সিন্ডিকেটের কবলে বিএনপি নেতৃত্ব!

আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১২:৫৯ এএম

২৭ বছর পর ১৪ সেপ্টেম্বর কাউন্সিলের মাধ্যমে ছাত্রদলের কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপির হাইকমান্ড। তবে কাউন্সিলের দিনক্ষণ যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই সক্রিয় হচ্ছে সিন্ডিকেট, যে সিন্ডিকেট ছাত্রদলের প্রকৃত নেতাদের পরিবর্তে ‘অন্যদের’ সংগঠনের দায়িত্ব দিতে চাইছে। লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও এই সিন্ডিকেটের কাছে অসহায় হয়ে পড়ছেন বলে      

 গতকাল সোমবার দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ছাত্রদলের একাধিক নেতা; যারা নতুন কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী। তবে কমিটি গঠনে জড়িত বিএনপি নেতারা বলছেন, এ ধরনের কোনো সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব নেই। তারা জানান, ২৭ বছর ওই সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে ছাত্রদল ক্ষয়িঞ্চু সংগঠনে পরিণত হয়েছে। এখন কাউন্সিলের মাধ্যমে সংগঠনটিকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়ার পর আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে। কাউন্সিলের জন্য গঠিত কমিটির একাধিক সদস্য এই সিন্ডিকেটে জড়িত, যারা আওয়ামী লীগের পরিবারের সদস্যকে ছাত্রদলের সভাপতি করতে কাজ করছে। এতে করে সুষ্ঠুভাবে কাউন্সিল করা যাবে কি না তা নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে।

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে ছাত্রদলের কাউন্সিল সম্পন্ন করার জন্য গঠিত কমিটির সদস্য ও বিএনপির প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী বলেন, কোনো সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব নেই। ছাত্রদলের কাউন্সিলে ভোটের মাধ্যমেই কমিটি হবে। কাউন্সিলররা যাকে ভোট দেবেন তিনিই নেতা হবেন।

কীভাবে সক্রিয় ওই সিন্ডিকেটÑ জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ছাত্রদলের বিলুপ্ত কমিটির একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ছাত্রদলের সভাপতি পদে শক্তিশালী প্রার্থী ছিলেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি আল মেহেদী তালুকদার। তাকে পরিকল্পিতভাবে বাদ দিয়েছে যাচাই-বাছাই কমিটি। যাচাই-বাছাই কমিটি মনোনয়নপত্র বৈধ হিসেবে ঘোষণা করার পরও ঠুনকো অভিযোগে আপিল কমিটি প্রার্থিতা বাতিল করেছে মো. মামুন খানের। অন্যদিকে ছাত্রদলের বৃত্তি ও ছাত্রকল্যাণবিষয়ক সম্পাদক কাজী রওনাকুল ইসলাম (শ্রাবণ) সভাপতি প্রার্থী। তার বাবা যশোরের কেশবপুরে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। ভাইয়েরা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তার প্রার্থিতা রয়েছে। অথচ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেওয়ায় যাচাই-বাছাই কমিটি বাদ দিয়েছে সর্দার আমিরুল ইসলাম সাগরকে। এটা মেনে নেওয়া যায় না।

আওয়ামী পরিবারের সন্তান বলে যার বিরুদ্ধে অভিযোগ সেই ছাত্রনেতা শ্রাবণ গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ছাত্রদলের রাজনীতি করার কারণে গত আট বছর ধরে আমি পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। ছাত্রদলের রাজনীতি করার কারণে আমার বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় ১৫ ও রমনা থানায় ২টি মামলা হয়েছে। গত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজ এলাকা যশোরের কেশবপুরে গিয়ে বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছি। এলাকায় টিকতে না পেরে যশোর সদর আসনের প্রার্থী বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ ইসলাম অমিত ভাইয়ের পক্ষে কাজ করেছি। আমার পরিবারের বিষয়টি শুরু থেকেই সবাই জানত। এখন হঠাৎ করে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে।’ তিনি বলেন, ‘আমার পরিবার আওয়ামী লীগ করে। আমি চাইলে আওয়ামী রাজনীতি করতে পারতাম। ১২ বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। আওয়ামী লীগের রাজনীতি করলে ভালো থাকতে পারতাম। অথচ সব ত্যাগ স্বীকার করে ছাত্রদলের রাজনীতি করছি। আমার ত্যাগ বিএনপি মূল্যায়ন করবে না?’

সভাপতি প্রার্থী মেহেদী দেশ রূপান্তরের কাছে অভিযোগ করে বলেন, ‘মিথ্যা একটি কাবিননামা দিয়ে আমার প্রাির্থতা বাতিল করা হয়েছে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান আমাকে চাইলেও কাউন্সিলের জন্য গঠিত কমিটি আমার প্রার্থিতা বাতিল করেছে। তারেক রহমান সিন্ডিকেটের কাছে অসহায় হয়ে পড়ছেন।’

বয়সসীমা প্রত্যাহারের আন্দোলন করার জন্য বহিষ্কৃত ও বিলুপ্ত ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপি পরিবারের সন্তানদের ছাত্রদলের নেতা না বানিয়ে আওয়ামী লীগের পরিবারের সন্তানকে নেতা বানাতে তৎপরতা চালাচ্ছে ছাত্রদলের কাউন্সিল সম্পন্ন করার জন্য গঠিত কমিটির একাধিক সদস্য। কিন্তু এমনটা হতে দেওয়া হবে না। আওয়ামী পরিবারের সদস্যকে ঠেকাতে আমরা ছাত্রদলের নেতারা ভিন্ন পন্থা বেছে নেব। বিএনপি পরিবারের কাউকে নেতা বানাতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাব।’ তিনি বলেন, ‘সিন্ডিকেটের সদস্যরা শ্রাবণকে সভাপতি করতে চাইলে আমরা তার পরিবারের সদস্যদের হাতে নির্যাতনের শিকার পরিবারগুলোকে ঢাকায় এনে মানববন্ধন করাব। যাতে বিএনপির হাইকমান্ডের পাশাপাশি দেশের মানুষ জানতে পারে আসলে কাউন্সিলের নামে ছাত্রদলে কী হচ্ছে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কাউন্সিল পরিচালনা কমিটির সদস্য বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু দেশ রূপান্তরকে বলেন, সারা দেশের কাউন্সিলরদের ভোটে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হবেন। এখানে সিন্ডিকেট করে কেউ লাভবান হতে পারবে না। কাউন্সিলরদের ওপর প্রভাব খাটিয়ে কেউ কিছু করতে পারবে না।

ছাত্রদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন ১১০ জন। তবে জমা দেন ৭৫ জন। যাচাই-বাছাই শেষে প্রার্থী সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৫ জনে। সভাপতি পদে ১৫ ও সাধারণ সম্পাদক পদে ৩০ জন প্রার্থী যাচাই-বাছাইয়ে উতরে যান। তবে আপিল কমিটি সভাপতি পদের শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে পরিচিত মামুন খানের মনোনয়ন বাতিল করে। এ নিয়ে বিক্ষুব্ধ মামুন গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, যথাযথ কারণ ছাড়াই আমার প্রার্থিতা বাতিল করেছে আপিল কমিটি। যদিও যাচাই-বাছাই কমিটি আমার প্রার্থিতা অনুমোদন করেছিল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত