বরগুনায় আলোচিত শাহনেওয়াজ রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় প্রধান সাক্ষী থেকে আসামি হওয়া তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে হাইকোর্টের
দেওয়া জামিন সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার আদালত বহাল রেখেছে। মিন্নির জামিন স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষের করা আবেদনের ওপর গতকাল সোমবার শুনানি নিয়ে চেম্বার আদালতের বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী এ বিষয়ে কোনো আদেশ দেননি (নো অর্ডার)। ফলে হাইকোর্টের ওই আদেশ বহাল রইল ও মিন্নির কারামুক্তিতে কোনো আইনি বাধা নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা।
চেম্বার আদালতে মিন্নির পক্ষে শুনানিতে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই (জহিরুল ইসলাম) খান পান্না ও এ এম আমিনউদ্দিন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল কে এম জাহিদ সারওয়ার কাজল ও মো. সারওয়ার হোসাইন বাপ্পী।
মিন্নির আইনজীবী জেড আই খান পান্না দেশ রূপান্তরকে বলেন, “চেম্বার আদালত রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনে ‘নো অর্ডার’ দিয়েছে। ফলে মিন্নির জামিন বহাল রয়েছে এবং তার কারামুক্তিতে কোনো বাধা নেই। ইতোমধ্যে উচ্চ আদালতের জামিনসংক্রান্ত নথি বরগুনায় পাঠানো হয়েছে। আশা করি কালকের (আজ) মধ্যে কারামুক্তি হয়ে যাবে।’
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী কাজল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মিন্নির জামিন স্থগিত চেয়ে আমরা ফৌজদারি বিবিধ আবেদন (ক্রিমিনাল মিস পিটিশন) করেছিলাম। আদালত তাতে কোনো আদেশ দেননি। ফলে তার জামিন বহাল রয়েছে এবং মুক্তিতে বাধা নেই। তবে ইতোমধ্যে হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় যেহেতু বেরিয়েছে তাই জামিন বাতিল চেয়ে আমরা নিয়মিত লিভ টু আপিল দায়ের করব।’
মিন্নির জামিন প্রশ্নে জারি করা রুল যথাযথ ঘোষণা করে গত বৃহস্পতিবার রায় দেয় বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ। এতে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা না বলা ও বাবার (মোজাম্মেল হোসেন কিশোর) জিম্মায় থাকার শর্তে মিন্নিকে জামিন দেওয়া হয়।
বরগুনার নিম্ন আদালতে দু’দফায় জামিনের আবেদন নামঞ্জুরের পর হাইকোর্টে আইনজীবীর মাধ্যমে জামিনের আবেদন করেন মিন্নি।
গত ২৬ জুন বরগুনা সরকারি কলেজের সামনের রাস্তায় স্বামী রিফাতের হামলাকারীদের ঠেকাতে মিন্নির চেষ্টার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। পরদিন ১২ জনকে আসামি করে রিফাতের বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফের করা মামলায় মিন্নি ছিলেন প্রধান সাক্ষী। এরই মধ্যে এ হত্যার ‘মূল পরিকল্পনাকারী’ সাব্বির আহমেদ ওরফে নয়ন বন্ড পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়।
এরপর হত্যাকাণ্ডে পুত্রবধূর জড়িত থাকার অভিযোগ তোলে রিফাতের বাবা অভিযোগ করেন, মিন্নির সঙ্গে নয়ন বন্ডের সম্পর্ক ছিল এবং তাদের বিয়েও হয়েছিল। পরে কলেজছাত্রী মিন্নিকে গত ১৬ জুলাই সকালে বরগুনার পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে দিনভর জিজ্ঞাসাবাদের পর রাতে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ। পরদিন আদালতে হাজির করা হলে বিচারক তাকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে পাঠান। রিমান্ডের তৃতীয় দিনে ১৯ জুলাই পুলিশ সুপার মো. মারুফ হোসেন জানান, মিন্নি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তার আগের দিন পুলিশ সুপার প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘মিন্নি হত্যাকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা এবং হত্যা পরিকল্পনাকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। মিন্নিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে হত্যা পরিকল্পনার সঙ্গে মিন্নির যুক্ত থাকার প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ।’ তবে মিন্নির বাবা দাবি করেন, জবরদস্তি ও তড়িঘড়ি করে তার জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে।
কাল মুক্তি পেতে পারেন মিন্নি : মিন্নির মুক্তিতে আর কোনো আইনি প্রতিবন্ধকতা নেই উল্লেখ করে তার আইনজীবী মাহবুবুল বারী আসলাম জানিয়েছেন, দাপ্তরিক কাজ শেষে আগামীকাল বুধবার নাগাদ মিন্নি মুক্তি পেতে পারেন। তবে সবকিছুই হাইকোর্টের রায়ের কপি পৌঁছার ওপর নির্ভর করছে।
গতকাল মিন্নির এই আইনজীবী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হাইকোর্টের রায়ের স্বাক্ষরিত কপি বরগুনার আদালতে পৌঁছলে আমরা মিন্নির পক্ষে জামানতনামা (বেলবন্ড) দাখিলের আবেদন করব। বিচারক জামানতনামা গ্রহণ করে জেল কর্র্তৃপক্ষকে রিলিজ অর্ডার প্রেরণ করবেন। রিলিজ অর্ডার জেল কর্র্তৃপক্ষ পাওয়া মাত্রই মিন্নিকে মুক্তি দেওয়া হবে। দাপ্তরিক কাজ শেষে বুধবার নাগাদ মিন্নি জামিনে মুক্তি পেতে পারেন।’
আইনজীবী আসলাম আরও বলেন, ‘হাইকোর্টের জামিনের পর রাষ্ট্রপক্ষ চেম্বার আদালতে জামিনের বিরোধিতা করে আপিল করলেও আদালত মিন্নির জামিন বহাল রেখেছেন। এখন মিন্নিকে মুক্ত করা শুধু সময়ের অপেক্ষা।’ তবে আদালত চাইলে যেকোনো সময় যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে বলেও জানান তিনি।
এদিকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বরগুনা থানার পরিদর্শক মো. হুমায়ুন কবির গত রবিবার বরগুনার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালতে ২৪ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন; সেখানে মিন্নির নাম রাখা হয়েছে আসামির তালিকার ৭ নম্বরে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আইনজীবী আসলাম বলেন, ‘রিফাত শরীফের বাবা বরগুনা সদর থানায় যখন হত্যা মামলা করেছিলেন তখন মিন্নিকে ১ নম্বর সাক্ষী রাখা হয়েছিল। মামলায় উল্লেখ আছে, তিনি নিহত রিফাতের মুখের কথা অনুযায়ী আসামি দিয়েছেন। রিফাত তার ডায়িং ডিক্লারেশনের কোথাও মিন্নিকে সন্দেহ করেন নাই। অথচ এখন মিন্নিকে ৭ নম্বর আসামি করা হয়েছে। চার্জশিটের কপি হাতে পেলে আমরা আমাদের আইনি লড়াই চালিয়ে যাব।’
চেম্বার আদালত মেয়ের জামিন বহাল রাখায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আল্লাহ আমার নির্দোষ মেয়ের প্রতি ন্যায়বিচার করেছে। তাই হাইকোর্টের পর চেম্বার আদালতেও আমার মেয়ের জামিন বহাল রয়েছে। আমি আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করি।’ তিনি আরও বলেন, ‘যারা আমার মেয়েকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে তাদের শুধু একটা কথাই বলতে চাই, ওপরে আল্লাহ আছেন, আপনাদের বিচার তিনি করবেন।’
মিন্নির মুক্তির বিষয়ে বরগুনার জেল সুপার আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আদালত থেকে মুক্তি দেওয়ার বিষয়ে রিলিজ অর্ডার পেলেই আমরা মিন্নিকে যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মুক্তি দেব।’
