প্রশাসনের ভেতরে শুদ্ধি অভিযান চালানোর জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন নারায়ণগঞ্জের ‘প্রভাবশালী’ আওয়ামী লীগ নেতা ও সংসদ সদস্য একেএম শামীম ওসমান। তিনি বলেছেন, প্রশাসনের ভেতরে শুদ্ধি অভিযান চালান। যারা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের নামে মিথ্যা হত্যা মামলা দিয়েছে, ২০ নেতাকর্মী এখনো জেল খাটছে। তাদের নামে কী উদ্দেশ্যে মামলা দেওয়া হলো তা
খুঁজে বের করতে হবে।
গতকাল শনিবার বিকেলে নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়ার নওয়াব সলিমুল্লাহ সড়কে ‘রুখে দাঁড়াও স্বাধীনতাবিরোধী সকল অপশক্তির বিরুদ্ধে’ শীর্ষক সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে শামীম ওসমান আরও বলেন, পত্রিকায় দেখলাম আমাদের জেলা প্রশাসক বলেছেন, স্বাধীনতাবিরোধী কেউ যেন পুলিশে ঢুকতে না পারে। কথাটি আমার ভালো লেগেছে। কিন্তু শুধু পুলিশ নয়, কোনো জায়গাতেই যেন প্রবেশ করতে না পারে। তিনি বলেন, আজকে হাইব্রিডদের ভিড়ে প্রকৃত আওয়ামী লীগ দূরে সরে যাচ্ছে। যেখানে তাকাই সবাই আওয়ামী লীগ। সিদ্ধিরগঞ্জ হচ্ছে নারায়ণগঞ্জের গোপালগঞ্জ। সেখানে ১নং ওয়ার্ডে এক বাকপ্রতিবন্ধীকে ছেলেধরা আখ্যা দিয়ে নির্মমভাবে পিটিয়ে মারা হয়েছে। এ ঘটনায় ১ থেকে ১০নং ওয়ার্ড পর্যন্ত ৭৪ জন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর নাম উল্লেখসহ আরও ৪শ’ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দেওয়া হলো। মামলায় যে পুলিশ অফিসারকে বাদী করা হয়েছে তিনি নিজে জিডি করে বলেছেন, ওটা তার স্বাক্ষর নয়। তা হলে ওই এসআইর নামে ভুয়া স্বাক্ষর দিয়ে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের নামে মামলা করা হলো কার নির্দেশে? নিরপরাধ নেতাকর্মীদের ২০ জন এখন জেলে। এই দায়ভার কার? শামীম ওসমান বলেন, ঘটনার পর আমি নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপারকে ডেকেছিলাম। পুলিশ সুপার আশ^াস দিয়েছেন, নিরপরাধ কাউকে হয়রানি করা হবে না। অতি উৎসাহী পুলিশ অফিসার ষড়যন্ত্র করছে। অনেক পুলিশ অফিসার অনেক নেতার বিরুদ্ধে নিউজ করতে সাংবাদিকদের কারও কারও কাছে টেক্সট করে। আমি হুশিয়ার করে দিয়ে বলতে চাই, নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগ মানে আগুন, এই আগুন নিয়ে খেলবেন না।
নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি বাবু চন্দন শীলের সভাপতিত্বে সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ বাদল, মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এড. খোকন সাহা, সোনারগাঁ থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি সামছুল ইসলাম ভূইয়া, সিদ্ধিরগঞ্জ থানার সভাপতি মহিবুর রহমান, ফতুল্লা থানার সভাপতি সাইফুল্লাহ বাদল, বন্দর থানার সভাপতি এম এম রশীদ প্রমুখ।
শামীম ওসমান আরও বলেন, জাতির পিতার অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বারবার নারায়ণগঞ্জের নাম উল্লেখ আছে। নারায়ণগঞ্জের বায়তুল আমানে আওয়ামী লীগের জন্ম হয়েছে। স্বাধীনতা সনদ লেখা হয়েছে। তিনি বলেন, ১৯৭৯ সাল। নেত্রী তখনো দেশে ফেরেনি। বঙ্গবন্ধু হত্যার নীলনকশাকারী জিয়াউর রহমান নারায়ণগঞ্জে আসবেন খবর এলো। আমরা চাষাঢ়াতে অবস্থান নিলাম। স্লোগান দিলাম খুনি জিয়া খুনি জিয়া। তখন বিএনপির জন্ম হয়নি। জাগো দলের নেতারা আমাদের অ্যাটাক করল। সাতজন ছেলে ছিলাম। কেউ দৌড় দিলাম না। আমরা সেই খেলোয়াড়। বাবা-মায়ের পর যদি কাউকে মানি, কারও জন্য জীবন দিতে পারি তিনি হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ’৭৫’র পর আমরা যারা রাজনীতিতে এসেছি, আমরা শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক ‘মা’ মনে করি।
শামীম ওসমান বলেন, ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এলো। আমার ভাইয়ের ফ্যাক্টরিতে হামলা করে ৩শ গরুর বান কেটে দেওয়া হয়েছিল। রাজহাঁসের অর্ধেক গলা কেটে দেওয়া হয়েছিল। বাড়িতে গুলি করা হলো। আমার মা এক কাপড়ে বেরিয়ে গেলেন। কিন্তু আমরা তো ক্ষমতায় এসে প্রতিশোধ নেইনি। আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া এম সামছুজ্জোহার ছেলে। ২০০৬ সালের ২৬ ডিসেম্বর আমি নারায়ণগঞ্জে এসেছিলাম। তখন বলা হয়েছিল আমাকে মেরে ফেলা হবে। গ্রেপ্তার করা হবে। সে রাতেই সেনাবাহিনী, র্যাব, বিজিবি, পুলিশ আমাকে গ্রেপ্তার করতে ঘেরাও করেছিল। অন্তত ৫ হাজার সমাগম। মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেওয়া হলো। মাত্র ৪০ মিনিটে লাখো মানুষ এসে জড়ো হয়েছিল। ১৭ দিন এলাকাতে ছিলাম। কেউ ঢুকতে পারেনি। তিনি বলেন, আজকের এই সমাবেশে যে পরিমাণ মানুষ এসেছেন, আপনাদের যদি নির্দেশ দেওয়া হয়, পুরো নারায়ণগঞ্জ অচল করে দেন। ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট মুন্সীগঞ্জ মোক্তারপুরে গিয়ে বসে পড়েন। আপনারা কি প্রস্তুত আছেন? তখন সমাবেশে উপস্থিত হাজার হাজার নেতাকর্মী হাত তুলে সমর্থন জানান। এ সময় শামীম ওসমান বলেন, সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হোক এমন কিছু আমার দ্বারা হবে না। তবে আপনাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। দেশ রক্ষায়, স্বাধীনতাবিরোধীদের নির্মূলে শেখ হাসিনা যে নির্দেশ দেবেন সেটা আমরা অক্ষরে অক্ষরে পালন করব।
