রংপুর-৩ (সদর) আসনের উপনির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নকে কেন্দ্র করে দ্বিধাবিভক্ত জাতীয় পার্টির (জাপা) জ্যেষ্ঠ নেতারা। দলটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুতে শূন্যঘোষিত এ আসনের উপনির্বাচনে ভোট হবে আগামী ৫ অক্টোবর। গত রবিবার এ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। জাপার ঘাঁটিখ্যাত এ আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী এরশাদ পরিবারের চার সদস্য। ফলে পারিবারিক দ্বন্দ্বে আসনটি হারানোর আশঙ্কা করছেন তৃণমূল নেতারা।
দলটির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এরশাদ পরিবারই এখনো মনোনয়নের বিষয়ে একমত হতে পারেনি। পরিবার থেকে মনোনয়ন দৌড়ে এরশাদপুত্র রাহগীর আল মাহি শাদ এরশাদ ছাড়াও তার ভাতিজা সাবেক এমপি আসিফ শাহরিয়ার, ভাতিজা (মামাতো ভাইয়ের ছেলে) মেজর (অব.) খালেদ আখতার এবং ভাগ্নি (মেরিনা রহমানের মেয়ে)
মেহেজেবুন্নেছা রহমান টুম্পা রয়েছেন।
তারা আরও বলেন, প্রয়াত এরশাদের সহোদর দলটির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ (জিএম) কাদের ও তার স্ত্রী শরীফা কাদেরের নামও শোনা যাচ্ছে। এছাড়া দলের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন মহানগর জাপার সাধারণ সম্পাদক এস এম ইয়াসির আহমেদ এবং প্রেসিডিয়াম মেম্বার ও জেলা জাপার সাধারণ সম্পাদক শিল্পপতি ফখর-উজ-জামান জাহাঙ্গীর।
জাপার একাধিক নেতার ভাষ্য, রংপুর-৩ আসনটি এরশাদের পরিবার নিজেদের মধ্যে রাখতে চায়। রওশনপুত্র সাদ এই আসনে প্রার্থী হবেন এ নিয়ে দলের চেয়ারম্যান কাদের ও বিরোধীদলীয় উপনেতা রওশন এরশাদের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। তাকে প্রার্থী করা হলে দেবর-ভাবির দূরত্ব কমে যাবে বলেও মনে করছেন তারা। এ বিষয়ে শাদ এরশাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দল যদি আমাকে মনোনয়ন দেয় তাহলে আমি বাবার আসনে নির্বাচন করব। এখানে অনেক কাজ অসমাপ্ত রয়েছে। ওইসব কাজ আমি শেষ করতে চাই।’
জানা গেছে, এ আসনে মনোনয়ন পেলেই বিজয়ী হবেন এমন চিন্তা থেকেই জোর লবিং-তদবির শুরু করছেন মনোনয়নপ্রত্যাশীরা। অনেকেই পার্টির চেয়ারম্যান-মহাসচিবসহ সিনিয়র নেতাদের কাছে ধরনা দিচ্ছেন। এ বিষয়ে জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদের বলেন, ‘নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নের জন্য একটি বোর্ড গঠন করে দিয়েছি। তারাই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।’ বোর্ড গঠনে দলের গঠনতন্ত্র অনুয়ায়ী জ্যেষ্ঠতা মানা হয়নিÑ এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সিনিয়রদের নিয়েই করতে হবে এমনটি অত্যাবশ্যকীয় নয়। প্রয়োজনে গঠনতন্ত্রও পরিবর্তন হতে পারে।’
তৃণমূল নেতারা বলছেন, প্রার্থী নির্ধারণকে কেন্দ্র করে দলে কোন্দল প্রকট হয়ে উঠছে। এরশাদের পরিবারের কেউ এই আসনে নির্বাচন করলে দলে ভাঙন অনিবার্য ও খোদ রংপুরেই জাপা অস্তিত্ব হারাবে। মহানগর জাপার সাধারণ সম্পাদক ইয়াসিরকে মনোনয়ন দেওয়ার দাবি জানিয়ে দল থেকে নির্বাচিত ইউনিয়ন ও উপজেলার চেয়ারম্যান এবং রংপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র ও একাধিক কাউন্সিলর স্বাক্ষরিত একটি আবেদনপত্র দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে পাঠানো হয়েছে।
এরশাদের ভাতিজা সাবেক এমপি আসিফ শাহরিয়ার বিশাল শোডাউন করে এরই মধ্যে নিজেকে প্রার্থী হিসেবে জানান দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘স্থানীয় প্রার্থী ছাড়া অন্য কাউকে প্রার্থী করলে জাপার তৃণমূল নেতাকর্মীরা তা মেনে নেবে না। বারবার ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, এবার ভুল সিদ্ধান্ত নিতে দেওয়া হবে না। যাকে কেউ চেনে না তাকে কেন মানুষ ভোট দেবে?’ দলের মনোনয়ন না পেলে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়বেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।
মনোনয়নপ্রত্যাশী মহানগর জাপার সাধারণ সম্পাদক ইয়াসির আহমেদ বলেন, ‘১৯৯০ সালে এরশাদের মুক্তির আন্দোলন রংপুরের মানুষ করেছে। এজন্য তার পরিবারের কেউ মাঠে নামেননি। দীর্ঘদিন থেকে জাতীয় পার্টি করি। এরপরও দল যদি আমাকে মূল্যায়ন না করে পরিবারের সদস্যকে মনোনয়ন দেয় তা রংপুরবাসী মেনে নেবে না এবং দলেরও জন্য মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনবে।’ তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে আরও বলেন, ‘এরশাদের পরিবার রংপুরের মানুষকে ক্রীতদাস ভাবছে। যাকেই মনোনয়ন দেবে সে-ই বিজয়ী হবে এমনটা ভাবছে তারা। আসলে এবার তা হবে না। রংপুরের মানুষ এরশাদ পরিবারের কাউকে মেনে নেবে না।’
মহানগর জাপার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক লোকমান হোসেন বলেন, ‘আমরা রংপুরের মানুষ এরশাদের পরে তার পরিবারে জি এম কাদের ছাড়া অন্য কাউকে চিন্তা করতে পারি না।’
মনোনয়নপ্রত্যাশী জেলা জাপার সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর বলেন, ‘আমরা ওয়েটিং লিস্টের প্রার্থী। ১০ শতাংশ আশা নিয়ে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছি। দল মনোনয়ন দিলে নির্বাচন করার জন্য প্রস্তুত রয়েছি। তবে চারদিকে যা শুনছি তাতে মনে হয়, রংপুর সদর আসনের মনোনয়ন দলের নয়, এরশাদ পরিবারের সদস্যরা পাচ্ছেন। এমনটা হলে দলের জন্য মঙ্গলজনক হবে না।’
এরশাদ পরিবারের সদস্যই এ নির্বাচনে মনোনয়ন পেতে পারেনÑ এমন ইঙ্গিত করে জাপার কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম দপ্তর সম্পাদক এম এ রাজ্জাক খান বলেন, ‘মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় দলের কোনো ক্ষতি হবে না। তবে এবার সদর আসনটি হাতছাড়া হতে পারে। কারণ এবার সরকারদলীয় প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।’
এদিকে এ আসনটি নিয়ে কঠিন হিসাব-নিকাশ শুরু করছে বিএনপি। দলটির নেতারা বলেছেন, তারা চাইছেন একজন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ প্রার্থী দিতে। সেই সঙ্গে আওয়ামী লীগও আসনটি হারাতে চাইছে না। তাদেরও নজর রয়েছে আসনটির দিকে। তবে জাপার মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, ‘জাতীয় পার্টি মহাজোটের শরিক দল হওয়ায় এ আসনে নির্বাচন জোটগতভাবে হবে এবং পার্লামেন্টারি বোর্ড আগ্রহী প্রার্থীদের আবেদন ও মাঠের অবস্থা বিশ্লেষণ করে মনোনয়ন দেবে।’
এবার জাপা আসনটি হারাতে পারেÑ এমন শঙ্কার কথা জানিয়ে জাপার তৃণমূল নেতারা বলছেন, পারিবারিক দ্বন্দ্বের সমাধান না হলে অন্যরা সুযোগ নিতে পারেন।
