রংপুর-৩ আসনে জাপার প্রার্থী সাদ এরশাদ

ক্ষুব্ধ রংপুর মানছে না কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত

আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০১:০৬ এএম

রংপুর-৩ আসনে উপনির্বাচনে সাদ এরশাদের দলীয় মনোনয়ন মেনে নিতে পারছে না তৃণমূল জাতীয় পার্টি (জাপা)। গতকাল রবিবার বাবা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের এ আসনে ছেলে সাদের মনোনয়ন নিশ্চিত করেন কেন্দ্রীয় নেতারা। সে খবর রংপুরে পৌঁছলে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন সেখানকার নেতারা। তৃণমূলের সিদ্ধান্তকে আমলে না নিয়ে কেন্দ্র একতরফাভাবে মনোনয়ন দিয়েছেÑ এমন অভিযোগ এনে তৃণমূলের সিদ্ধান্তে স্থানীয় দুই নেতা (একজন বহিষ্কৃত) নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দিয়েছেন।

রংপুরের শীর্ষ নেতারা গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, তারা কিছুতেই সাদ এরশাদকে মেনে নেবেন না। যারা তাকে মনোনয়ন দিয়েছেন, তারা তার ভোট করবেন। জাপার স্থানীয় নেতারা তার সঙ্গে নেই। তারা তৃণমূল জাপার মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে মাঠে থাকবেন। এমনকি ভোটযুদ্ধে সাদ

 এরশাদ শেষ পর্যন্ত সিরিয়ালে থাকবেন না বলেও মন্তব্য করেন তারা। তবে এসব নেতা কেন্দ্রীয় জাপার পদ ভাগাভাগির সিদ্ধান্তকে ‘মন্দের ভালো’ বলে মন্তব্য করেছেন। তারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, জাপা যদি তৃণমূলের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব না দেয় ও সমর্থনকে আমলে না নেয়, তাহলে ভবিষ্যতে জাপার রাজনীতি ভীষণ সংকটের মুখে পড়বে। ঢাকায় বসে অদৃশ্যভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিলে তৃণমূল জাপা তা কখনই মেনে নেবে না।

এমন অবস্থায় এ নির্বাচনে জাপার ভাগ্যে ঠিক কী রয়েছে তা এখনো নিশ্চিত নন জাপার এসব নেতা। এ ব্যাপারে রংপুর মহানগর সভাপতি, রংপুর সিটি মেয়র ও দলের প্রেসিডিয়াম মেম্বার মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা সাদের সঙ্গে নেই। সুতরাং নির্বাচনে কী হয় জানি না।

জাতীয় সংসদ ও দলের পদ এবং এ আসনের প্রার্থী নিয়ে গত কয়েকদিন ধরেই পাল্টাপাল্টি অবস্থানে ছিলেন জাপার দুই শীর্ষ নেতা জিএম কাদের ও রওশন এরশাদ। ভাঙনের মুখে পড়েছিল দল। পরে গত শনিবার রাতে দুপক্ষের শীর্ষ নেতারা বসে সমঝোতা করেন। সিদ্ধান্ত হয় রওশন এরশাদ সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা হবেন। দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করবেন জিএম কাদের। উপনেতার সিদ্ধান্ত হবে বিরোধীদলীয় নেতা নিয়োগের পর। সে রাতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গতকাল দলের মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা এরশাদ-রওশন দম্পতির পুত্র রাহগীর আল মাহি সাদ এরশাদকে রংপুর-৩ আসনের দলীয় প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দেন।

জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা এরশাদ গত ১৪ জুলাই মারা যান। নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, তার মৃত্যুতে শূন্য এ আসনে ভোট হবে আগামী ৫ অক্টোবর।

এ আসনে ইতিমধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে। আওয়ামী লীগ এ আসনে রেজাউল করিমকে মনোনয়ন দেয়। তিনি রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। অন্যদিকে বিএনপি এই আসনে নিজ দলের কোনো প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়নি। দলের নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিক পিপলস পার্টির রিটা রহমানকে সমর্থন দিচ্ছে তারা। তিনি বিএনপির প্রতীক ‘ধানের শীষ’ নিয়ে লড়বেন। গতকাল দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সম্পাদক রুহুল কবির রিজভী এ ঘোষণা দেন।

আসনটি শূন্য ঘোষণার পর থেকেই জাতীয় পার্টির দুর্গ হিসেবে রংপুর-৩ আসনে জাপার প্রার্থী নিয়ে দলের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। সাদ এরশাদসহ এ আসনে পাঁচজন দলীয় মনোনয়ন চান। বাকি মনোনয়নপ্রত্যাশীরা ছিলেন এরশাদের ভাগ্নি (মেরিনা রহমানের মেয়ে) মেহেজেবুন নেছা টুম্পা, রংপুর জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক এস এম ফখর-উজ-জামান ও রংপুর মহানগর জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক এস এম ইয়াসির ও জেলা জাতীয় পার্টির যুগ্ম সম্পাদক আবদুর রাজ্জাক। এর বাইরে জাপার বহিষ্কৃত নেতা সাবেক রংপুর জেলার সাধারণ সম্পাদক ও এরশাদের ভাতিজা আসিফ শাহরিয়ার আগেই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দিয়েছিলেন।

ছেলে সাদকে মনোনয়ন দিতে রওশন এরশাদ শক্ত অবস্থান নিলে জাপায় গৃহদাহ শুরু হয়। এরশাদপুত্র সাদকে মনোনয়ন না দেওয়ার দাবিতে আসিফ শাহরিয়ারের নেতৃত্বে গত মঙ্গলবার মিছিল হয় নগরে। এর আগের রাতে দুটি এলাকায় সাদ এরশাদের কুশপুত্তলিকা দাহ করা হয়। আবার তাকে মনোনয়ন দিলে তার পক্ষে কাজ না করার ঘোষণা দেন মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা। শুরু থেকেই সাদের মনোনয়নের বিপক্ষে ছিলেন তিনি। শোনা গেছে, মোস্তাফিজার জিএম কাদেরের পক্ষ নিয়ে মহানগর জাপার সাধারণ সম্পাদক ইয়াসির আহমেদকে প্রার্থী করতে চেয়েছিলেন। গত শনিবার তিনি দেশ রূপান্তরকে এমনও বলেছিলেন, সাদ এরশাদ বাদে রংপুর থেকে পার্টির যাকেই মনোনয়ন দেওয়া হবে, তারা তার পক্ষেই কাজ করবেন।

গতকাল সাদের মনোনয়ন নিয়ে কথা বললে রংপুরের স্থানীয় নেতারা দেশ রূপান্তরের কাছে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছেন। এস এম ইয়াসির বলেন, দলের এমন সিদ্ধান্ত ঠিক হয়নি। এতে দলের নেতাকর্মীরা ভীষণ মর্মাহত। এত দিন ধরে দলের জন্য যারা এত কাজ করল, তাদের বাদ দিয়ে দলে যার ন্যূনতম কোনো অবদান নেই, তাকে (সাদ এরশাদ) মনোনয়ন দিল। দল সঠিক মূল্যায়ন করেনি। এই নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, দলের জন্য আমি অনেক কাজ করেছি। নির্বাচন করলে আমি স্বতন্ত্র করব। জাতীয় পার্টির নাম কোথাও নেব না। দেখা যাক কী হয়।

মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, যারা দলের জন্য কিছু করেন না, তারা সিদ্ধান্ত নেন। তৃণমূলের মতামতকে মূল্যায়ন করা হয় না। সাদ কেন্দ্রের প্রার্থী, আমাদের না। সুতরাং তার পক্ষে কাজ করার প্রশ্নই আসে না। সাদকে মনোনয়ন দেওয়া দলের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। যারা তাকে মনোনয়ন দিয়েছে, তারাই কাজ করুক। এই নেতা বলেন, আমরা যাদের মনোনয়নের প্রস্তাব করেছিলাম, তাদের দেওয়া হয়নি। তারা কেন্দ্রে বসে একতরফা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আমরা তার (সাদ এরশাদ) পক্ষে নেই। নির্বাচনে কী হয় জানি না।

আগে থেকেই স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন জাপার বহিষ্কৃত নেতা ও এরশাদের ভাতিজা আসিফ শাহরিয়ার। গত মেয়র নির্বাচনে দলের মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করায় দল তাকে বহিষ্কার করে। গতকাল তিনি দেশ রূপান্তরের কাছে এ আসনে উপনির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, জাতীয় পার্টি কাকে মনোনয়ন দিল তা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। কারণ আমি নির্বাচন করব। আমি আগেই জানতাম আমাকে মনোনয়ন দেবে না। সাদ এরশাদের মনোয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তার অবস্থা ভালো না। ভোটে তিনি সিরিয়ালেও থাকবেন না। নিজের বহিষ্কারের ব্যাপারে আসিফ শাহরিয়ার বলেন, জিএম কাদের চারবার ও রওশন এরশাদও কয়েকবার বহিষ্কার হয়েছিলেন। এটা ব্যাপার না। আমি মাঠে আছি। মাঠের সমর্থন আছে। সুতরাং ভয় পাই না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রংপুরের আরেক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সাদকে মনোনয়ন দেওয়া জাতীয় পার্টির সিদ্ধান্ত ভালো হয়নি। ইয়াসিরকে (ইয়াসির আহমেদ) দিতে পারত। তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। এখানে এরশাদ বেঁচে থাকতে যাকে মনোনয়ন দিয়েছেন তিনিই জয়লাভ করেছেন। এখন এরশাদ নেই। সেই দয়া কেউ পাবে না। এখানে রওশন এরশাদকে কেউ দেখতে পারেন না। সুতরাং সাদ থাকলে জাপার ভয় আছে।

এরশাদের আসনে গত কয়েকবার মহাজোট শরিক হিসেবে জাতীয় পার্টিকে আওয়ামী লীগ ছাড় দেয়। তবে ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টির প্রার্থী শফিকুল গণি স্বপন জেতার পর থেকে এই আসনটি আর কখনো হাতছাড়া হয়নি জাপার। জাপার কেন্দ্রীয় ও রংপুর নেতারা জানান, নানা বিতর্কের কারণে সাদকে বাবা এরশাদ রাজনীতি থেকে সরিয়ে বিদেশে পাঠিয়ে দেন। তবে মা রওশন এরশাদ তাকে রাজনীতির ময়দানে নিয়ে আসতে সচেষ্ট ছিলেন। ২০০০ সালে নারীঘটিত এক বিষয়ে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন সাদ। এরপর তাকে বিদেশে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন এরশাদ। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সাদকে জনসম্মুখে দেখা যায়নি। পরে এরশাদ অসুস্থ হলে মা রওশনের সঙ্গে বিভিন্ন সভায় আসতে শুরু করেন তিনি। এরশাদের মৃত্যুর পর তিনি আরও সক্রিয়। দীর্ঘদিন মালয়েশিয়ার প্রবাস জীবন শেষে সাদ এখন ঢাকাতেই বাস করছেন। রওশনকে বিরোধীদলীয় নেতার স্বীকৃতি দিতে স্পিকারকে চিঠি দেবেন জিএম কাদের : গতকাল সংসদীয় দলের সভায় সর্বসম্মতভাবে রওশন এরশাদকে সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মশিউর রহমান রাঙ্গা। তিনি বলেন, রওশনকে বিরোধীদলীয় নেতার স্বীকৃতি দিতে পার্টির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের স্পিকারকে চিঠি দেবেন। গতকাল জাতীয় সংসদের লবিতে জাতীয় পার্টির সংসদীয় দলের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা জানান। তিনি বলেন, আমাদের সংসদীয় দলের সভা হয়েছে। এতে ২৫ জন সংসদ সদস্য উপস্থিত ছিলেন। সেখানে সর্বসম্মতক্রমে সিদ্ধান্ত হয়েছে রওশন এরশাদ বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন এবং জিএম কাদের পার্টির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করবেন। তবে বিরোধীদলীয় উপনেতা এখনো ঠিক হয়নি বলে জানান তিনি। এ ব্যাপারে বলেন, উপনেতার বিধান হচ্ছে, যিনি বিরোধীদলীয় নেতা হন, তিনি চেয়ারম্যানের সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত