বৃষ্টি সঙ্গে নিয়েও হারল বাংলাদেশ

আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০২:০৬ এএম

শেষ রক্ষার সুযোগ দিয়েছিল আকাশ। আগের দিনই প্রায় হার মেনে নেওয়া টেস্টের শেষ দিনে বাংলাদেশ তবু ব্যর্থ অন্তত ‘ড্র’ করতে। শেষটায় স্নায়ুক্ষয়ী লড়াইটা দাঁড়িয়েছিল এক ঘণ্টা দশ মিনিটের সামান্য বেশি সময়ের ‘বাউট’। বাংলাদেশের ৪ উইকেটই ছিল হাতে। সামনে ছিল নির্ধারিত ১৮.৩ ওভার। দু চার বল বেশিও হতে পারত। শেষ সময় ৫টা ৩৪ মিনিট। কিন্তু যে পতন প্রথম বলে খোদ অধিনায়ক সাকিব আল হাসানের ভয়াবহ ভুলে সেটা শেষ সৌম্য সরকারের আত্মরক্ষা করতে গিয়ে প্রাণ দেওয়ার মাঝে। ৫টা ১৮ মিনিটে সব শেষ। আহ! আর মাত্র ১৬ মিনিট ছিল যে! খাতা-কলমে ৩.২ ওভার। বাংলাদেশের জন্য নির্মম আক্ষেপ হয়ে রইল মাত্র তৃতীয় টেস্ট খেলতে নামা আফগানিস্তানের কাছে এই অসহায় আত্মসমর্পণ। প্রতিপক্ষের নকআউট পাঞ্চে ধুলোয় গড়াগড়ি খায় নিথর-নীরব বাংলাদেশের ক্রিকেট।

জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে ২২৪ রানের এই হার কি বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বাজে? সাকিব এই হারকে ‘লজ্জাজনক’ বলবেন না। বলছেন ‘যন্ত্রণাদায়ক’। আর হারের ধরনকে ‘খারাপের নিচে’ও বলতে আপত্তি করলেন না। এও জানালেন, ‘আমরা যদি ধারাবাহিকভাবে ভালো খেলতে চাই আমাদের খেলোয়াড়দের মান আরও বাড়াতে হবে। তা না হলে সুবিধা বা ফেভার এই জিনিসগুলো নিয়ে আসলে (ধারাবাহিক) ফলাফল করতে পারব না।’

গতকাল সকাল থেকে চট্টগ্রামে তুমুল বৃষ্টি। কখনো মুষলধারে। কখনো থেমে থেমে। লাঞ্চের সময়টা নিয়েই প্রথম সেশন ভেসে গেল। একটায় খেলা শুরু হলো। ৩৯৮ রানের টার্গেট বাংলাদেশের সামনে। ৬ উইকেটে ১৩৬ রানে শুরু। সাকিব ৩৯ ও সৌম্য ০ রানে। ৭ মিনিট গেল। ১৩ বল হলো। আবার বৃষ্টি। এবং নখ কামড়ানো সাসপেন্স নিয়ে আফগানদের অপেক্ষা। হয়তো সৃষ্টিকর্তার সাহায্যের জন্যও ওপর দিকে হাত তুলেছে গোটা দল। অন্তত একটি ঘণ্টা যে খুব দরকার তাদের। বাংলাদেশ দলের দরকার ২৬২। জয়ের কথা ভাবা যায় না। পুরো টেস্টে ব্যাটসম্যানরা নিদারুণ ব্যর্থ আফগান স্পিনের বিপক্ষে। স্বীকৃত দুই ব্যাটসম্যান বাকি শেষটায়। অসহায় বাংলাদেশ বৃষ্টিটাকে খুব করে চেয়েছিল।

শেষটায় ৪টা ২০ এর দিকে খেলা শুরু। সাকিব কী করলেন? জাহির খানের অফ স্টাম্পের বেশ বাইরের বলকে কাট করলেন! উইকেটের পেছনে ক্যাচ। দু-চারদিনের শিক্ষিত ব্যাটসম্যানও এই শট খেলে না। এমন অস্তিত্বের সংকটে তো প্রশ্নই আসে না। নিজের এবং অন্যদের এই পারফরম্যান্স কীভাবে মানবেন সাকিব?

সবকিছু ‘কষ্টকর’। ‘চার উইকেট ছিল, ১ ঘণ্টা ১০ মিনিট খেলতে হতো। আমি শটটা খেলে ফেলেছি এবং টিম অনেক প্রেশারে পড়ে গেছে। আমি যেহেতু উইকেটে ছিলাম দায়িত্ব আমার ওপরই ছিল প্রধান ভূমিকা পালন করার। সেটা যদি আমি করতে পারতাম ড্রেসিংরুম অনেক বেশি স্বচ্ছন্দে থাকত। কমফোর্টেবল ফিল করত। শেষ পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারতাম অথবা ড্র করার সম্ভাবনা ছিল। সাকিবের স্বীকারোক্তি, দিনের প্রথমভাগে নামার সময় নার্ভাস ছিলেন না। পরে আবার নামার সময় ‘মাইন্ডসেট’ এর কারণে ‘নার্ভাস’ হয়েছেন। সে কারণে হয়তো ওই কাণ্ড।

নিজেরটার মতো অন্যদেরটাও মানতে পারছেন না। ১৭৩ রানে সব শেষ। শেষ তিন উইকেট আফগান অধিনায়ক চ্যাম্পিয়ন লেগ স্পিনার রাশিদ খানের। এই ইনিংসে ৬সহ মোট ১১ উইকেট নিয়ে ‘ম্যান অব দ্য ম্যাচ’। তো মেহেদী হাসান মিরাজ (১২) পরিষ্কার এলবিডাব্লিউর শিকার হয়েও রিভিউটা নিলেন। তাইজুল ইসলাম ব্যাট-ব্যাডে কট। ভুল সিদ্ধান্ত। কিন্তু রিভিউ নেওয়ার সুযোগ নেই। টিনএজার নাঈম হাসানকে স্ট্রাইক দিয়ে মাথায় হাত সৌম্যর (১৫)।

মিরাজ ও সৌম্যর ক্রিকেট শিক্ষা নিয়ে সাকিবের কথায় প্রশ্ন উঠে এলো। আর সার্বিকভাবে এই টেস্টে শেষে যেভাবে হারতে হলো তাতে নিজেদের সামর্থ্য আছে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন এলে সাকিবের দ্বিধাহীন উচ্চারণ, ‘রেজাল্ট যদি দেখেন আমি বলব অবশ্যই (সামর্থ্য) নেই। কারণ আমাদের যদি সেই সামর্থ্য থাকত আমরা আরও ভালো কিছু দেখাতে পারতাম।’ আর ক্রিকেট-শিক্ষার অভাব টেনে বললেন, ‘এই জিনিসগুলো অনেক কিছু শেখার আছে বোঝার আছে। কতদিন যে লাগবে শিখতে এটা বড় ব্যাপার।’

বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা পুরো টেস্টে আশপাশে ছাতা নিয়ে ব্যাট করেছেন। ফিল্ডাররা ঘিরে রেখেছেন। ঘূর্ণি বলের সঙ্গে এই চাপ সামলাতে চরম ব্যর্থ। বিশ্বকাপে দল হিসেবে খেলতে পারেনি বাংলাদেশ। শ্রীলঙ্কায় ওয়ানডেতে হোয়াইটওয়াশ। ঘুরে দাঁড়িয়ে নতুন শুরুর মঞ্চ ছিল আফগানদের সঙ্গে এই টেস্ট। সেখানে শতভাগ ব্যর্থ সবাই মিলে। এখন?

 ‘টি-টোয়েন্টি সিরিজের প্রথম ম্যাচটা জেতা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাহলে হয়তো সবকিছু নিয়ন্ত্রণে আসার একটি সম্ভাবনা তৈরি হবে। সে জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। হাতে খুব বেশি একটা সময় নেইÑ ‘দুশ্চিন্তায় টেস্ট এবং টি-টোয়েন্টির অধিনায়ক।

এমন এক জয় আফগানদের জন্য ঐতিহাসিক। পারফরম্যান্সের কারণে ‘লেটার মার্ক’ প্রতিপক্ষকে দিলেন সাকিব। তার আক্ষেপ, নিজেদের সত্যিকারের চরিত্রটা এখানে দেখিয়ে আফগানদের পরীক্ষা নেওয়া হলো না। কিন্তু দিন শেষে খেলার ধরন আর ফল তো কথা বলে। তাহলে নিজের দলকে এই টেস্টে কত নম্বর দিচ্ছেন অধিনায়ক? ‘জিরো’। মøান হেসে কষ্ট লুকান সাকিব।

১৩ সেপ্টেম্বর ঢাকায় তিনজাতি সিরিজে তাহলে সেই ‘শূন্য’ থেকেই শুরু করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। নভেম্বরে ভারত সফরে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপও শুরু করতে হবে ঠিক যেখান থেকে। দেশের ক্রিকেটে এরচেয়ে বাজে অবস্থা আর হতে পারে না। কথাটাতে হয়তো আপত্তি করার মানুষও নেই কোথাও।

আফগানিস্তান : ৩৪২ ও ২৬০

বাংলাদেশ : ২০৫ ও ১৭৩

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত