পাঁচ ধাপে শেষ হওয়া পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বিকল্প-বিদ্রোহী প্রার্থী নিয়ে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, ‘উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা না জিতলে সেখানে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরা জয়ী হবেন। তাতে বিএনপির লাভ কী?’
ওইদিন দলীয় সভাপতির ধানমণ্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও বলেছিলেন, ‘বিএনপি মনে মনে কলা খেতে পারে যে তারা উপজেলা নির্বাচনে অংশ না নিলে আওয়ামী লীগের অন্তর্কলহ বাড়বে। তাতে বিএনপির লাভটা কী? ফলাফল কি তাদের পক্ষে আসবে? আওয়ামী লীগের যদি নৌকা প্রার্থী না জেতে, তাহলে বিদ্রোহী প্রার্থী জিতবেন। সেও তো আওয়ামী লীগের।’
ওই সংবাদ সম্মেলনে বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ে এমন বক্তব্য দিয়ে তাদের ব্যাপারে দলের শিথিল অবস্থানের কথা জানালেও গতকাল মঙ্গলবার একই কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে বিদ্রোহীদের ব্যাপারে দেওয়া ওই বক্তব্য অস্বীকার করেছেন ওবায়দুল কাদের।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে পাল্টা তিনি বলেন, বিদ্রোহীদের ব্যাপারে শিথিল অবস্থান জানিয়ে বক্তব্য দিয়েছি কখন, সেই দিনক্ষণ জানান। সংবাদ সম্মেলনের আগে ধানমন্ডির দলীয় কার্যালয়ে সম্পাদকমন্ডলীর সভা হয়। সংবাদ সম্মেলনে ওবায়দুল কাদের ঘোষণা করেন, উপজেলা নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণ দর্শানোর চিঠি দেবে আওয়ামী লীগ।
ওবায়দুল কাদের ৮ সেপ্টেম্বর থেকে এই চিঠি দেওয়া শুরু হবে জানালে, সাংবাদিকরা পাল্টা প্রশ্ন করেন বিদ্রোহীদের ব্যাপারে সংবাদ সম্মেলন করে আপনি জানিয়েছিলেন দলের শিথিল অবস্থানের কথা। তখন তিনি তা অস্বীকার করেন। এরপর সাংবাদিকরা তার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, বিদ্রোহী প্রার্থীদের অভিযোগ কেন্দ্রীয় নেতারাই তো প্রার্থী হতে উৎসাহ জুগিয়েছেন। জবাবে তিনি বলেন, এমন কোনো অভিযোগ থাকলে কারণ দর্শানোর যে চিঠি দেওয়া হবে সেখানে অভিযুক্তরা কেন্দ্রকে অবহিত করলে আমরা ব্যবস্থা নেব।
ওবায়দুল কাদের বলেন, আগস্ট শোকের মাস। এই মাসে কিছু কিছু সিদ্ধান্ত আছে সেগুলো আমরা বাস্তবায়ন স্থগিত রাখি। ইন্টারনাল কিছু সিদ্ধান্ত আছে যেগুলো আমরা আগস্ট মাসে বাস্তবায়ন থেকে বিরত থাকি। জুলাই মাসে দলের কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় উপজেলা নির্বাচনে বিদ্রোহী এবং বিদ্রোহের মদদদাতাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। আগস্ট মাস থাকায় সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন আমরা স্থগিত রেখেছিলাম। আজকের সভায় সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে, আমরা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর করতে শুরু করব। এটাই আমাদের সিদ্ধান্ত।
তিনি বলেন, ৮ তারিখের আগে আমরা অরগানাইজিং সেক্রেটারি, জয়েন্ট সেক্রেটারি যারা বিভিন্ন বিভাগের দায়িত্বে আছি, তারা বৈঠক করব। এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থাটা যাতে নিখুঁত উপায়ে এবং এটা সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কার্যকর করা যায় সে জন্যই আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখার কাজ করছি। তবে ৮ তারিখ থেকে চিঠি দিতে শুরু করব। সেটাই আজ (গতকাল) আমাদের সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে।
উপজেলা নির্বাচনের আগে জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি স্থানীয় সরকারের অন্যান্য নির্বাচনেও বিদ্রোহী প্রার্থী ছিল। তাদের ব্যাপারে কেন সিদ্ধান্ত হয়নি সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক বলেন, ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের কারণে তখন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। ডিসিপ্লিন ব্রেক হলে এই প্রবণতা চলতেই থাকবে এবং এটা দলের জন্য কোনো ভালো ফল বয়ে আনবে না। সে কারণে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি ডিসিপ্লিন ব্রেক হলে আমরা ব্যবস্থা নেব।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তাদের শোকজ করা হবে, শোকজের জবাব তো তারা দেবে? তারা নিশ্চয়ই সেখানে বলবে কোন কেন্দ্রীয় নেতা তাকে এনকারেজ করেছে। এটা তো বিচ্ছিন্নভাবে আমি এভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারি না।
‘সেপ্টেম্বর মাসের ১৪ তারিখে আমাদের নেক্সট ওয়ার্কিং কমিটির মিটিং অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা আছে, সেখানেই আমরা আমাদের পরবর্তী করণীয়, সাংগঠনিক বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। মিটিংয়ের পর আমরা দেশব্যাপী সাংগঠনিক সফরে যাব।’ বলেন ওবায়দুল কাদের।
সাংবাদিকদের আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের যেসব শাখা মেয়াদোত্তীর্ণ, সেসব জায়গা নিয়ে ওয়ার্কিং কমিটিতে আলোচনা করে যেখানে যেখানে ঘাটতি আছে, সমস্যা আছে তার সমাধান করা হবে। কোথাও কোনো সাংগঠনিক অচলাবস্থা থাকলে আলাপ-আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
অক্টোবরে জাতীয় সম্মেলন হবে কি না, এমন প্রশ্নে ওবায়দুল কাদের বলেন, সেটা ওয়ার্কিং কমিটির মিটিংয়ে আলোচনা হতেই পারে। আমরা সম্মেলন করার জন্য প্রস্তুত। আমাদের নেত্রী যখনই সিদ্ধান্ত নেবেন, তখনই আমরা প্রস্তুত।
সংবাদ সম্মেলনে আসাম থেকে কয়েক লাখ মানুষকে ফেরত পাঠানো নিয়ে রাজ্যটির অর্থমন্ত্রী যে বক্তব্য দিয়েছেন সে প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ওবায়দুল কাদের বলেন, আসাম রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্ত আমরা বিচার করছি না। সেন্ট্রালি ইন্ডিয়ান গভর্নমেন্টের যে সিদ্ধান্ত সেই সিদ্ধান্তে আমাদের সঙ্গে তাদের যে এক্সচেঞ্জ হয়েছে তাতে আমরা যেটা পেয়েছি সেটা হচ্ছে যে তারা আগামী চার মাসে তাদের যাদের স্টেটলেস হিসেবে ডিক্লেয়ার করা হয়েছে, তাদের আপিল করার সুযোগ আছে। আমরা সাধারণভাবে জানি সেভেনটি ওয়ানের পর বাংলাদেশের কোনো লোক ইন্ডিয়ায় যায়নি বা মাইগ্রেট করেনি।
তিনি বলেন, কাজেই আমাদের এখনই নিজেদের ঘাড়ে নিজেরা দোষ চাপানোর কোনো কারণ নেই। এ নিয়ে আমাদের তারা আশ্বস্ত করেছেন, আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো বিষয় এখন পর্যন্ত নেই। এ সময় মিয়ানমারের রোহিঙ্গা পরিস্থিতি ও আসামের অনাগরিক পরিস্থিতি একইভাবে দেখার সুযোগ নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আব্দুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, বি এম মোজাম্মেল হক, মেজবাহ উদ্দিন সিরাজ, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, এ কে এম এনামুল হক শামীম, মহিবুল হাসান নওফেল, দপ্তর সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপ, শ্রমবিষয়ক সম্পাদক হাবিবুর রহমান সিরাজ, কৃষি ও সমবায়বিষয়ক সম্পাদক ফরিদুন্নাহার লাইলী, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার আবদুস সবুর, বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন, উপদপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া প্রমুখ।
