে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বিটিআরসিকে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে বিটিআরসিকে নির্দেশ দেন।
এ ব্যাপারে বিটিআরসির সিনিয়র সহকারী পরিচালক (মিডিয়া) মো. জাকির হোসেন খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশের সব অপারেটরকে গত রবিবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। রোহিঙ্গাদের মোবাইল ফোনের সুবিধা বন্ধের ক্ষমতা অপারেটরদের আছে। সবকিছু মিলে তারা কীভাবে বন্ধ করবে সেটা তাদের ব্যাপার। তবে বন্ধ করতে হবে। কারণ এটা সরকারি নির্দেশ।
এ ব্যাপারে অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশ (অ্যামটব) মহাসচিব ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এস এম ফরহাদ (অব.) গতকাল এক বিবৃতি দিয়েছেন। সেখানে তিনি বলেন, মোবাইল অপারেটররা সবসময়ই বিটিআরসির নির্দেশনা মেনে চলে। এ ব্যাপারে তারা নিজেদের আয়ত্তের মধ্যে সম্ভব যথাযথ পদক্ষেপ নেবে। এখানে আরও বলা দরকার যে, এনআইডি ডেটাবেজের সঙ্গে বায়োমেট্রিক নিশ্চিতকরণের পরই শুধু মোবাইল সিম সক্রিয় করা যায়।
তবে গতকাল রাত পর্যন্ত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মোবাইলের ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞার কোনো কাগজপত্র হাতে পাওয়া যায়নি বলে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ইকবাল হোসেন দেশ রূপান্তরের কক্সবাজার প্রতিনিধিকে জানিয়েছেন। এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, বিষয়টি বিটিআরসির কাজ। তারা পুলিশের সহযোগিতা চাইলে অবশ্যই করা হবে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মোবাইল ব্যবহার বন্ধ জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ মোবাইলের কারণে ক্যাম্পে অপরাধ বেড়ে যেতে পারে।
বিটিআরসির কর্মকর্তারা বলেন, দেশে মোবাইল ফোনের অনিবন্ধিত সিম বিক্রি বেআইনি। মোবাইল সিম নিবন্ধনের জন্য প্রয়োজন হয় জাতীয় পরিচয়পত্র। নির্বাচন কমিশনে সংরক্ষিত জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য-ভাণ্ডারের সঙ্গে আঙুলের ছাপ মেলানোর পর ‘বায়োমেট্রিক’ নিবন্ধনের কাজ শেষ হয় ও সংশ্লিষ্ট নাগরিক সিম পান। এ নিয়ম অনুসরণ করা হলে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের বৈধভাবে মোবাইল ফোন ব্যবহারের সুযোগ পাওয়ার কথা নয়। কিন্তু কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পে থাকা সাড়ে ১১ লাখ রোহিঙ্গার একটি বড় অংশের হাতে মোবাইল ফোন রয়েছে বলে জানা গেছে।
এসব অবৈধ মোবাইল সিম চাঁদাবাজি, মাদক চোরাচালানসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা। এমনকি মিয়ানমারের নাফ নদীর ওপারেও বাংলাদেশের কিছু অপারেটরের সিম ব্যবহার হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তারা। তারা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, শক্তিশালী নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এসব সিম দিয়ে নাফ নদীর ওপার থেকে কক্সবাজারের ক্যাম্পের রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে। বিকাশের মাধ্যমে টাকা লেনদেন হচ্ছে বলেও জানান তারা। সরকারের এই নির্দেশের বাস্তবায়ন
কীভাবে সম্ভবÑ এ নিয়ে গতকাল সোমবার দেশ রূপান্তর বিভিন্ন পর্যায়ের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলেছে। তাদের মতে, এটি কঠিন, তবে সম্ভব। সে ক্ষেত্রে বিটিআরসি ও অপারেটরগুলোকে আন্তরিকভাবে কাজ করতে হবে। কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে যে ৩০টি ক্যাম্পে রোহিঙ্গারা বাস করছে, তার আশপাশে সাধারণ মানুষের কোনো বিঘœ না ঘটে, সেদিকে নজর রাখার পরামর্শও তারা দিয়েছেন। তারা এমনও বলেছেন, দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে অবশ্যই রোহিঙ্গাদের মোবাইল নেটওয়ার্কের বাইরে রাখতে হবে।
এসব বিশেষজ্ঞ বলেছেন, ঢালাওভাবে মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক বন্ধ করা যাবে না। এতে ওইসব ক্যাম্পে কর্মরত দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার লোকজন সমস্যার মুখে পড়বে। বেছে বেছে নির্দিষ্ট ফোনের নেটওয়ার্ক বন্ধ করতে হবে। ঢালাওভাবে নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দিলে তখন স্যাটেলাইট টেলিফোন ব্যবহার বেড়ে যাবে, যা আরও ঝুঁকিপূর্ণ।
এ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা মোটা দাগে তিনটি পরামর্শ দিয়েছেন। তারা বলেছেন, কিছুতেই রোহিঙ্গাদের কাছে নতুন করে আর সিম বিক্রি করা যাবে না। যারা রোহিঙ্গাদের কাছে সিম বিক্রি করছে, তাদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনলে ধীরে ধীরে সিম বিক্রি বন্ধ হবে। পাশাপাশি কারা মোবাইল ও কোন সিম ব্যবহার করছে, অপারেটররা সে তালিকা বের করে নেটওয়ার্ক বন্ধ করতে পারে।
অবশ্য এর আগেও ২০১৭ সালে ১০ অক্টোবর অপারেটরগুলোকে অনুরূপ ব্যবস্থা নিতে বলেছিল বিটিআরসি। তার আগের বছর ২০১৬ সালে মোবাইল কোম্পানিগুলোর নেটওয়ার্ক কাভারেজ কক্সবাজার সীমান্তের জিরো লাইনের মধ্যে রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। এরপর ২০১৭ সালে উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং রাষ্ট্রীয় গুরুত্ব বিবেচনায় কক্সবাজার ও উখিয়া এলাকায় অস্থায়ীভাবে বিটিএস স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়। এছাড়া সীমান্তবর্তী এলাকা এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সিম বিক্রির ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময় বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে সরকার। কিন্তু এসব নির্দেশ বাস্তবায়ন হয়নি।
গত ১৩ জুন কক্সবাজার জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায়ও এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। সে সভায় বলা হয়, পাঁচ লাখের বেশি মোবাইল সিম ব্যবহার করছে রোহিঙ্গারা। ক্যাম্পগুলোতে থ্রি-জি নেটওয়ার্কে ইন্টারনেটও ব্যবহার করছে রোহিঙ্গারা। সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের রাখাইনেও বাংলাদেশের মোবাইল নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকে। ফলে সেখানেও অনেক বাংলাদেশি সিম ব্যবহার হচ্ছে। মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে তারা। কক্সবাজারের জেলা পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক বছরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ২৭টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এ সময়ের মধ্যে সেখান থেকে উদ্ধার হয়েছে ২৩টি অস্ত্র ও বিপুল মাদক।
এ ব্যাপারে বিটিআরসির সিনিয়র সহকারী পরিচালক (মিডিয়া) মো. জাকির হোসেন খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, তখন ভেতরে ভেতরে অনেক কাজ হয়েছে। মনিটরিং ঠিকমতো হয়েছে কি না, সে ব্যাপারে সন্দেহ রয়েছে। তবে রোহিঙ্গাদের মোবাইল সুবিধা বন্ধ করা সম্ভব। তাদের কাছে নতুন সিম বিক্রি বন্ধ করতে হবে। পুরনো সিম বাতিল করে দিতে হবে। ঠিকমতো নেটওয়ার্ক না পেলে ওরাও আর মোবাইল ব্যবহার করবে না। এই কর্মকর্তা বলেন, রোহিঙ্গাদের মধ্যে কারা মোবাইল ব্যবহার করে, সে তালিকা অপারেটরদের কাছে আছে। তারা চাইলেই নেটওয়ার্ক বন্ধ করতে পারে।
ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মামুনুর রশিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, মোবাইল ফোন বন্ধ করা কঠিন, তবে একদম অসম্ভব নয়। ওই অঞ্চলে বিশেষ করে ক্যাম্পগুলোতে নেটওয়ার্ক বন্ধ করতে পারে। তবে সবচেয়ে ভালো হবে যদি রোহিঙ্গাদের কাছে সিম বিক্রি বন্ধ করা যায়। আইনগতভাবে ওরা সিম কিনতে পারে না। সেখানকার বাংলাদেশিরা তাদের সিম ওদের কাছে বিক্রি করছে। অর্থাৎ রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করা সিম যার নামে, তাকে খুঁজে বের করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিলেই ধীরে ধীর সিম বিক্রি বন্ধ হবে।
এই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, কিছু জায়গায় অস্থায়ীভাবে সীমিত সময়ের জন্য নেটওয়ার্ক বন্ধ করা যেতে পারে। বিটিআরসি যদি অপারেটরদের নির্দেশনা দেয় যে, কোন স্টেশন থেকে রোহিঙ্গারা নেটওয়ার্ক পাচ্ছে, সেখানকার নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব। সে ক্ষেত্রে সাধারণ গ্রাহকদের সার্ভিস বিঘিœত হতে পারে। সেটা খেয়াল রাখতে হবে। অধ্যাপক মামুনুর রশিদ আরও বলেন, নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। অপারেটররা বুঝতে পারে কোন সিম কে ব্যবহার করছে। সেটা কার নামে। তবে এভাবে বন্ধ করাটা কঠিন। কয়টা বন্ধ করবেন। তার চেয়ে ভালো রোহিঙ্গাদের কাছে সিম বিক্রি বন্ধ নিশ্চিত করা।
এ ব্যাপারে আইটি বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা দেশ রূপান্তরকে বলেন, যে সিমটা যার নামে রেজিস্ট্রেশন হচ্ছে, সেটা যেন অন্যের কাছে না যায়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। অপারেটরগুলো চাইলে রোহিঙ্গাদের মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ করতে পারে। সে ক্ষেত্রে গোটা এলাকার নেটওয়ার্ক বন্ধ করা যাবে না। ব্যক্তি রোহিঙ্গার নেটওয়ার্ক বন্ধ করতে হবে। তা না হলে ওই এলাকায় স্যাটেলাইট টেলিফোনের ব্যবহার বেড়ে যাবে। সেটা আরও ঝুঁকিপূর্ণ। এই বিশেষজ্ঞ বলেন, সরকারের এই নির্দেশ বাস্তবায়ন সম্ভব। তবে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সেগুলো কীভাবে মোকাবিলা করবে, সেটা ঠিক করতে হবে।
বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ এর আগেও সরকারের এমন নির্দেশনা বাস্তবায়ন না হওয়ার পেছনে সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর গাফিলতিকে দায়ী করেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা বহুদিন ধরে সরকারকে বলে আসছি অবৈধ সিম বিক্রি বন্ধ করতে। সিম ট্রান্সফার যাতে না হয় সেদিকে নজর দিতে। আমাদের কথা শোনেনি। এখন আবার নতুন করে নির্দেশ দিয়েছে। আমরা মনে করি এটি বাস্তবায়ন সম্ভব। সেজন্য বিটিআরসি ও অপারেটরগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। কারণ অপারেটররা জানে তাদের নেটওয়ার্ক কোথায় ব্যবহার হচ্ছে। এখন তো নাফ নদীর ওপারেও এ দেশের সিম ব্যবহার হচ্ছে। রোহিঙ্গা বিকাশের মাধ্যমে টাকা লেনদেন করছে।
কী আছে নতুন নির্দেশনায় : গত রবিবার অপারেটরদের কাছে বিটিআরসির পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও গুরুত্ব বিবেচনা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও জনসুরক্ষার স্বার্থে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী যাতে মোবাইল সুবিধা না পায় সে বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য আপনাদের নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছিল। কিন্তু রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনকারী কমিটি এবং বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা, গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে কমিশন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী কর্তৃক ব্যাপক হারে সিম/রিম ব্যবহার সংক্রান্ত তথ্য পেয়েছে। এমতাবস্থায়, আগামী ০৭ (সাত) কার্যদিবসের মধ্যে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কোনো প্রকার সিম বিক্রি, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী কর্তৃক সিম ব্যবহার বন্ধ তথা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে মোবাইল সুবিধাদি প্রদান না করা সংক্রান্ত সকল ব্যবস্থা নিশ্চিত করে বিটিআরসিকে অবহিত করার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ জানানো হলো।
