জিম্বাবুয়ের মুগাবের জীবনাবসান

আপডেট : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৩:৫৩ এএম

জিম্বাবুয়ের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও স্বাধীনতা-উত্তর নেতা রবার্ট মুগাবে গতকাল শুক্রবার সকালে মারা গেছেন। দেশটির স্বাধীনতা আন্দোলনের এ নেতা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও দেশের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের অবসানের আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু তার সেই আশ্বাস ধূলিসাৎ হয়ে যায় অর্থনৈতিক মন্দা, দুর্নীতি ও সহিংসতার প্রকোপে। শেষদিকে তিনি হয়ে ওঠেন চরম স্বৈরাচারী। এজন্যই অবশ্য তিন দশক ক্ষমতায় থাকার পর ২০১৭ সালের নভেম্বরে সেনা অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হন। তবে পশ্চিমা নীতির, বিশেষ করে যুক্তরাজ্যের কড়া সমালোচনা করার কারণে একসময়কার সমৃদ্ধিশালী দেশকে দুর্দশার মুখে ঠেলে দিলেও তার জন্য আফ্রিকার অন্যান্য দেশের নেতার সমর্থনের কমতি ছিল না কখনো। শ্বেতাঙ্গ শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম নেতার মর্যাদা পেয়েছিলেন রবার্ট মুগাবে।

তবে আফ্রিকান নেতাদের প্রিয় মানুষটি দীর্ঘদিন সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেলেন গতকাল। তার বয়স হয়েছিল ৯৫ বছর। খবর বিবিসি।

দেশটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট এমারসন এমনানগাগোয়া এক টুইটবার্তায় বলেন, ‘গভীর শোকের সঙ্গে জিম্বাবুয়ের প্রতিষ্ঠাতা সাবেক প্রেসিডেন্ট রবার্ট মুগাবের মৃত্যু সংবাদ আমাকে জানাতে হচ্ছে। তিনি ছিলেন আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতীক, প্যান-আফ্রিকা মতবাদের একজন সমর্থক, যিনি তার জীবন উৎসর্গ করেছিলেন জনগণের মুক্তি আর ক্ষমতায়নের জন্য।’ দেশটির শিক্ষা সচিব ফাদাজায়ি মাহেরি মুগাবের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে টুইটবার্তায় বলেন, ‘শান্তিতে থাকুন, রবার্ট মুগাবে।’

জিম্বাবুয়ের স্বাধীনতার পর ১৯৮০ সালে হওয়া প্রথম নির্বাচনে জয়লাভ করে প্রধানমন্ত্রী হন মুগাবে। ১৯৮৭ সালে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর বিলুপ্ত ঘোষণা করে দেশের প্রেসিডেন্ট হন।

১৯২৪ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন রোডেশিয়ায় জন্মগ্রহণ করা এ নেতার বাবা ছিলেন সংখ্যাগরিষ্ঠ ‘শোনা’ ভাষাভাষী গোষ্ঠীর সদস্য এবং পেশায় একজন কাঠমিস্ত্রি। মুগাবে রোমান ক্যাথলিক মিশন স্কুলে পড়ালেখা শেষ করে শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পান। ঘানায় শিক্ষক হিসেবে পেশাগত জীবন শুরু করার আগে দক্ষিণ আফ্রিকার ফোর্ট হেয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কলারশিপ পান। ঘানায় কাজ করার সময় সেখানকার স্বাধীনতা-পরবর্তী নেতা কোয়ামে এনক্রুমাহর আফ্রিকান একত্ববাদের আদর্শ তাকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করে। ১৯৬০ সালে রোডেশিয়ায় ফিরে যান মুগাবে। তখনই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৬৪ সালে রোডেশিয়ার সরকারের সমালোচনা করায় এক দশকেরও বেশি সময় কারাবাস করেন তিনি। ১৯৭৩ সালে কারাগারে থাকাকালেই জিম্বাবুয়ে আফ্রিকান ন্যাশনাল ইউনিয়ন  প্রতিষ্ঠাতা করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

১৯৮০ সাল থেকে দুই মেয়াদে প্রায় ৩৭ বছর জিম্বাবুয়ে শাসন করেছেন রবার্ট মুগাবে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট দুই পদেই দায়িত্ব পালন করেছেন আলোচিত এ নেতা। তার শাসনকালটি ছিল দেশটির জন্য বৈচিত্র্যময় এক অধ্যায়। তিনি নানা সময়ে নিয়েছেন নানা নীতি।

বন্ধুত্বপূর্ণ নীতি : আগ্রাসী মনোভাবের জন্য খ্যাতি থাকলেও আলোচনার ক্ষেত্রে মুগাবের দক্ষতার কারণে সাবেক সমালোচকরা পরে যথেষ্ট প্রশংসা করেছেন তার। সংবাদমাধ্যম তাকে ‘চিন্তাশীলের গেরিলা’ উপাধিতে ভূষিত করেছিল। ১৯৮০ সালে বন্ধুত্বপূর্ণ নীতি অবলম্বন করার ঘোষণা দেন মুগাবে। সেবারের নির্বাচনে ‘স্বঘোষিত মার্কসবাদী’ মুগাবে যখন জয়লাভ করেন তখন অনেক শ্বেতাঙ্গই রোডেশিয়া ত্যাগ করার প্রস্তুতি নিতে থাকেন। তবে তার মধ্যমপন্থি এবং শান্তিপূর্ণ বক্তব্য তার অনেক সমর্থককেই সে সময় আশ্বস্ত করেছিল। সে সময় তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে বিরোধীদের ভুক্তভোগী করা হবে না এবং ব্যক্তিগত সম্পদকে রাষ্ট্রের দখলে নেওয়া হবে না। তিনি দাবি করেছিলেন তার রাজনীতির মূল প্রতিপাদ্যই হবে বন্ধুত্বপূর্ণ। কিন্তু মুগাবে ধীরে ধীরে তার রাজনৈতিক বিরোধীদের কণ্ঠরোধ করেছিলেন।

ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ক্ষতিগ্রস্ত করেন কৃষি খাত : জিম্বাবুয়ের সেনাবাহিনীর ফিফথ ব্রিগেডের (যারা উত্তর কোরিয়ায় প্রশিক্ষণ নিয়েছিল) পরিচালনা করা হত্যার সঙ্গে মুগাবে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ উঠলেও তাকে কখনো বিচারের সম্মুখীন হতে হয়নি। বৈষম্যমুক্ত সমাজ তৈরিতে তার কিছু সাফল্য থাকলেও ১৯৯২ সালে ভূমি অধিগ্রহণ আইনপ্রণয়ন করে কোনো আবেদন ছাড়াই ভূমি অধিগ্রহণের নিয়ম তৈরি করেন।

বিদেশি বিনিয়োগ : জিম্বাবুয়ের কৃষি খাত প্রায় ধ্বংসের মুখে যাওয়ার কারণে মুগাবের সমালোচকরা তাকে দোষারোপ করেন। সমালোচকদের দাবি ছিল, জমির মালিকানা পুনর্বিন্যাস করার পর গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে তা হস্তান্তর করার বদলে নিজের পছন্দের ব্যক্তিদের সেসবের দায়িত্ব দেন তিনি। আফ্রিকার সবচেয়ে বেশি খাদ্য উৎপাদন করা দেশগুলোর একটি থেকে দ্রুত বিদেশি বিনিয়োগনির্ভর দেশে পরিণত হয় জিম্বাবুয়ে।

বিরোধীদের দমন ও বৈশ্বিক বিচ্ছিন্নতা : ২০০২ সালের নির্বাচনে মুগাবের বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ভয়ভীতি দেখানো এবং অনেক গ্রামে ভোটারদের ভোট দেওয়া থেকে রুখতে ভোটকেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। সহিংসতা এবং জালিয়াতির অভিযোগ থাকায় সে সময় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন সেই নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্যতা দেয়নি। তারপর থেকেই মুগাবে এবং জিম্বাবুয়ে বাকি বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে শুরু করে। দেশের গণতন্ত্র পরিস্থিতি উন্নয়নের আগপর্যন্ত কমনওয়েলথের বৈঠক থেকেও জিম্বাবুয়েকে নিষিদ্ধ করা হয়।

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ : ২০০৫ সালে জিম্বাবুয়েতে কালোবাজারি বন্ধ করার লক্ষ্যে অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত দেন মুগাবে, যার ফলে রাস্তায় ব্যবসা করা ৩০ হাজার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার হন এবং আনুমানিক সাত লাখ জিম্বাবুইয়ান গৃহহীন হয়ে পড়েন।

পতনের শুরু : ২০০৮-এর মার্চে প্রথম দফা নির্বাচনে হারলেও জুনে দ্বিতীয় দফায় তার প্রতিদ্বন্দ্বী মি. সভাঙ্গিরাই প্রার্থিতা প্রত্যাহার করলে আবারও নির্বাচিত হন তিনি। ২০১৭-এর ১৫ নভেম্বর গৃহবন্দি হন মুগাবে এবং তার চার দিন পর তার রাজনৈতিক দল জানু-পিএফ পার্টির শীর্ষ নেতার পদ থেকে প্রতিস্থাপিত হন। পদত্যাগে বাধ্য হওয়ার আগে তিনি এবং তার পরিবার ভবিষ্যতে যাতে বিচারের সম্মুখীন না হনÑ সেজন্য একটি চুক্তিও করেন। এর ফলে তার কিছু ব্যবসায়িক স্বার্থও রক্ষা হয়েছিল। তিনি কূটনৈতিক মর্যাদাসহ গাড়ি-বাড়িরও সুবিধা ভোগ করছিলেন। পরে অনাড়ম্বরপূর্ণ ও রক্ষণশীল পোশাকেই তাকে দেখা যেত। বন্ধু হোক আর শত্রু হোক, সবাইকেই সন্দেহ করা শুরু করেছিলেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত