গত ৩১ আগস্ট ভারতের আসামে এনআরসি চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে দেশটির অন্যতম আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে নাগরিকত্ব। গোটা আসামজুড়ে এখন অস্বস্তির আবহাওয়া। ১৯ লাখেরও বেশি মানুষের জাতীয় নাগরিকপঞ্জি বা এনআরসি-তে নাম না থাকা নিয়ে রাজনৈতিক শোরগোল শুরু হয়েছে। তবে, বিশ্লেষকদের মতে, এনআরসি’র লক্ষ্য অনুপ্রবেশকারী মুসলিমদের শনাক্ত করে তাদের বহিষ্কার করা। লিখেছেন আন্দালিব আয়ান
ভারতীয় নাগরিকত্ব
একজন ব্যক্তির সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক নির্ধারণ করে নাগরিকত্ব। নাগরিকত্ব স্বীকৃতির জন্য দুটি পরিচিত নীতি রয়েছে। একটি পদ্ধতিতে নাগরিকত্বকে স্বীকৃতি দেওয়া হয় জন্মস্থানের হিসেবে, অন্যটিতে রক্ত সম্পর্কের সূত্র ধরে। ১৯২৮ সালে মতিলাল নেহরু কমিটির সময় থেকে ভারতীয় নেতারা জন্মস্থানের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব নির্ধারণের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। অন্য ধারাটি খারিজ হয়ে যায় তা ভারতীয় ভাবধারার বিরোধী বলে।
ভারতীয় সংবিধানে নাগরিকত্বের আলাদা কোনো সংজ্ঞা নেই। কিন্তু এর ৫ থেকে ১১ নং অনুচ্ছেদে কারা নাগরিকত্বের আওতায় পড়বেন তার বিভিন্ন শর্ত স্থির করা হয়েছে। ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইন পাস হওয়ার পর তা চারবার সংশোধিত হয় ১৯৮৬, ২০০৩, ২০০৫ ও ২০১৫ সালে। যাদের ক্ষেত্রে সন্দেহ রয়েছে, তাদের নাগরিকত্বের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সরকারের হাতে দেওয়া হয়েছে এই আইনবলে। তবে, জন্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্বের যে ব্যাপ্ত নীতিমালা ছিল গত কয়েক দশকে তা অনেকটাই সংকুচিত করে আনা হয়েছে। এর ওপর রয়েছে বিদেশি আইন, যার বলে কোনো ব্যক্তির ওপর নিজেকে বিদেশি নয় প্রমাণ করার চাপ ব্যাপক পরিমাণে বেড়েছে।
কে ভারতের নাগরিক, কে নয়
৫ নং অনুচ্ছেদ : ভারতে যাদের বাস ও ভারতে যারা জন্মেছেন তাদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। এমনকি, যাদের জন্ম ভারতে নয়, কিন্তু বসবাস ভারতে এবং যাদের বাবা-মায়ের মধ্যে যে কোনো একজন ভারতে জন্মেছেন, তারাও নাগরিকত্ব পাবেন। যারা এ দেশে পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে বসবাস করছেন, তারাও নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারবেন।
৬ নং অনুচ্ছেদ : ভারতের স্বাধীনতার সময় যেহেতু দেশভাগের মতো বড় ঘটনা সংঘটিত হয় এবং এর ফলে বিপুল পরিমাণ মানুষের অভিবাসন ঘটে, সে জন্য ৬ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যারা ১৯৪৯ সালের ১৯ জুলাইয়ের আগে ভারতে এসেছেন তাদের বাবা-মা বা দাদা-দাদীর কেউ যদি এ দেশে জন্মে থাকেন, তবে তারা ভারতীয় নাগরিক হিসেবে গণ্য হবেন। কিন্তু ওই তারিখের পর এ দেশে প্রবেশ করলে তাদের নিজেদের নথিভুক্ত করতে হবে।
৭ নং অনুচ্ছেদ : ১৯৪৭ সালের ১ মার্চের পর যারা পাকিস্তান চলে গিয়েছিলেন কিন্তু তারপর আবার পুনর্বাসনের সার্টিফিকেট নিয়ে ফেরত এসেছেন, তারাও নাগরিক বলে গণ্য হবেন। যারা পাকিস্তান থেকে এদেশে এসে উদ্বাস্তু বলে পরিচিত হয়েছেন, তাদের প্রতি আইন বেশি সহানুভূতিশীল। তুলনায় দোলাচলে পড়ে পাকিস্তানে গিয়ে আটকে পড়েছিলেন বা দ্রুত সেখান থেকে এ দেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন, তাদের প্রতি আইনের সহানুভূতি কম।
৮ নং অনুচ্ছেদ : ভারতীয় বংশোদ্ভূত কোনো ব্যক্তি যিনি ভারতের বাইরে বসবাস করেন, যার বাবা-মা বা অথবা দাদা-দাদীর কেউ ভারতে জন্মেছেন, তিনি দূতাবাসের মাধ্যমে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে নিজেকে নথিভুক্ত করতে পারেন।
১৯৮৬ সালের সংশোধনী : ভারতে জন্মসূত্রে ভারতীয় নাগরিকত্বের যে ব্যাপকতার ধারণা তা ১৯৮৬ সালের সংশোধনীতে অনেকটাই খর্ব করা হয়। এই সংশোধনীতে শর্ত আরোপ করে বলা হয়, যারা ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি বা তার পর থেকে ১৯৮৭ সালের ১ জুলাইয়ের আগে জন্মেছেন, তারা ভারতীয় নাগরিক বলে গণ্য হবেন। যারা ১৯৮৭ সালের ১ জুলাইয়ের পর থেকে ২০০৩ সালের ৪ ডিসেম্বরের আগে জন্মেছেন তারা ভারতে জন্মালেও, জন্মকালীন তাদের বাবা বা মাকে ভারতীয় নাগরিক হতে হবে।
২০০৩ সালের সংশোধনী : তৎকালীন এনডিএ সরকার বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশের কথা মাথায় রেখে এই আইনকে আরও কঠোর করে। এখনকার আইনে যারা ২০০৪ সালের ৩ ডিসেম্বর বা তার পর জন্মেছেন, তাদের নাগরিকত্ব প্রাপ্তির জন্য হয় তাদের বাবা-মা উভয়কেই ভারতের নাগরিক হতে হবে বা যে কোনো একজনকে ভারতীয় নাগরিক হতে হবে এবং অন্যজন বেআইনি অনুপ্রবেশকারী হলে চলবে না। এই কঠোর সংশোধনীগুলো আনার ফলে ক্রমশ ভারত রক্ত সম্পর্কের মাধ্যমে নাগরিকত্বের নীতিসমূহের দিকে এগিয়ে যায়। এর ফলে কোনো বেআইনি অনুপ্রবেশকারী সাত বছর ধরে ভারতে বসবাস করলেও স্বাভাবিকতার সূত্রে বা নথিভুক্তির মাধ্যমে নাগরিকত্ব দাবি করতে পারবেন না।
নাগরিকত্ব (সংশোধনী) বিল : এই সংশোধনীতে প্রস্তাব করা হয়েছে, ২০১৪ সালের ১৪ ডিসেম্বরের আগে পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তান থেকে ভারতে প্রবেশকারী হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পারসি এবং খ্রিস্টানরা ভারতে বসবাস করতে পারবেন। এরা মাত্র ৬ বছর ভারতে থাকলেই নাগরিকত্বের আবেদন করতে পারবেন। এ ধরনের অভিবাসীদের জন্য পাসপোর্ট আইন ও বিদেশি আইনেও ছাড় দেওয়া হয়েছে। আসামের বেশ কিছু সংগঠন এ বিলের বিরোধিতা করেছে কারণ এই বিলের ফলে বাংলাদেশি হিন্দু বেআইনি অনুপ্রবেশকারীরা নাগরিকত্ব পেয়ে যেতে পারেন।
আসামের আলাদা নাগরিকত্ব বিধান
ঐতিহাসিক কারণেই ভারতের নাগরিকত্ব আইনের সঙ্গে আসামের নাগরিকত্ব আইন কিছুটা আলাদা। ব্রিটিশ শাসনামলে প্রশাসনিক কাজের সুবিধার্থে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির সঙ্গে আসামকে একত্রিত করা হয়। ১৮২৬ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত সেখানে চা চাষের জন্য কম পারিশ্রমিকে কর্মীদের নিয়ে যাওয়া হতো। ফলে আশপাশের অঞ্চল বিশেষ করে বাংলাদেশ থেকে অসংখ্য মানুষ আসামে বসবাস শুরু করে। এছাড়াও ব্রিটিশ শাসনের পর আরও দুটি পরিবর্তনের জোয়ার এসেছিল দেশ ভাগের সময় এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পর।
আসামের নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে দুটি তারিখের হিসাব খুব গুরুত্বপূর্ণ। এ দুটি তারিখ হলোÑ ‘১৯৬৬ সালের ১ জানুয়ারি’ এবং ‘১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ’।
বিদেশিদের চিহ্নিতকরণ, ভোটাধিকার রদ এবং নির্বাসনের দাবিতে অল আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (আসু) এবং অল আসাম গণসংগ্রাম পরিষদ (এএজিএসপি) ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত ছয় বছর ধরে আন্দোলন করে। বেআইনি অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে চলা আসাম আন্দোলনের ফলে অনুষ্ঠিত হয় আসাম চুক্তি। আসাম এবং তৎকালীন রাজীব গান্ধী সরকারের মধ্যে ওই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুসারে, ১৯৮৬ সালে নাগরিকত্ব আইনে পরিবর্তন এনে আসামের নাগরিকদের জন্য একটি বিশেষ বিভাগ তৈরি করা হয়। ভারতীয় নাগরিকত্ব আইনের নতুন ৬-এ ধারায় বলা হয়, ভারতীয় বংশোদ্ভূত যে কেউ যিনি ১৯৬৬ সালের ১ জানুয়ারির আগে ভারতে প্রবেশ করেছেন তারা ভারতীয় নাগরিক হিসেবে বিবেচ্য হবেন। যারা ১৯৬৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের মধ্যে ভারতে এসে সাধারণ বাসিন্দা হিসেবে রয়ে গেছেন, তারা বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ১০ বছর পর ভারতীয় নাগরিকত্ব পাবেন। অন্তর্বর্তী সময়ে তাদের ভোটাধিকার থাকবে না, কিন্তু তারা সাধারণ নাগরিক হিসেবে গণ্য হবেন। বিদেশি চিহ্নিত করা হবে বেআইনি অনুপ্রবেশকারী আইন অনুসারে, যা কেবল আসামের জন্য প্রযোজ্য। যারা ২৫ মার্চ, ১৯৭১-এর পর আসামে এসেছেন তাদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে না।
অভিবাসী শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া আগে কী ছিল
ইন্দিরা গান্ধীর প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন অবৈধ নাগরিকদের জন্য একটি আইন চালু করেন। যা কেবল আসামেই প্রযোজ্য ছিল। মূলত বিদেশিদের বিরুদ্ধেই এই আইন প্রয়োগ করা হয়। ২০০৫ সালে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট আইনটি খারিজ করে।
২০১৬ সালে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তান থেকে ভারতে যাওয়া সংখ্যালঘুদের নাগরিকত্বের সময়সীমা কমাতে এই আইন সংশোধন করে। ১০ বছর থেকে কমিয়ে এর বৈধতা করা হয় ৬ বছর পর্যন্ত। এতেই আসামজুড়ে বিক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
ভারতের অন্য রাজ্যগুলোর মধ্যে অরুণাচল প্রদেশে চাকমাদের নাগরিকত্বের দাবি গত কয়েক দশক ধরে স্থগিত রয়েছে। যদিও কেন্দ্র তাদের নাগরিকত্ব দিতে আগ্রহী, তবে এক্ষেত্রে রাজ্য সরকার বিষয়টির বিরোধিতা করছে। কাশ্মীরে পাকিস্তানের শরণার্থীরা জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিতে পারেন, কিন্তু বিধানসভা নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অনুমতি নেই তাদের।
এনআরসি ও নাগরিকত্ব বিল
এনআরসি হলো একটি সরকারি পদ্ধতি। কিন্তু সিটিজেনশিপ (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল বা নাগরিকত্ব বিল একটি আইনি প্রক্রিয়া। এই বিল আইন হিসেবে পাস এখনো হয়নি। মোদি সরকার এই বিলকে আইন বানিয়েই দেশ থেকে অনুপ্রবেশকারীদের তাড়াতে চাইছে। অর্থাৎ এনআরসি হল চিহ্নিতকরণ। নাগরিকত্ব বিল, যা পরবর্তীকালে আইন হিসেবে আসতে চলেছে, তা হলো একটি আইনি প্রক্রিয়া।
প্রথমেই বলে রাখা ভালো ১৯৫৫ সালে পাস হওয়া নাগরিকত্ব বিলের সঙ্গে সংশোধিত বিলের বিশেষ তফাৎ কিছুই নেই। বিলে যা আছে, তা ব্যাখ্যা করলে বলা যায় বাংলাদেশ, পাকিস্তান বা আফগানিস্তান থেকে ভারতে যাওয়া মুসলমানরা যেমন বেআইনি অনুপ্রবেশকারী, অন্যদিকে ওই তিন দেশ থেকে যাওয়া হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, পার্শি, শিখ বা খ্রিস্টানদের মতো ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা হলেন শরণার্থী।
বিলে বলা হয়েছে, ভারতের সরকার, প্রতিবেশী দেশ থেকে আসা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের আশ্রয় দেবে। কারণ, তারা বিপদের মুখে নিজের দেশ ছেড়ে পালিয়ে এসেছেন। অন্যদিকে মুসলমান অনুপ্রবেশকারীদের ফেরত পাঠানো হবে, কারণ সীমান্তের ওপার থেকে রোজগার বা বাসস্থান খুঁজে পেতে, কিংবা কোনো অসৎ উদ্দেশ্য নিয়েই তারা ভারতে গিয়েছে। তবে বাংলাদেশ, পাকিস্তান বা আফগানিস্তানের সংখ্যালঘুরা, যারা গত এক বছর ভারতে রয়েছেন বা শেষ ৬ বছর ধরেই সেখানে রয়েছেন, তারাই নাগরিকত্ব আইনের (বিল আইন হিসেবে পাস হয়ে যাওয়ার পর) আওতায় নাগরিক হতে পারবেন।
অসম চুক্তি স্বাক্ষর হয়ে গিয়েছিল ১৯৮৫ সালে। কিন্তু তা কার্যকর করতে প্রায় ৩৩ বছর লেগে গেছে। চুক্তি অনুযায়ী, বৈধ ভারতীয় নাগরিক হতে গেলে ১৯৭১ সালের ২৪ জানুয়ারির আগে ভারতে আসতে হবে। দিতে হবে তার প্রমাণ। এইসব প্রমাণ না দিতে পারার কারণে আসামে ১৯ লাখেরও বেশি মানুষের নাম এনআরসিতে ওঠেনি। সেক্ষেত্রে মোদি সরকারের নাগরিকত্ব বিল রয়েছে। অনেকেই বলছেন, এর মাধ্যমে এনআরসিতে যাদের নাম ওঠেনি, তারা নাগরিকত্ব পাবেন।
হিন্দু উদ্বাস্তু ও মুসলিম অনুপ্রবেশকারী
২০১৪ সালে নির্বাচনের আগে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নরেন্দ্র মোদির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল উদ্বাস্তু হিন্দুদের আশ্রয়স্থল ভারত এবং ক্ষমতায় এসে তিনি সে ব্যবস্থাই করবেন। কথামতো কাজও করেছেন তিনি। পাসপোর্ট আইন, বিদেশি আইন বা ফরেনার্স অ্যাক্ট-এর সংশোধন করা হয়েছে। ৩১ ডিসেম্বর ২০১৪-এর মধ্যে যারা বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই ভারতে এসেছেন তারা আইনিভাবে বসবাসের অধিকারী হয়েছেন।
কিন্তু মুসলিম প্রশ্নে মোদি সরকারের অবস্থান ভিন্ন। তাদের মতে, মুসলিম মানেই অনুপ্রবেশকারী। কারণ তারা ধর্মীয় ও জাতিগত নিগ্রহের শিকার হয়ে ভারতে যায়নি।
মোদি সরকারের বক্তব্য, এক্ষেত্রে জাতিসংঘের উদ্বাস্তুর সংজ্ঞা জানতে হবে। বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং আফগানিস্তান মুসলিমপ্রধান রাষ্ট্র। সেখানকার ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা ধর্মীয় কারণে অত্যাচারিত হয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছে। জাতিসংঘের উদ্বাস্তুর সংজ্ঞা অনুযায়ী, তাদের উদ্বাস্তু হিসেবে আশ্রয় দেওয়াটাই আইনসংগত। কারণ, উদ্বাস্তুর সংজ্ঞায় বলা রয়েছে, যে ব্যক্তি জাতি, ধর্ম, নাগরিকত্ব, সামাজিক বা ধর্মীয় সংস্থার জন্য অত্যাচারিত হচ্ছেন বা হওয়ার আশঙ্কায় দেশ ছেড়েছেন তারাই উদ্বাস্তু। সেক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, অর্থনৈতিক কারণে স্থানান্তরিত কাউকে জাতিসংঘের সংজ্ঞায় উদ্বাস্তু গণ্য করা হয় না। কেবলমাত্র গরিব বলেই অন্য দেশে গিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করা এবং রোজগার করার অধিকার জন্মায় না।
আসামের এনআরসিতে হইচই পশ্চিমবঙ্গে
এখানে মূলত দুটি কারণ রয়েছে। এক, বৈধ প্রমাণপত্র থাকা সত্ত্বেও অনেক বাংলা ভাষাভাষীর নাম এখনো তালিকায় ওঠেনি। বিজেপি দাবি করেছে, পশ্চিমবঙ্গ সরকার কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে এনআরসির বিষয়ে কোনো সহযোগিতা করছে না। আসাম ছাড়াও কেন্দ্র থেকে অন্যান্য রাজ্যে নামের নথি পরীক্ষা করতে পাঠানো হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গ ওই নথি পরীক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। এই কারণেই পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসামে বসবাস করতে যাওয়া ১ লাখ নাম এখনো তালিকায় ওঠেনি।
দুই, ভারতীয় নানা ভাষ্যে বলা হয়, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ তৈরি হওয়ার কয়েক বছরের মধ্যেই আবার অত্যাচার এবং বৈষম্য শুরু হয়। তফশিলি জাতির হিন্দু সম্প্রদায়, যারা সাহস করে স্বাধীন বাংলাদেশে থেকে গিয়েছিল, তারাও অকথ্য অত্যাচারের শিকার হয়েছিলেন। যে বাংলাদেশে এক সময় হিন্দু জনসংখ্যা ছিল ২৮ শতাংশ, তা এখন কমে হয়েছে মাত্র ৮ শতাংশ। পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে বেআইনিভাবে মুসলমান অনুপ্রবেশকারীরা পশ্চিমবঙ্গে জনবিন্যাসের বিপর্যয় ঘটিয়েছে। ১৯৫১ সালে ১৯ শতাংশ মুসলমান ছিল পশ্চিমবঙ্গে। বর্তমানে সংখ্যাটি বেড়ে হয়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ।
রাজ্য বিজেপির অভিযোগ, এই বিষয়ে রাজ্যে সিপিএম, বাম দলগুলো, কংগ্রেস এবং তৃণমূল কংগ্রেস নীরব। কারণ, অনুপ্রবেশকারীরাই এই দলগুলোর শক্তি। বাংলাদেশ গঠনের পর এবং ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসার পর হাজারে হাজারে বাংলাদেশি মুসলমান পশ্চিমবঙ্গে অনুপ্রবেশ করেছে বলে দাবি করা হয়। আর এই কারণেই পশ্চিমবঙ্গেও এনআরসি’র জোরালো দাবি তুলেছে একটি পক্ষ।
১৯৯০ সালের ৬ মে, পশ্চিমবঙ্গের কমিউনিস্ট স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত (সিপিআই দলের) লোকসভায় বলেছিলেন, ভারতে ১ কোটি বাংলাদেশি আছে। ১১ অক্টোবর ১৯৯২ সালে গণশক্তি পত্রিকায় তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু লিখেছিলেন, ১৯৭৭ সাল থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত বিএসএফ ২ লাখ ৩৫ হাজার ৫২৯ জন বাংলাদেশিকে তাড়িয়ে দিয়েছে। এরপর, ১৪ জুলাই ২০০৪ সালে কংগ্রেসের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী প্রকাশ জয়সোয়াল লোকসভায় জানান, ভারতে মোট ১ কোটি ২০ লক্ষ ৫৩ হাজার ৯৫০ জন বাংলাদেশি রয়েছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি বলছে, বিজেপি সংসদে নাগরিত্ব বিল পাস করে আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি চালু করতে বদ্ধপরিকর। যদিও, মুসলমান আটকালেও কোনো হিন্দু, বৌদ্ধ এবং খ্রিস্টান উদ্বাস্তু বিন্দুমাত্র ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না। কারণ ২০১৫ সালে পাসপোর্ট ও বিদেশি আইন সংশোধন করা হয়ে গেছে। বিজেপির নেতারা বলছেন, শুধুমাত্র বাংলাদেশি মুসলমানদের চিহ্নিত করুন। ভারতীয় মুসলমানদের জন্য এনআরসি নয়। ভারতীয় মুসলমানরা আমার-আপনার ভাই।
