উপনিবেশবাদের সমাপ্তি ঘটলে ইউরোপের হাত থেকে পরাশক্তির মুকুট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে চলে যায়। এই শ্রেষ্ঠত্ব রাতারাতি তৈরি হয়নি। দুটো বিশ্বযুদ্ধ, ইউরোপের অর্থনৈতিক মন্দা এবং প্রযুক্তির উত্থানে আমেরিকা হয়ে উঠেছে এক অজেয় শক্তি। এই শক্তি অর্জনের পথে আমেরিকার আলোচিত যুদ্ধগুলো নিয়ে লিখেছেন এস এম সোহাগ
আফগান যুদ্ধই মার্কিন ইতিহাসে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে দীর্ঘতম যুদ্ধ। তবে, ভিয়েতনাম যুদ্ধও মার্কিন ইতিহাসের বেশ গভীর আঘাতের এক স্থান বলা চলে। ১৯৬০-৭০ পর্যন্ত ভিয়েতনাম যুদ্ধ চললেও শুরুটা নিয়ে বেশ বিতর্ক আছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই মূলত বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় বিভিন্ন দেশে সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত হয় আমেরিকা। মার্কিন গণমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনের আলোকে যুদ্ধগুলোর তথ্য দেওয়া হয়েছে।
মেক্সিকো যুদ্ধ
আমেরিকানদের অন্যতম লাভজনক সংঘাত হলো মেক্সিকো যুদ্ধ। ১৮৪৬ থেকে ১৮৪৮ সালের মধ্যে সংঘটিত মেক্সিকো-আমেরিকা যুদ্ধটি হলো বিদেশের মাটিতে আমেরিকার প্রথম যুদ্ধ। এই যুদ্ধটি ছিল রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত এবং অপ্রস্তুত মেক্সিকোর বিরুদ্ধে আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেমস কে পোলকের চাপিয়ে দেওয়া একটি যুদ্ধ। এর উদ্দেশ্য ছিল আমেরিকার সীমানাকে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত করা। তৎকালীন আমেরিকা এবং মেক্সিকোর মধ্যবর্তী রিও গ্র্যান্ডে যুদ্ধ শুরু হয় এবং যুদ্ধে একে একে আমেরিকা জিততে থাকে। চূড়ান্তভাবে জয়ী হওয়ার পর মেক্সিকোর ভূখণ্ডের ৩ ভাগের ১ ভাগ ভূখণ্ড আমেরিকার দখলে চলে আসে।
দুই বছরের যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ২ দশমিক ৭২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করে। দ্বন্দ্বের কেন্দ্র ছিল টেক্সাস, যা মাত্র এক দশক আগে মেক্সিকোর কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করেছিল।
যুদ্ধটি গুয়াদালাপে-হিডালগো চুক্তির আওতায় ১৮৪৮ সালের ২ ফেব্রুয়ারি শেষ হয়েছিল। আজকের আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া, উটাহ, নেভাডা, এরিজোনা এবং নিউ মেক্সিকোর মতো সমৃদ্ধ প্রদেশগুলো একসময়কার মেক্সিকোর অংশ ছিল। ২ দশমিক ৭২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের তুলনায় যা অনেক বেশি। মেক্সিকো যুদ্ধে ১৩ হাজার ২৮৩ মার্কিন সেনা নিহত হয়।
স্পেন যুদ্ধ
১৮৯৮ সালে স্পেনের সঙ্গে একটা ক্ষণস্থায়ী যুদ্ধ করেছিল আমেরিকা। এই যুদ্ধকে প্রায়ই ইতিহাসের প্রথম গণমাধ্যম যুদ্ধ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। স্পেনের কাছ থেকে কিউবার স্বাধীনতা অর্জনে আমেরিকার সংশ্লিষ্টতাকে সংবেদনশীল সাংবাদিকতা তখন দারুণ সমর্থন করেছিল। ১৮৯৮ সালে মার্কিন স্বার্থরক্ষার জন্য হাভানায় পাঠানো ইউএসএস মেরিন অপ্রত্যাশিতভাবে উড়িয়ে দেওয়ার পর আমেরিকান হস্তক্ষেপের প্রয়োজন আরও বেড়ে যায়। মনরো মতবাদের প্রেক্ষাপটে মার্কিন কংগ্রেস আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করে, যা পশ্চিম গোলার্ধে ইউরোপীয় হস্তক্ষেপকে নিষিদ্ধ করে।
মার্কিন বাহিনী বিশ্বজুড়ে স্প্যানিশ বাহিনীকে ধ্বংস করে দেয় এবং আমেরিকা প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপ গুয়াম, পুয়ের্তো রিকো এবং ফিলিপাইন জয় করে। যুদ্ধের ফলে আমেরিকা ঊনবিংশ শতকের শেষভাগেই একটি বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। চার মাস দীর্ঘ সেই যুদ্ধে ২ হাজার ৪৪৫ মার্কিন সদস্য প্রাণ হারায়। বিপরীতে প্রায় ১৬ হাজার স্প্যানিশ সৈন্য প্রাণ হারিয়েছিল। ইউএস টুডের এক প্রতিবেদনে এই যুদ্ধের ব্যয় ধরা হয়েছে ১০ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ
জার্মানির হাত ধরে ইউরোপ তখনো বিশ্বে ক্ষমতার কেন্দ্রে অবস্থান করছিল। ১৯১৪ সালে ইউরোপে যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। এই যুদ্ধে জার্মানির প্রতিপক্ষ হয় ইউরোপের বাকি শক্তি। যুদ্ধের প্রথম তিন বছর আমেরিকা নিরপেক্ষ অবস্থানে ছিল। যুদ্ধে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে জার্মান সাবমেরিনের অবাধ ব্যবহার ফ্রান্স, ব্রিটেনসহ অন্যদের জাহাজকে একে একে ধ্বংস করে দিচ্ছিল। এই পরিস্থিতিই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ধীরে ধীরে সংঘাতের দিকে টেনে নিয়ে যায়।
১৯১৭ সালের ২ এপ্রিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জার্মানির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ময়দানে প্রবেশ করে। তার ঠিক ১৯ মাস পর বিশ্বযুদ্ধের অবসান ঘটে। এই যুদ্ধে ১ লাখ ১৬ হাজার ৫১৬ জন মার্কিন সেনা প্রাণ হারায় এবং ৩৮১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে আমেরিকা।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ
অ্যাডলফ হিটলার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পেছনের খলনায়ক। ১৯৩৯ সালে জার্মানি যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে দেয়। এবার তার সহযোগী ইতালি ও জাপান। প্রথম দিকে এই যুদ্ধে না জড়ালেও ১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর পার্ল হারবারে জাপানিদের বোমা বর্ষণের পরদিনই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মিত্রজোটে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেয় আমেরিকা।
জার্মানি ও ইতালি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার তিন দিন পরই আমেরিকাও দেশ দুটোর বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দেয়, যা ছিল ইতিহাসকে বদলে দেওয়া এক সিদ্ধান্ত।
হিটলারের দুর্ধর্ষ নাৎসি বাহিনী ইউরোপের অধিকাংশ অঞ্চলে জয়লাভ করার পর সোভিয়েত রাশিয়ায় হামলা চালায়। ১৯৪৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা পশ্চিমা ফ্রন্ট খোলার আগেই বিশাল দেশটিতে হামলা চালিয়ে স্থলযুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল জার্মানি। ১৯৪৫ সালের মে মাসে ইউরোপীয় যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে এবং আগস্টে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুম্যান জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা ফেলার নির্দেশ দেন। কোনো যুদ্ধে বিশ্বে প্রথম এবং এখনো একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার হয় সে সময়। যার আঘাতে বিধ্বস্ত হয়ে সে বছরই আত্মসমর্পণ করে জাপান।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে বিশ্বের বৃহত্তম পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং এক স্নায়ুযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জিডিপির ৩৬ শতাংশের বেশি, অর্থাৎ চার ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করেছে আমেরিকা। দেশটির ইতিহাসে এই যুদ্ধকেই সবচেয়ে ব্যয়বহুল বলে বিবেচনা করা হয়। জার্মানির নাৎসি, ইতালি এবং জাপান সাম্রাজ্যকে পরাস্ত করার লড়াইয়ে চার লাখের বেশি মার্কিন সেনা নিহত হয়।
কোরীয় যুদ্ধ
১৯৫০ সালের জুনে, সোভিয়েত ইউনিয়ন সমর্থিত উত্তর কোরিয়ার সামরিক বাহিনী উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়াকে বিভক্তকারী ৩৮তম সমান্তরাল রেখা অতিক্রম করে। এটিই ছিল কোরিয়ান যুদ্ধের শুরু। বিশ্ব তখন সমাজতন্ত্রের বিস্তার দেখছিল। কমিউনিজমের বিস্তারকে ভয় পেয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুমান উত্তর কোরিয়ার সেনাবাহিনীকে দক্ষিণ থেকে উৎখাত করার জন্য জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিলের সমর্থন আদায় করে। তৎকালীন মার্কিন জেনারেল ডগলাস ম্যাক আর্থার উত্তর কোরিয়ানদের ইয়েলো নদীর দিকে ধাওয়া করেছিলেন। এই নদীটি চীন এবং কোরিয়ান উপদ্বীপের মধ্যবর্তী উত্তর সীমান্ত গঠন করেছিল।
ম্যাক আর্থারের ক্রিয়াকলাপকে যুদ্ধ হিসেবে ব্যাখ্যা করে সংঘর্ষে প্রবেশ করে চীনারা। যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত ডুইট আইজেনহোয়ার আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর সমাপ্ত হয়। উত্তর কোরিয়ান বা চীনারা দুদেশের মধ্যে সীমা হিসেবে ৩৮তম সমান্তরাল রেখাকে যদি সম্মান না করে, তবে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি দিয়েছিলেন ডুইট। কোরিয়ান যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৩৮৯ দশমিক ৮১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় হয়েছিল। এ সংঘাতে প্রায় ৩৬ হাজার মার্কিন সেনার জীবনাবসান ঘটে।
ভিয়েতনাম যুদ্ধ
বিশ্বরাজনীতির ইতিহাসে বেশ জটিল এক যুদ্ধের নাম ভিয়েতনাম যুদ্ধ। এটা অনেকের কাছে মার্কিন ইতিহাসের এক ব্যর্থ যুদ্ধ হিসেবে পরিচিত। ১৯৫৪ সালে ভিয়েতনামিরা ফরাসিদের পরাজিত করে উপনিবেশবাদের নৃশংস যুগের অবসান ঘটিয়ে জেনেভা অ্যাকর্ডস ঘোষণা করে। এর পরের বছর দক্ষিণ ভিয়েতনামে নির্বাচন ঘোষণা করা হয়। ১৯৫৫ সালে আঞ্চলিক একটি সংঘাত থেকে ভিয়েতনাম যুদ্ধ রূপ নেয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর পেশিশক্তি প্রদর্শনের ক্ষেত্র হিসেবে। সমাজতন্ত্র এবং পুঁজিবাদের লড়াই ছিল এই যুদ্ধ। ১৯৫৫ সালের শুরুটা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও মার্কিন গণমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টের মতে, এই যুদ্ধ ১৯৬০ সালে শুরু হয়।
কমিউনিজম যেন ছড়িয়ে পড়তে না পারে, সেই সংকল্প নিয়ে আমেরিকা দক্ষিণ ভিয়েতনামের ফরাসি শিক্ষিত, ক্যাথলিক রাজনীতিবিদ এনগো দিন দিয়েমকে সমর্থন জানায়। ১৯৬৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর, দিয়েমকে হত্যা করা হয় এবং নতুন সামরিক নেতৃত্বাধীন দক্ষিণ ভিয়েতনামি সরকার ভিয়েতনামিদের সমর্থন হারাতে শুরু করে। অন্যদিকে, সমাজতান্ত্রিক চীন এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন উত্তর ভিয়েতনামকে সমর্থন জানায় যারা প্রাথমিকভাবে মার্কিন সেনা এবং ঘাঁটি আক্রমণ করার জন্য গেরিলা কৌশল ব্যবহার করে। ১৯৬০-এর দশকের শেষদিকে, যুদ্ধের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জনসাধারণের সমর্থন হারাতে শুরু করে। ১৯৭৩ সালে ভিয়েতনাম থেকে সেনা প্রত্যাহার করে নেয় আমেরিকা। ১৯৭৫ সালে দক্ষিণ ভিয়েতনাম কমিউনিস্ট উত্তর ভিয়েতনামের কাছে পরাজিত হয়। আমেরিকার ইতিহাসে, পুঁজিবাদের ইতিহাসে ভিয়েতনাম যুদ্ধ এক লজ্জার অধ্যায় হিসেবে স্থান করে নিয়েছে।
২০১৯ সালের হিসেবে ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৮৪৩ দশমিক তিন বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা জিডিপির ২ দশমিক ৩ শতাংশ ব্যয় হয়েছিল। সংঘাত অবসানের পর, ওয়াশিংটন ডিসির ভিয়েতনাম ভেটেরান্স স্মৃতিসৌধে ৫৮ হাজারেরও বেশি নিহত সৈন্যের নাম লিপিবদ্ধ করা হয়। এ নিয়ে বিশ্বে অনেক চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে।
ইরাক যুদ্ধ
ইরাক যুদ্ধ এক বিতর্কের নাম। সাম্রাজ্যবাদ ও তেল বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণা চালিয়ে ইরাকে হামলা চালায় বলে কথিত আছে। পশ্চিমা গণমাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে বুশের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে এই যুদ্ধ শুরু করা হয়েছিল বলে প্রচলিত। ইরাকের এই সংঘাতের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে প্রায় এক ট্রিলিয়নের বেশি মার্কিন ডলার ব্যয় করতে হয়।
সাদ্দাম হোসেনের কাছে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের অস্ত্র রয়েছে বলে প্রচারণা চালিয়ে করে মার্কিন সেনারা ২০০৩ সালে ইরাকে আক্রমণ করে সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাত করে। পরে মার্কিন সরকার ইরাকে নির্বাচনকে বিবেচনা করার পাশাপাশি অঞ্চলটির স্থিতিশীলতা রক্ষায় সহায়তা করার জন্য সামরিক কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেয়। যদিও, দেশটি এখনো সংঘাত ও সন্ত্রাসের ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত। এখন পর্যন্ত সাদ্দাম হোসেনের সেই বিধ্বংসী অস্ত্রের সন্ধান দিতে পারেনি আমেরিকা। সাত বছর পাঁচ মাসব্যাপী এই যুদ্ধে ৪ হাজার ৪১০ জন মার্কিন সেনার মৃত্যু হয়।
আফগান যুদ্ধ
আমেরিকার ইতিহাসে এক দীর্ঘকালীন যুদ্ধের নাম আফগানিস্তান। ২০০১ সালে শুরু হয়ে এখনো চলছে সেই যুদ্ধ। বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০১ সালে ৯/১১ হামলার এক মাস পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে বিমান হামলা শুরু করে। ওসামা বিন লাদেনের নেতৃত্বে আল-কায়েদা ৯/১১ হামলা চালিয়েছে এমন অভিযোগ এনে তালিবান নেতৃত্বাধীন আফগান সরকারের কাছে বিন লাদেনকে হস্তান্তর করার আহ্বান জানায়। তালেবানরা সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে আমেরিকা সরাসরি যুদ্ধের সূত্রপাত করে।
এক আন্তর্জাতিক জোটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে শিগগিরই তালেবানদের আফগানিস্তানের ক্ষমতা থেকে অপসারণ করে আমেরিকা। তবে উৎখাতের পর তালেবানরা একটি বিদ্রোহী গেরিলা বাহিনীতে পরিণত হয় এবং মারাত্মক আক্রমণ চালিয়ে মার্কিন সমর্থিত-পরবর্তী আফগান সরকারকে অস্থিতিশীল করে তোলে।
২০১৪ সালে মিশন শেষ করে আন্তর্জাতিক জোট শুধু আফগান বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্যই সেখানে ছিল। তবে, বিমান হামলাসহ যুদ্ধ চালিয়ে যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। গত বছর বিবিসির অনুসন্ধানে আফগানিস্তানের ৭০ শতাংশ অঞ্চলে তালিবানদের সক্রিয়তার খোঁজ মেলে।
২০০১ সালের হামলার পর থেকে আফগানিস্তানে আন্তর্জাতিক জোট বাহিনীর প্রায় সাড়ে তিন হাজার সৈন্য মারা গেছে। এর মধ্যে ২ হাজার ৩০০ জনেরও বেশি আমেরিকান। নিহতদের তালিকায় আফগান বেসামরিক নাগরিক, জঙ্গি এবং সরকারি বাহিনীর সংখ্যা পরিমাপ করা আরও কঠিন। ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারির এক প্রতিবেদনে জাতিসংঘ বলেছে, এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত ৩২ হাজারেও বেশি বেসামরিক লোক মারা গেছে। ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াটসন ইনস্টিটিউট বলছে, ৫৮ হাজার সুরক্ষাকর্মী এবং ৪২ হাজার বিরোধী যোদ্ধা নিহত হয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন, যা নিয়ে এখনো নিয়মিত তালিবান-মার্কিন শান্তি আলোচনা চলছে। সম্প্রতি আফগানিস্তান থেকে ২০ সপ্তাহের মধ্যে ৫ হাজার ৪০০ সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয় ওয়াশিংটন। শান্তি আলোচনা চলাকালীনই তালেবান হামলায় আফগানিস্তানের অবস্থার অবনতি ঘটে। আর কত দিন আমেরিকা এই যুদ্ধ চালিয়ে যাবে, তা এখনই বলা মুশকিল, তবে এটা যে দেশটির অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব রাখছে বলে ট্রাম্পের একাধিক বক্তব্যে ইঙ্গিত মিলেছে। এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আনুমানিক ৯১০ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় হয়েছে। বুশ থেকে শুরু করে শান্তিতে নোবেল জয়ী মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এবং ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলেও সেই যুদ্ধ চলমান।
