জিম্বাবুয়ের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতীক রবার্ট গাব্রিয়েল মুগাবে। মাতৃভূমিকে ব্রিটিশ উপনিবেশের কবল থেকে মুক্ত করতে দীর্ঘ সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছিলেন তিনি। তিনিই ছিলেন জিম্বাবুয়ের প্রথম প্রধানমন্ত্রী। পরে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করে দেশটির দণ্ডমুণ্ডের কর্তা ছিলেন একাধারে ৩৭ বছর। এই দীর্ঘ সময়ে আফ্রিকার জননন্দিত নেতা থেকে ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছিলেন নির্মম স্বৈরশাসকে। সদ্যপ্রয়াত মুগাবেকে নিয়ে লিখেছেন পরাগ মাঝি
শিক্ষক থেকে মুক্তিসংগ্রামী
যৌবনের শুরুতে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন রবার্ট মুগাবে। সে সময় বর্তমান জিম্বাবুয়ের নাম ছিল রোডেশিয়া। দক্ষিণ রোডেশিয়া, উত্তর রোডেশিয়া এবং ঘানায় তিনি বেশ কয়েক বছর বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন। শিক্ষকতা করার সময়ই তিনি পশ্চিমা দেশগুলোর তীব্র সমালোচক হয়ে ওঠেন, বিশেষ করে ব্রিটেন। কারণ ব্রিটিশরা তার দেশে উপনিবেশ স্থাপন করেছিল। ব্রিটিশদের ছত্রছায়ায় রোডেশিয়া শাসন করছিল সংখ্যালঘু শ্বেতাঙ্গ গোষ্ঠী। ব্রিটেনকে সবসময় ‘শত্রু দেশ’ বলে আখ্যায়িত করতেন মুগাবে।
শাসক হয়ে বিরোধীদের ওপর নির্মম অত্যাচার, এক সময়ের সমৃদ্ধ দেশকে তলানিতে নিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও তার প্রতি অন্য আফ্রিকান নেতাদের সমর্থন বজায় ছিল। এর একমাত্র কারণ হলো- উপনিবেশ বিরোধী যুদ্ধে তিনি ছিলেন নায়ক।
১৯২৪ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি দক্ষিণ রোডেশিয়ার কোটামা জেলায় একটি দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মুগাবে। তার বাবা ছিলেন কাঠমিস্ত্রি। দেশটির সংখ্যাগুরু সোনাভাষী জনগোষ্ঠীতে জন্ম নেওয়া মুগাবে রোমান ক্যাথলিক মিশনারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পড়াশোনা করেন। পরে বৃত্তি নিয়ে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার ফোর্ট হেয়ার ইউনিভার্সিটিতে পড়তে যান। সেখান থেকে শিক্ষকতা পেশাকে বেছে নিয়ে তিনি ঘানায় পাড়ি জমান। সেখানেই ঘানার স্বাধীনতা সংগ্রামী নেতা কামি নকরুমার আফ্রিকান জাতীয়তাবাদী আদর্শে (প্যান আফ্রিকানিজম) অনুপ্রাণিত হন। মুগাবের প্রথম স্ত্রী সেলি ছিলেন ঘানার বাসিন্দা।
১০ বছরের কারাদণ্ড
১৯৬০ সালে জিম্বাবুয়েতে ফিরে আসেন মুগাবে। জিম্বাবুয়ে আফ্রিকান ন্যাশনাল ইউনিয়নের (জানু)-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হওয়ার আগে তিনি আফ্রিকান জাতীয়তাবাদী জশোয়া এনকোমোর সঙ্গে কাজ শুরু করেন।
১৯৬৪ সালে শ্বেতাঙ্গ শাসক ইয়ান স্মিথ এবং তার সরকারকে তীব্র কটাক্ষ করার দায়ে মুগাবেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় শেষ পর্যন্ত তার ১০ বছরের জেল হয়। জেলে থাকার সময়ই তার নবজাতক সন্তানের মৃত্যু হয়। সন্তানের শেষকৃত্যে অংশগ্রহণের জন্য তিনি অনুমতি চেয়েও পাননি।
১৯৭৩ সালে জেলে থাকা অবস্থায় তাকে তার দল জিম্বাবুয়ে আফ্রিকান ন্যাশনাল ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট করা হয়। ১৯৭৪ সালে মুক্তি পাওয়ার পরই তিনি মুজাম্বিকে পালিয়ে যান এবং সেখান থেকে নিজ দেশে শ্বেতাঙ্গ সরকারের বিরুদ্ধে গেরিলা কর্মকা- চালাতে থাকেন। এ সময় জশোয়া এনকোমো’র জিম্বাবুয়ে আফ্রিকান পিপলস ইউনিয়নের (জাপু) সঙ্গে জোটবদ্ধ হয় মুগাবের নেতৃত্বধীন দল জানু।
দ্য থিংকিং ম্যানস গেরিলা
একসময় রোডেশিয়ার স্বাধীনতা প্রসঙ্গে একটি জটিল আলোচনার সূত্রপাত হয়। সে সময় স্বাধীনতাকামী কৃষ্ণাঙ্গ নেতাদের মধ্যে রবার্ট মুগাবে ছিলেন সবচেয়ে আক্রমণাত্মক এবং নিজের দাবিতে অবিচল। ১৯৭৬ সালে তাকে আলোচনায় আহ্বান জানানো হলে তিনি লন্ডন সফর করেন।
মধ্যস্থতায় তার দক্ষতা ছিল দেখার মতো। আলোচনার টেবিলে বসে তার একসময়ের তীব্র সমালোচকদেরও সমীহ আদায় করতে সক্ষম হন। গণমাধ্যমও তার ভূয়সী প্রশংসা করে তাকে ‘দ্য থিংকিং ম্যানস গেরিলা’ বা চিন্তাশীলের গেরিলা আখ্যা দেয়।
জিম্বাবুয়ের স্বাধীনতা ও নির্বাচন
আলোচনার ধারাবাহিকতায় ১৯৭৯ সালে লন্ডনের ল্যাঙ্কাস্টার হাউস চুক্তি বলে রোডেশিয়ার নাম বদলে গণপ্রজাতন্ত্রী জিম্বাবুয়ের নতুন সংবিধান প্রণয়ন করা হয় এবং ১৯৮০ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশটির সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়া হয়। এই নির্বাচনে দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ কালো মানুষরা প্রথমবারের মতো অংশগ্রহণের সুযোগ পায়।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এনকোমোর সঙ্গে মুগাবের সম্পর্ক তিক্ত হয়ে ওঠে। তারা শেষ পর্যন্ত আলাদা প্লাটফর্ম থেকে নির্বাচনে অংশ নেন। ভোটের ফলাফল অবিশ্বাস্য সাফল্য এনে দেয় মুগাবেকে। নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকরা তার বিজয়কে অপ্রত্যাশিত বিজয় হিসেবে আখ্যায়িত করে। দেশটির ৮০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ৫৭টি আসনে বিজয় লাভ করে স্পষ্টতই সবার ধারাছোঁয়ার বাইরে চলে যায় মুগাবের দল জানু। তবে, এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষই একে অপরের প্রতি ভোট জালিয়াতি এবং কেন্দ্র দখলের অভিযোগ আনে। দেশটির ৪০টি আসন শ্বেতাঙ্গদের জন্য নির্ধারিত ছিল।
ক্ষমতার শুরু
একজন স্বঘোষিত মার্কসিস্ট ছিলেন মুগাবে। বিজয়ের পর তার সমর্থকরা যখন রাস্তায় নেচে গেয়ে উল্লাস করছিল, সে সময় রোডেশিয়ার শেতাঙ্গ জনগোষ্ঠী দেশ ছাড়ার জন্য নীরবে ব্যাগ গোছাতে শুরু করে।
তবে, প্রথম দিকে মুগাবের প্রগতিশীল এবং বন্ধুত্বপূর্ণ আহ্বান তার অনেক বিরোধীকেই কিছুটা আশ্বস্ত করেছিল। তিনি একটি বহুদলীয় সরকার ব্যবস্থার ঘোষণা দিয়েছিলেন। এও জানিয়েছিলেন, ব্যক্তিগত সম্পদের ওপর তার সরকার কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করবে না। বিরোধীদের বলেছিলেন, ‘সবাইকে সঙ্গে নিয়েই আমি কাজ করব।’
ক্ষমতায় আসার এক বছরের মধ্যেই মুগাবে তার অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণ করেন। সে অনুযায়ী, তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগগুলোকে সর্বজনীন বিনিয়োগের সঙ্গে একীভূত করেন। তিনি স্বাস্থ্য এবং শিক্ষাক্ষেত্রে জিম্বাবুয়ের কালো মানুষদের সুযোগকে আরও প্রসারিত করেন। এর আগে শ্বেতাঙ্গ শাসন আমলে কৃষ্ণাঙ্গরা এই ক্ষেত্রগুলোতে বৈষম্যের শিকার হতো।
গণতন্ত্রের বুলি আওড়িয়ে বিরোধী নিধন
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর মুগাবে ধীরে ধীরে একদলীয় শাসনব্যবস্থা কায়েম করার প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন। তার এই নীতি এনকোমো’র সঙ্গে বিরোধকে আরও উসকে দেয়। এই বিরোধের মধ্যেই এনকোমো নেতৃত্বাধীন দল জাপু’র অধীনে বিপুল সংখ্যক অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা ঘটে। এই ঘটনার সূত্র ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে থেকে এনকোমোকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
মুখে গণতন্ত্রের বুলি আওড়ে আওড়ে মুগাবে আসলে বিরোধীদের কণ্ঠরোধ করার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝিতে জিম্বাবুয়ের এনডিবেল গোষ্ঠীর ওপর জাতিগত নিধন শুরু হয়। এতে এনডিবেল গোষ্ঠীর কয়েক হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়। জিম্বাবুয়ের মাতাবিলেল্যান্ডে বসবাস করা এই জনগোষ্ঠী ছিল মূলত এনকোমো’র সমর্থক।
অভিযোগ ওঠে উত্তর কোরিয়ায় প্রশিক্ষণ নেওয়া জিম্বাবুয়ের সেনাবাহিনীর পঞ্চম ব্রিগেড এমন আরও হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে যায়। এই হত্যাযজ্ঞ সরাসরি মুগাবের নির্দেশেই সংঘটিত হয়। তবে, এ জন্য তাকে অবশ্য কখনোই বিচারের মুখোমুখি হতে হয়নি।
প্রচ- চাপের মুখে এনকোমো শেষ পর্যন্ত তার দল জাপু’কে মুগাবের দল জানু’র সঙ্গে একীভূত করতে বাধ্য হন। বলা যায়, এর মধ্য দিয়ে মুগাবের নেতৃত্বাধীন জানু জিম্বাবুয়েতে এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
প্রেসিডেন্ট ও তার স্ত্রী গুচি গ্রেস মারুফু
১৯৮৭ সালে জিম্বাবুয়ের প্রধানমন্ত্রী অফিস বিলুপ্ত করে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করে রাষ্ট্রপতির পদে আসীন হন মুগাবে। পরে ১৯৯৬ সালে তিনি নির্বাচনে জয়লাভ করে তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসেন। ওই বছরই তিনি বিয়ে করেন তার সহকারী গ্রেস মারুফুকে। এটি ছিল মুগাবের দ্বিতীয় বিয়ে। এই বিয়ের চার বছর আগে ১৯৯২ সালে মুগাবের প্রথম স্ত্রী সেলি ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। জানা যায়, গ্রেসি সহকারী থাকা অবস্থায়ই বয়সে ৪০ বছরের ছোট গ্রেস-এর সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন মুগাবে। সে সময় গ্রেসিও ছিলেন আরেকজনের স্ত্রী। শুধু তাই নয়, গ্রেসকে বিয়ে করার আগেই তার গর্ভে মুগাবের দুই সন্তানের জন্ম হয়। গ্রেসকে বিয়ে করার পর যখন তার তৃতীয় সন্তানের জন্ম হয় ততদিনে মুগাবের বয়স দাঁড়ায় ৭৩ বছর।
জিম্বাবুয়ের রাজনীতিতে গ্রেস মুগাবে একটি বহুল আলোচিত নাম। তার বিলাসবহুল জীবনযাপনের জন্য তিনি বহুবার শিরোনাম হয়েছেন। অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, তার নামই হয়ে যায় ‘গুচি গ্রেস’। জিম্বাবুয়ের সাধারণ মানুষ যখন অনাহার-অর্ধাহারে ভুগছে, গ্রেসি তখন মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার উড়িয়েছেন। শুধু তাই নয়, জিম্বাবুয়ের কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে কারও তোয়াক্কা না করেই তিনি ৫০ লাখ পাউন্ড তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন। উগ্র জীবনযাপনের জন্যও তিনি বিখ্যাত। একবার হংকংয়ে সানডে টাইমস পত্রিকার এক ফটোসাংবাদিকের নাক ফাটিয়ে দিয়েছিলেন গ্রেস। এ ধরনের অপরাধের আইন কঠোর হলেও শুধুমাত্র মুগাবের স্ত্রী বলে পার পেয়ে গিয়েছিলেন তিনি।
জমি দখল ও বিপর্যস্ত কৃষি
ক্ষমতার শুরুর দিকে মুগাবে বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থা তৈরিতে সচেষ্ট ও সফল হলেও ১৯৯২ সালে বিতর্কিত ভূমি অধিগ্রহণ আইন চালু করেন। এই আইনের বলে কারও জমি বাজেয়াপ্ত করলে তার আপিল করারও সুযোগ ছিল না। এর ফলে জিম্বাবুয়ের সংখ্যালঘু সাড়ে চার হাজার শ্বেতাঙ্গ অধিবাসীর বিপুল পরিমাণ ভূ-সম্পদ বেদখল হয়ে যায়।
২০০০ সালের শুরুর দিকে জিম্বাবুয়েতে মুভমেন্ট ফর ডেমোক্রেটিক চেঞ্জ (এমডিসি) বা গণতান্ত্রিক পরিবর্তন আন্দোলন শুরু হলে দারুণ হুমকির সম্মুখিন হয় মুগাবের সরকার। দেশটির সাবেক ট্রেড ইউনিয়ন নেতা মরগ্যান সাভাঙ্গিরাই এর নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। এই আন্দোলনের সমর্থনে থাকা কৃষকদের ওপর চড়াও হন মুগাবে এবং সরকারের বিরোধী শিবিরের পক্ষে থাকা শ্বেতাঙ্গ কৃষকদের খামার দখল এবং তাদের অধীনে থাকা কৃষ্ণাঙ্গ কৃষকদের হত্যা করে মুগাবের তথাকথিত যুদ্ধফেরত বাহিনী।
ধীরে ধীরে জিম্বাবুয়ের কৃষি খাত মুখ থুবড়ে পড়ে। অথচ এই কৃষির ওপর একসময় দারুণভাবে নির্ভর করত দেশটি। জিম্বাবুয়ের এই কৃষি বিপর্যয়ের জন্য সমালোচকরা মুগাবেকে দায়ী করেন। তাদের মতে, ভূমি পুনর্বিন্যাস করতে গিয়ে গ্রামের দরিদ্র কৃষকদের মধ্যে তা বণ্টন না করে নিজের কাছের মানুষদের মধ্যে বণ্টন করেছিলেন মুগাবে।
আফ্রিকার সবচেয়ে বেশি খাদ্য উৎপাদক দেশ থেকে ধীরে ধীরে বিদেশি সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে জিম্বাবুয়ে। একসময় বিদেশি খাদ্য রপ্তানি করা জিম্বাবুয়ের মানুষ অনাহারের কবলে পড়ে।
যেভাবে ক্ষমতা আঁকড়ে ছিলেন
২০০০ সালে হাউস অব অ্যাসেম্বলিতে ১২০ আসনের মধ্যে ৫৭টি আসন পায় মুগাবের দল। যদিও পরে আরও ২০টি আসনে মুগাবের মনোনীত সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করে সংসদে ক্ষমতা ধরে রাখে জানু পার্টি। দুই বছর পর দেশটিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে মুগাবে ৫৬.২ শতাংশ ভোট পেয়ে আবারও প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। সেবার তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মরগ্যান সাভাঙ্গিরাই ৪১.৯ শতাংশ ভোট পান। অভিযোগ রয়েছে ভোটকেন্দ্র বন্ধ করে দিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক ভোটারকে এই নির্বাচনে ভোট দিতে দেওয়া হয়নি। এই নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে বিরোধী শিবির। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়নও এই নির্বাচনকে জোর-জবরদস্তিমূলক হিসেবে চিহ্নিত করে। তারা এই নির্বাচনে মুগাবের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ তোলে। মূলত তখন থেকেই বহির্বিশ্ব থেকে কোণঠাসা হতে শুরু করেন মুগাবে। কমনওয়েলথ থেকেও বহিষ্কার করা হয় জিম্বাবুয়েকে। বলা হয়, যতদিন দেশটির গণতান্ত্রিক পরিস্থিতির উন্নতি না হয়, ততদিন কমনওয়েলথের সঙ্গে জিম্বাবুয়ের কোনো সম্পর্ক থাকবে না।
২০০৫ সালের মে মাসে কালোবাজারি বন্ধে অভিযান পরিচালনা করার নির্দেশ দেন মুগাবে। এই অভিযানে দেশটির ফুটপাতে ব্যবসা করা প্রায় ৩০ হাজার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং দেশজুড়ে অসংখ্য বস্তি রাতারাতি ধ্বংস করে দেওয়া হয়। ফলে দেশটির প্রায় ৭ লাখ মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ে।
২০০৮ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিরোধী প্রার্থী সাভাঙ্গিরাইয়ের কাছে হেরে যান মুগাবে। নির্বাচনে সাভাঙ্গিরাই ৪৭.৯ শতাংশ ভোট পান আর মুগাবে পান ৪৩.২ শতাংশ ভোট। কিন্তু প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য ন্যূনতম ৫০ শতাংশ ভোট পাওয়ার বিধান থাকায় আবারও শীর্ষ দুই প্রার্থীর মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার বাধ্যবাধকতা এসে পড়ে। কিন্তু ওই নির্বাচনটিকে সামনে রেখে সাভাঙ্গিরাইয়ের অনুসারীদের নির্মম নির্যাতন চালানো হয় এবং সাভাঙ্গিরাইয়ে ওপর এমন চাপ প্রয়োগ করা হয় যে, তিনি নিজের প্রার্থিতা থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হন।
গণতান্ত্রিকভাবে বিপর্যস্ত জিম্বাবুয়েতে বহির্বিশ্ব থেকে সাহায্য আসা বন্ধ হয়ে যায়। মুখ থুবড়ে পড়ে অর্থনীতি। দেশটিতে ব্যাপক মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেয়। অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, একটি বার্গার কেনার জন্যও লাখ লাখ ডলার জিম্বাবুইয়ান ডলার খরচ করতে হতো। এর মধ্যে আবার মুগাবের প্রোস্টেট ক্যানসার ধরা পড়ে। তবে, সে সময় এই ক্যানসার প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল। জিম্বাবুয়েতে এর চিকিৎসা সম্ভব হলেও তিনি সিঙ্গাপুরে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা শুরু করেন। দেশের অর্থনীতির বেহাল দশা হলেও তার চিকিৎসার পেছনে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয়।
এদিকে, দেশে রোগবালাই মহামারী আকার ধারণ করে। প্রায় কয়েকশ মানুষ মারা যায় কলেরায় আক্রান্ত হয়ে। কারণ পানি পরিশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক কেনার সামর্থ্যও জিম্বাবুয়ের কোষাগারে ছিল না। তবে, এই পরিস্থিতিতে ক্ষমতা ভাগাভাগির প্রশ্নে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে সম্মত হন মুগাবে। কয়েক মাসের আলোচনার পর ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সাভাঙ্গিরাইকে প্রধানমন্ত্রী করতে সম্মত হন তিনি। স্বাভাবিকভাবেই এ সবই ছিল নামে মাত্র। আসলে বিরোধীদের ওপর মুগাবের নিপীড়ন নির্যাতন কখনোই থামেনি। এদিকে মুগাবের সরকারে প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় সাভাঙ্গিরাইয়ের ইমেজেও প্রভাব পড়ে, কমে যায় তার প্রতি জনসমর্থন।
পতন ঘনিয়ে আসে যখন
২০১৩ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ৬১ শতাংশ ভোট পেয়ে আবারও নির্বাচিত হন ৮৯ বছর বয়সী মুগাবে এবং সাভাঙ্গিরাইকে আঁস্তাকুড়ে ছুড়ে ফেলেন। তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বলে আর কিছু ছিল না। সেবারের নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ উঠলেও, সহিংসতার অভিযোগ ওঠেনি।
বয়স ধীরে ধীরে কাবু করতে শুরু করে মুগাবেকে, প্রকট হয়ে ওঠে স্বাস্থ্য সমস্যা। জল্পনা-কল্পনা শুরু হয় মুগাবে হয়তো শিগগিরই ক্ষমতা থেকে অব্যাহতি নেবেন এবং নিজের উত্তরসূরি ঘোষণা করবেন। কিন্তু সবাইকে অবাক করে ২০১৫ সালে তিনি ঘোষণা করেন, ২০১৮ সালের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। শুধু তাই নয়, ২০১৬ সালে তিনি ঘোষণা করেন, তিনি ততদিন ক্ষমতায় থাকবেন যতদিন ঈশ্বর তাকে বাঁচিয়ে রাখবেন। তবে, শেষ পর্যন্ত ঈশ্বর তুলে নেওয়ার আগেই জিম্বাবুয়ের সেনাবাহিনীর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে বাধ্য হন তিনি। এর কয়েকদিন আগে ২০১৭ সালের ১৫ নভেম্বর তাকে গৃহবন্দি করে দেশটির সেনাবাহিনী এবং দলের শীর্ষপদ থেকে তাকে অপসারণ করে এমারসন মানাঙ্গয়ার হাতে নেতৃত্ব দেওয়া হয়। এই মানাঙ্গয়াকেই বিষপ্রয়োগ করে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ উঠেছিল মুগাবের স্ত্রী গ্রেসির বিরুদ্ধে। ধারণা করা হচ্ছিল মুগাবে তার উত্তরসূরি হিসেবে গ্রেসিকে মনোনীত করবেন। কিন্তু এই মনোনয়নের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন মানাঙ্গয়া।
একটি চুক্তির শর্তে পদত্যাগ করেন মুগাবে। চুক্তি অনুযায়ী, পদত্যাগের পরও তাকে সুরক্ষা দেবে রাষ্ট্র। শুধু তাই নয়, চুক্তি অনুযায়ী কূটনৈতিক মর্যাদাসহ রাষ্ট্রীয় বাড়ি-গাড়ির সুবিধাও ভোগ করবেন তিনি এবং রক্ষা হবে তার ব্যবসায়িক স্বার্থও।
জীবনের শেষ মুহূর্তটি সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে কাটিয়েছেন মুগাবে। আফ্রিকার নায়ক থেকে অত্যাচারী স্বৈরশাসকে পরিণত হওয়া মুগাবে জিম্বাবুয়েকে পতনের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছিলেন।
মুগাবের বিখ্যাত উক্তি
নিজের পদত্যাগ ইস্যুতে
২০১৪ : ‘কেউ কেউ বলছেন, মুগাবের বয়স হয়ে গেছে, তার পদত্যাগ করা উচিত কিন্তু না, যখন সময় আসবে, আমিই আপনাদের বলব।’
২০০৮ : ‘একমাত্র ঈশ্বরই আমাকে অপসারণ করতে পারেন, পারবে না এমডিসি (বিরোধী পক্ষ) কিংবা ব্রিটিশ।’
শ্বেতাঙ্গদের ভূমি অধিগ্রহণের সময়
২০০০ : ‘তোমরা এখন আমাদের শত্রু। কারণ তোমরা জিম্বাবুয়ের সঙ্গে শত্রুতা করেছ। আমরা বিক্ষুব্ধ। আমাদের সবাই বিক্ষুব্ধ। আর তাই আমাদের যুদ্ধ ফেরত সেনারা তোমাদের জমি দখল করে নেবে।’
২০০২ : আমাদের দল শ্বেতাঙ্গদের ভীতসন্ত্রস্ত করে তুলবে, তারাই আমাদের সত্যিকারের শত্রু।
সমকামিতা প্রসঙ্গে
২০১০ : যারা এটা করে তারা কুকুর এবং শূকরের চেয়েও অধম। এটা এক ধরনের পাগলামো, উন্মাদনা।
২০১৩ : বারাক ওবামা এসে বললেন আফ্রিকার উচিত সমকামী বিয়েকে অনুমোদন করা। কিন্তু এই ধরনের অপরাধের জন্য ঈশ্বর পৃথিবীকে ধ্বংস করে দেবেন। বিয়ে শুধু একজন পুরুষ এবং একজন নারীর মধ্যেই সম্ভব।
নিজের বিয়েবহির্ভূত সম্পর্ক নিয়ে
১৯৯৮ : আমি সন্তান চেয়েছিলাম এবং বুঝেছিলাম এই উপায়েই তা পাওয়া সম্ভব। আমি জানতাম আমি কী করছি, আমার স্ত্রীও জানতেন।
মৃত্যু প্রসঙ্গে
২০১২ : নিজের মৃত্যু নিয়ে মিথ্যা সংবাদ প্রকাশিত হলে মুগাবে বলেন, ‘আমি বহুবার মরেছি। এই জায়গায় আমি খ্রিস্টকেও টেক্কা দিয়েছি। কারণ তিনি মাত্র একবার মরেছিলেন এবং একবার মাত্র পুনরুত্থান ঘটেছিল। আমি জানি না, কতবার আমি মরেছি, আর কতবার আবার বেঁচেছি। জানি না, আরও কতবার এটি হবে।’
বর্ণবাদ প্রসঙ্গে
শ্বেতাঙ্গরা আফ্রিকার নয়। আফ্রিকা আফ্রিকানদের জন্য। জিম্বাবুয়ে জিম্বাবুইয়ানদের জন্য। সাদা মানুষরা এখানে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক।
শ্বেতাঙ্গ কৃষকদের খুনিরা বিচারের ঊর্ধ্বে।
যতদিন সাদা গাড়িতে কালো টায়ার ব্যবহৃত হবে, ততদিন বর্ণবাদ থাকবে।
বর্ণবাদ কখনই শেষ হবে না, যদি মানুষ এখনো দুর্ভাগ্যের প্রতীক হিসেবে কালো এবং শান্তির প্রতীক হিসেবে সাদা চিহ্ন ব্যবহার করে।
বর্ণবাদ কখনোই শেষ হবে না যদি এখনো মানুষ বিয়ের অনুষ্ঠানে সাদা পোশাক এবং শেষকৃত্যে কালো পোশাক পরে।
বর্ণবাদ কখনোই যাবে না, যতদিন আমরা কাপড় ধোয়ার সময় সাদাগুলোকে আগে এবং অন্য রঙেরগুলো পরে ধোব।
বর্ণবাদ কখনোই যাবে না, যতদিন বিল ফাঁকি দেওয়াদের কালো তালিকার পরিবর্তে সাদা তালিকাভুক্ত না করা হয়।
‘আমি এসবের তোয়াক্কা করি না এ জন্য যে, আমার টয়লেটের আসন সাদা এবং আমি এখনো সাদা টয়লেট পেপার ব্যবহার করছি। আমি এখনো ভালো আছি।’
