প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, মাদকের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থানে। এতে বিশেষভাবে কাজ করছে পুলিশ। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা যেভাবে জনগণের সেবা করছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। গতকাল বুধবার গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বাংলাদেশ পুলিশ কল্যাণ ট্রাস্টের মালিকানাধীন ‘কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ’র উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন তিনি। এছাড়া ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে চারটি বিদ্যুৎকেন্দ্র, আরও ১০ উপজেলায় শতভাগ বিদ্যুতায়ন এবং ১১টি গ্রিড উপকেন্দ্রও উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। পুলিশের ভূমিকার প্রশংসা করে শেখ হাসিনা বলেন, দেশে আন্দোলনের নামে যেভাবে সাধারণ মানুষের ওপর হামলা হয়েছে, সেভাবে পুলিশের ওপরও হামলা হয়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা যেভাবে জনগণের সেবা করছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।
প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, “জনবান্ধব পুলিশি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। পুলিশের সেবা তাৎক্ষণিক পেতে জরুরি সেবা ‘৯৯৯’ চালু করা হয়েছে। পুলিশ খুব দক্ষতার সঙ্গে এ ক্ষেত্রে কাজ করছে।’
এরপর প্রধানমন্ত্রী চারটি বিদ্যুৎকেন্দ্র, আরও ১০ উপজেলায় শতভাগ বিদ্যুতায়ন এবং ১১টি গ্রিড উপকেন্দ্র উদ্বোধন করেন। এ সময় শেখ হাসিনা বলেন, ‘২০০৯ সাল থেকে আমরা সরকারে আছি। আজ আমরা প্রায় ৯৩ শতাংশ মানুষের ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিতে পেরেছি। উৎপাদনও আমরা ২২ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বাড়াতে সক্ষম হয়েছি। সঞ্চালনও বাড়িয়েছি।’
১৯৯৬ সালে তার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর অন্য সেক্টরের মতো বিদ্যুৎ সেক্টরের উন্নয়নে ব্যাপক কর্মসূচি নেওয়ার কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা উদ্যোগ নিয়েছিলাম বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়ে মানুষের ঘরে ঘরে আলো জ¦ালানোর। মনে আছে, আমরা তখন পেয়েছিলাম মাত্র ১৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। বলতে গেলে সব জায়গা অন্ধকারাচ্ছন্ন।’
ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে প্রতিবেশী দেশ থেকে বিদ্যুৎ আমদানির কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে প্রতিবেশী দেশ থেকে বিদ্যুৎ কিনছি। জলবিদ্যুতের জন্য আমরা ভারত, ভুটান, নেপাল প্রত্যেকের সঙ্গে আলোচনা করছি। ইতোমধ্যে ভারতের কাছ থেকে ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমরা কিনছি।’
নারায়ণগঞ্জের দুই উপজেলায় শতভাগ বিদ্যুৎ : ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জ সদর ও রূপগঞ্জ উপজেলায় শতভাগ বিদ্যুতায়ন কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এর আগে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে কথা বলেন নারায়ণগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী আফরোজা আক্তার। তিনি বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জে যদি একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হতো তাহলে আমাদের অনেক বেশি উপকার হতো, ভালো হতো। উচ্চশিক্ষার জন্য নারায়ণগঞ্জ থেকে অন্য কোথাও যেতে হতো না।’
এর জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থা আমরা করব। কোনো বেসরকারি উদ্যোক্তা এলে আমরা দিয়ে দেব। নারায়ণগঞ্জে অনেক অর্থশালী ব্যবসায়ী লোক আছে। তারা যদি আসে আমরা পারমিশন দিয়ে দেব।’ এ সময় রূপগঞ্জের জামদানি পল্লীর খোঁজ-খবরও নেন শেখ হাসিনা।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে নারায়ণগঞ্জ থেকে যুক্ত হন নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) এবং পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী গাজী গোলাম দস্তগীর, নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের এমপি সেলিম ওসমান, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এমপি শামীম ওসমান, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন, জেলা পুলিশ সুপার হারুন অর রশীদ, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল হাই, সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ বাদল, চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি খালেদ হায়দার খান কাজল প্রমুখ।
বাঘাবাড়ীতে ২০০ মেগাওয়াট পাওয়ার প্লান্ট : সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার বাঘাবাড়ীতে ২০০ মেগাওয়াট ডিজেলভিত্তিক পাওয়ার প্লান্টের উদ্বোধন করেন শেখ হাসিনা। এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে শাহজাদপুর, সিরাজগঞ্জ, পাবনাসহ উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলার মানুষ সুবিধা ভোগ করবে। একই সঙ্গে ওই অঞ্চলে লোডশেডিং কমার পাশাপাশি নতুন নতুন কলকারখানা ও আবাসিক এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া সম্ভব হবে।
এ উপলক্ষে সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের শহীদ শামসুদ্দিন সম্মেলন কক্ষে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে জেলা প্রশাসক ড. ফারুক আহাম্মদ, সিরাজগঞ্জ-৬ (শাহজাদপুর) আসনের এমপি হাসিবুর রহমান স্বপন, জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইখতেখার উদ্দিন শামীম, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) ফিরোজ মাহমুদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। হরিপুরে শতভাগ বিদ্যুতায়ন : ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলাকে শতভাগ বিদ্যুতায়নের আওতায় আনা হয়েছে। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী এ কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। এতে উপস্থিত ছিলেন ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা প্রশাসক ড. কে এম কামরুজ্জামান সেলিম, পুলিশ সুপার মোহা. মনিরুজ্জামান, ৫০ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মুহা. সামিউল চৌধুরী সামী, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) নূর কুতুবুল আলম, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুহা. সাদেক কুরাইশী, সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাক আলম টুলু, মাজহারুল ইসলাম সুজন প্রমুখ।
এ সময় ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন জেলা প্রশাসক ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল গফুর। কাপ্তাইয়ে প্রথম সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের যাত্রা : রাঙ্গামাটির কাপ্তাইয়ে দেশের প্রথম সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের যাত্রা শুরু হয়েছে। ৭ দশমিক ৪ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রটি প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে উদ্বোধন করেন। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ভিডিও কনফারেন্সে সম্প্রচারিত সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক ও কাপ্তাই বিদ্যুৎকেন্দ্রের কর্মকর্তারা।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘দুই দশক ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামে এক অশান্ত পরিবেশ ছিল যেটা ১৯৭৬-৭৭ সালে শুরু হয়। আমরা ১৯৯৬ সালে সরকার গঠন করার পর পার্বত্য এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য উদ্যোগ নেই এবং পরে শান্তিচুক্তি করি। শান্তিচুক্তি করার পর পার্বত্য এলাকায় উন্নয়নের জোয়ার বয়ে যাচ্ছে। আর্থ-সামাজিকভাবে পার্বত্য অঞ্চলের মানুষ যথেষ্ট উন্নয়ন করে যাচ্ছে। ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছানোর কারণে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন আরও বাড়বে।’
বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হোন : বিদ্যুৎ ব্যবহারে সবাইকে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে যে টাকা খরচ হয় আমরা দাম কিন্তু তত নিই না। এখানে কিন্তু ভর্তুকি দিতে হয়। সেজন্য অনুরোধ থাকবে যারা বিদ্যুৎ ব্যবহার করবেন বিদ্যুৎসাশ্রয়ী হবেন। অতিরিক্ত বিদ্যুৎ খরচ যেন না হয়। সাশ্রয়ী হলে বিলও কম উঠবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যতটা খরচ হচ্ছে তার অর্ধেক দামে আমরা বিদ্যুৎ সরবরাহ করে যাচ্ছি। এভাবে ভর্তুকি দেওয়াটা কিন্তু ঠিক নয়। তারপরও মানুষের কল্যাণে, মানুষের সুবিধা চিন্তা করে আমরা করে যাচ্ছি।’
ভিডিও কনফারেন্স অনুষ্ঠানে গণভবনে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ¦ালানি ও খনিজসম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
