বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত থেকে ‘পাক’ লেখা অপসারণ করে ‘বাংলাদেশ’ লেখা সীমান্ত পিলার বাসাচ্ছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। এক বছর আগে শুরু করা এই কাজ দ্রুতই সম্পন্ন করতে
চায় বিজিবি। এটি সম্পন্ন হলে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের মোট ৪২ হাজার সীমানা পিলারের কোনোটিতে আর ‘পাক’ অর্থাৎ পাকিস্তান লেখা পিলার দেখা যাবে না।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. সাফিনুল ইসলাম গতকাল শনিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার সময় বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ৪২ হাজার সীমানা পিলারের মধ্যে ৬ হাজারের বেশি পাক পিলার ছিল। সাতক্ষীরা, যশোর, চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, পঞ্চগড়, কুড়িগ্রাম, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামসহ সব সীমান্তবর্তী জেলাতেই ‘পাক’ পিলার ছিল। এক বছর আগে ওইসব পাক বা পাকিস্তান লেখা পিলার সরানোর কাজ শুরু করেছি। এসব ‘টি’ পিলার, ‘আর’ পিলার ও মেইন পিলারের এইপাশে বাংলাদেশ, আর ওইপাশে ভারত লেখার কাজ চলছে। ইতিমধ্যে এই কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। আর সাত-আটশ পাক পিলার আছে। চলতি বছরের মধ্যেই এগুলো সরানোর কাজ শেষ হবে বলে আশা করছি।’
বিজিবির কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে যেসব পিলার রয়েছে সেগুলোর মধ্যে ৬ হাজার পিলারে বছর খানেক আগেও এক পাশে ইংরেজিতে খোদাই করে লেখা ছিল ‘ইন্দো’ বা ইন্ডিয়া। আর আরেক পাশে লেখা ছিল ‘পাক’ অর্থাৎ পাকিস্তান। স্বাধীনতার ৪৮ বছরেও সীমান্ত পিলার থেকে ‘পাক’ লেখা অপসারণ না হওয়া ছিল দুঃখজনক।
যশোর ৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল সেলিম রেজা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিজিবির মহাপরিচালকের ব্যক্তিগত নির্দেশনা ও তদারকিতে পাক লেখা পিলারগুলো সরিয়ে ইংরেজিতে ‘বিডি’ বা ‘বাংলাদেশ’ লেখা হচ্ছে। এতে বিজিবির জওয়ানরাই কাজ করছেন। আমরা ইতিমধ্যে যশোর সীমান্তবর্তী পিলারগুলোতে স্বাধীন দেশের নাম ‘বাংলাদেশ’ লেখার কাজ সম্পন্ন করে এনেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই কাজকে সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষও সাধুবাদ জানিয়েছে। এতে স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে সীমান্তবর্তী মানুষের মনোবল আরও বেড়েছে।’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রায় তিন বছর আগে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত থেকে ‘পাক’ লেখা অপসারণ করতে বিজিবির সদর দপ্তর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়। ওই প্রস্তাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্মতি দেওয়ার পর পাক পিলার অপসারণের কাজ শুরু হয়। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সীমান্তে যে কোনো কাজ করতে গেলে বা কোনো পিলার পরিবর্তন করতে গেলে সময় প্রয়োজন। কারণ এক্ষেত্রে উভয় দেশের সম্মতি আবশ্যক। যেসব পিলারে পাক লেখা রয়েছে, ভারতের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে সে সব পিলার থেকে শব্দটি অপসারণ করা হচ্ছে। আবার অনেক এলাকায় সীমান্ত পিলারই ছিল না। সেখানে নতুন করে পিলার বসানো হচ্ছে।’
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘সীমানা পিলার হুট করে বসালেই হয় না। আন্তর্জাতিক সীমান্তে পিলার বসাতে গেলে তার একটি নম্বর প্রয়োজন হয়। দুই দেশের সম্মতি ও অনুমোদনক্রমে সীমানা পিলারের নম্বর ও সাব পিলার নম্বর বসাতে হয়। তাই এই কাজ সময়সাপেক্ষ।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিজিবির এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান ভাগ হওয়ার সময় ৪২ হাজার সীমান্ত পিলার স্থাপন করা হয়। প্রতিটি পিলারে ইংরেজিতে খোদাই করে ইন্দো-পাক (ভারত-পাকিস্তান) লেখা হয়। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর অনেক বছর কেটে গেছে। কিন্তু সীমান্ত পিলারে ‘পাক’ লেখা থেকে গেছে।’
এদিকে ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যেসব সীমান্ত পিলারে এখনো ‘পাক’ লেখা রয়েছে তা পর্যায়ক্রমে অপসারণের কাজ চলমান রয়েছে। অপসারণ করতে দু’পক্ষের প্রতিনিধি উপস্থিত থাকা বাধ্যতামূলক। এ নিয়ে প্রতি বছরই ভারতের সঙ্গে আমাদের বৈঠক হয়। বিজিবি ও বিএসএফের মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকেও প্রায় প্রতি বছরই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। আমরা চাইলেই ‘পাক’ লেখা পিলারগুলো তুলে ফেলতে পারি না। এতে ভারতের সম্মতি ও অনুমোদন প্রয়োজন হয়।’
বিজিবির করা তিন বছর আগের এক হিসাব অনুযায়ী, মোট ৬ হাজার ২৪টি সীমান্ত পিলারে ‘পাক’ লেখা ছিল। যার মধ্যে রয়েছে ৫ হাজার ৫০২টি ‘টি’ পিলার, ৫টি ‘আর’ পিলার, ৪৫৫টি সাব-পিলার এবং ৬২টি মেইন পিলার। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল যশোর, সাতক্ষীরা ও চুয়াডাঙ্গা সীমান্তে। এই তিন জেলার সীমান্তের ২ হাজার ৩৮১ পিলারে ‘পাক’ লেখা ছিল। এছাড়া নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ ও জামালপুর সীমান্তে ১ হাজার ২৭৯টি সীমান্ত পিলারে ‘পাক’ লেখা ছিল। কুড়িগ্রাম, পঞ্চগড়, জয়পুরহাট, দিনাজপুর, নওগাঁ, রংপুর, লালমনিরহাট, সিলেট ও সুনামগঞ্জ সীমান্তেও পাক পিলার ছিল।
