১৪৪৫ কোটি টাকা একনেকের বরাদ্দ পেয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। এর চেয়ে ভালো খবর আর কী হতে পারে? তার মানে টাকা আর কোনো সমস্যা নয়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এখন দারিদ্র্য থেকে প্রাচুর্যের যুগে প্রবেশ করেছে। এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিউনিটি এবং দেশের জন্যও একটি ভালো খবর। এখন তবে কি না সম্ভব? এই বিশ্ববিদ্যালয়কে এখন এ দেশের একটি উচ্চমানের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে আর কোনো বাধা নেই। অন্তত এত দিনের যে ছেঁড়া কাঁথার গল্প শুনে আসছিলাম, অবশেষে সেই গল্পের শেষ হয়েছে। শিক্ষার্থীদের ভালো করে বুঝে নেওয়া দরকার, এখন আমরা বিলিয়নিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়। কেউ আপনাদের আর গরিবির ভয় দেখাতে পারবে না। আপনাদের আর আমাদের মতো হলের তেলাপোকা দিয়ে রান্না করা ডাল আর সব অখাদ্য-কুখাদ্য খেয়ে ক্লাসের কঠিন কঠিন তত্ত্ব আলোচনায় যেতে হবে না। এক টাকার শিঙাড়া খেয়ে সারা দিন চালাতে হবে না। আপনারা চিৎ-কাইত ঘুমাবেন না। আমাদের মতো বাসে বাদুড় ঝুলবেন না। এখন আপনাদের লাইব্রেরিতে কোনো বইয়ের অভাব থাকবে না। আপনাদের আর পরীক্ষার সময় লোডশেডিং হবে না। আপনারা মোমবাতির আলোয় পরীক্ষা দেবেন না। আপনাদের ল্যাবরেটরি হবে বিজ্ঞান গবেষণার জন্য আদর্শ। ইউনিভার্সিটির প্রেসে প্রকাশিত হবে সেরা গবেষণা প্রবন্ধ। বিজ্ঞানের নতুন নতুন আবিষ্কার হবে। আপনারা ডেঙ্গুর প্রতিষেধক বের করবেন, ক্যানসারের আনসার বের করবেন, এইডসের টিকা আবিষ্কার করবেন, সমাজবদল করা তত্ত্ব এখানেই সৃষ্টি হবে। আপনারা হাইস্পিড ইন্টারনেট পাবেন। থাকবে উন্নত স্টেডিয়াম, ব্যায়ামাগার ও সুইমিংপুলে স্বাস্থ্যচর্চা করে আপনারাই হবেন সবল বুদ্ধিদীপ্ত জাতির প্রতীক। আপনাদের থাকবে চিত্রশালা, সংগীত ও শিল্পচর্চার কেন্দ্র এবং উদ্ভিদ ও প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ উদ্যান। আপনাদের সৃষ্টিশীল প্রতিভার লালন ও পরিচর্যা কেন্দ্র হয়ে উঠবে এই সবুজ ৭০০ একর ভূমি। দেশের শ্রেষ্ঠ মেধাবীরা হবেন আপনাদের শিক্ষক, আপনাদের প্রতিভার পরিচর্যাকারী। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেক কর্মচারী এই কল্যাণের সুবিধাভোগী হবেন। এখন আমরা আমাদের স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলব। আমরা এই প্রাচুর্যে উল্লসিত ও গর্বিত। আসুন আমরা একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে এক মুহূর্ত এটা উপলব্ধি করে নিই, টাকা আমাদের কোনো সমস্যা নয়। আসুন আমরা এই প্রাচুর্যের বাতাসে কিছুক্ষণ শ্বাস–প্রশ্বাস গ্রহণ করি। বহুদিন দরিদ্র জীবনযাপন করে করে আমাদের দারিদ্র্যের ভয়ভীতিতে অভ্যাস হয়ে গেছে। মনে মনে আমরা ক্ষুদ্র ও হীন হয়ে গেছি, ছা- পোষাগিরির চেয়ে বড় কোনো কিছু ভাবার, আকাক্সক্ষা করার শক্তি হারিয়েছি। দারিদ্র্যের ভীতি আমাদের চিরস্থায়ীভাবে দরিদ্র করে রেখেছে। কিন্তু সময় এসেছে এখন সেসব দুর্ভিক্ষের দুঃস্বপ্ন পেরিয়ে নিজেদের অসীম শক্তি ও প্রাণ- প্রাচুর্যের সম্ভাবনাকে কর্ষণ করি, উদযাপন করি। এ যেন এক মাহেন্দ্রক্ষণ।
কিন্তু হায়, আমরা কী করছি? আবার সেই লাগাতার আন্দোলন! এত টাকা-কড়ি পাওয়ার পরও কেন আবার আন্দোলন করতে হচ্ছে? আমাদের সমস্যা তাহলে কী? উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ এই বিপুল ক্যাশ টাকার গন্ধে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগত স্বার্থান্বেষীর দলের নড়াচড়া এবং টাকা লুটপাটের আলামত দেখা গিয়েছে। দুর্নীতির স্বাভাবিকীকরণ এমনভাবে হয়েছে, দুর্নীতি ও নৈতিক বিপর্যয় এমন একটি জায়গায় পৌঁছায় যে, তা শুধু শিক্ষকদের একাংশের অস্বস্তি তৈরি করেছে, অধিকাংশের কাছে একে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক মনে হচ্ছে। ছাত্রলীগের কথা বলাই বাহুল্য, উপাচার্যের পরিবারের সম্পর্কে অর্থ-সংক্রান্ত দুর্নীতিতে লিপ্ত হওয়ার যে খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে, তা বিশ্বাস করতেও কষ্ট হচ্ছে। মনেপ্রাণে চাই যে, এ খবর মিথ্যা প্রমাণ হোক, বিশ্ববিদ্যালয়ের মানসম্মান রক্ষা পাক। অধিকতর উন্নয়ন পরিকল্পনার নামে বিশ্ববিদ্যালয় সমাজকে অন্ধকারে রেখে কী ধরনের বিশৃঙ্খলতা সৃষ্টি করা হচ্ছে, তার প্রাথমিক নজির দেখেই একটি আসন্ন বিপর্যয়ের আশঙ্কায় আমরা ভীত হয়ে পড়েছি। এ ধরনের বড় একটি জাতীয় স্বার্থকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘কতিপয় তন্ত্র’ মাত্র কয়েক কোটি টাকার বিনিময়ে জলাঞ্জলি দিতে যাচ্ছে কি? যেমনটি হয়েছিল আমাদের প্রাচুর্যপূর্ণ তেল-গ্যাসক্ষেত্র বিদেশি কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দেওয়ার সময়। এর যৌক্তিকতা প্রমাণের জন্য সেদিন বিশেষজ্ঞের অভাব হয়নি। মাত্র একটা বিএমডব্লিউ, ছেলেমেয়েকে বিদেশে পড়ানোর সুযোগের বিনিময়ে অতীব গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্বার্থ জ্বালানি-নিরাপত্তার সঙ্গে শিক্ষিত এলিটতন্ত্রের বেইমানি দেখে আমরা বেঁচে আছি।
কেমন বিশ্ববিদ্যালয় চাই, এই আলোচনা কয়েক দশক ধরে বিশ্ববিদ্যালয় সমাজ করে আসছে। শিক্ষাবিদ, শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে অনেক চমৎকার সব আইডিয়া বেরিয়ে এসেছে। নৃবিজ্ঞানের একটি মূল আলোচ্য হলো, কীভাবে উন্নয়ন অর্থবহ করা যায়। বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন নিয়ে আমরা কত-না ঘণ্টা, কত-না দিন ক্লাসে আলোচনা করেছি। শিক্ষার্থীদের সামনে বাংলাদেশের জনগণের জন্য কল্যাণকর উন্নয়ন নিয়ে কত-না সাক্ষ্য-প্রমাণ, তথ্য-উপাত্তভিত্তিক কেইস উপস্থাপন করেছি। সেই ষাটের দশক থেকে পশ্চিমা ধাঁচের বিশ্বব্যাংক, আইএমএফের উন্নয়ন পরিকল্পনার বিপর্যয়ের শিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই নিয়ে অসংখ্য উদাহরণ থেকে নৃবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীরা উন্নয়নের গণতন্ত্রায়ণের, অংশীদারত্ব, টেকসইকরণ এবং মানবিক করে তোলা নিয়ে দুর্দান্ত সব রূপরেখা দিয়েছেন, যা আমরা প্রতিনিয়ত ক্লাসে পড়িয়ে আসছি। এখন ভাবছি, এসব তাহলে কেন পড়ানো হচ্ছে? এ কি কেবল ডিগ্রি অর্জনের পরীক্ষায় পাস করার জন্য, না কি জীবনের আসল পরীক্ষায় মোক্ষমভাবে কাজে লাগানোর জন্য? নৃবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে ভালো করে জানার কথা বি-মানবিক অবকাঠামো কী ধরনের ধ্বংসাত্মক ফলাফল নিয়ে আসে এবং অর্থবহ মানবিক উন্নয়ন কী। এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক যে, নৃবিজ্ঞানীরা ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকার পরও এই বিদ্যা-শিক্ষা কোনো কাজে লাগানোর লক্ষণ তথাকথিত অধিকতর উন্নয়ন পরিকল্পনায় প্রতিফলিত হতে দেখা গেল না। participatory development, sustainable development, development from belwo, development with human face, democratization of development, right-based approach— এসবই নিরেট বাগাড়ম্বরে পর্যবসিত হলো। এ থেকে এটাই প্রমাণ হয়, বিরাজনীতিক পেশাগত বিশেষজ্ঞরা আসল কাজের সময় কিছু করতে অক্ষম।
উন্নয়ন কীভাবে সহিংসতা সৃষ্টি করে এর একটি শক্তিশালী সাম্প্রতিক প্রাসঙ্গিক বিশ্লেষণ আছে ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রখ্যাত মার্কিন নৃবিজ্ঞানী অখিল গুপ্তের গ্রন্থRed Tape : Bureaucracy, Structural Violence and Poverty in India (২০১২)-তে। ভারতীয় আমলাতন্ত্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি কীভাবে সিংহভাগ ভারতীয় নাগরিকদের চিরস্থায়ীভাবে দরিদ্র করে রাখে এবং অপুষ্টি, জরুরি চিকিৎসাসেবা এবং ন্যূনতম জীবনমান থেকে বঞ্চিত করে, তার এক সাক্ষ্য এই দীর্ঘ গবেষণা। অপুষ্টি, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও বিনা চিকিৎসায় বিপুল জনগোষ্ঠীর অকালমৃত্যুকে অখিল গুপ্ত ধীরগতির নীরব গণহত্যা বলে চিহ্নিত করতে চান। মৃত্যু ও ভয়ের শাসন দিয়ে এই উন্নয়ন প্রক্রিয়া চলে আমলাতন্ত্র ও করপোরেটের যৌথ অংশীদারত্বে সীমাহীন দুর্নীতির মাধ্যমে। জনগণের জীবন, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও সার্বিক কল্যাণের দিকে নজর না দিয়ে তাদের তিলে তিলে মৃত্যু ও ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে দশকের পর দশক ধরে। ভারতীয় আমলাতন্ত্রের লাল ফিতার এই আলাপ বাংলাদেশের সঙ্গে এই কারণে সাদৃশ্যপূর্ণ যে, জনস্বার্থবিরোধী ও শোষণে দক্ষ ব্রিটিশ আমলাতন্ত্রের ভূতই আজ পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশগুলোর ট্র্যাডিশন ও প্র্যাকটিস হিসেবে রয়ে গেছে। এর ওপর গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো এসেছে গণবিরোধী বিমানবিক উন্নয়ন প্রকল্প, দুর্নীতিতে যার শুরু, বিপর্যয়ে যার শেষ। একে চ্যালেঞ্জ করার মতো শক্তি প্রতিষ্ঠানের ভেতর থেকে গড়ে উঠতে পারেনি। এতে করে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর চাপিয়ে দেওয়া প্রকল্পগুলোর সঙ্গে জনগণের পক্ষ হয়ে দরবার করার জন্য বারবার স্থানীয় আন্দোলন ছাড়া উপায় থাকে না।
বাংলাদেশের দুর্নীতি অনুরূপভাবে কাঠামোগত সহিংসতা সৃষ্টি করেছে, যেখানে পাবলিকের স্বার্থবিরোধী আমলাতন্ত্র ও করপোরেটতন্ত্রের হাইব্রিডের মাধ্যমে কাঠামোগতভাবে দুর্নীতি করে যাওয়ার যথেচ্ছ ক্ষমতা অর্জন করে। এর ফলে কাছাখোলা দুর্নীতি নির্লজ্জের সীমা অতিক্রম করেছে। এই পরিস্থিতিতে কতিপয়ের দেশপ্রেম, সততা বা নৈতিকতাই বরং উদ্ভট ও অস্বাভাবিক দেখায়; দুর্নীতি ও লুটপাটের ভাগবাটোয়ারায় অংশ নেওয়াকে বুদ্ধিমানের কাজ বলে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে এবং সমাজে গ্রহণযোগ্য করে তোলা হয়। সুতরাং জাহাঙ্গীরনগর কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দুর্নীতির যে খবর আসছে তা এর থেকে আলাদা কিছু নয়। আলাদা হয় একটি জায়গায়, যেখানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক নৈতিক, রাজনৈতিক ভূমিকার কারণে দেশবাসীর তাদের পক্ষে সরব হওয়ার একটা দাবি বা আকাক্সক্ষা লালন করে। সেই আকাক্সক্ষা ও দাবিকে আমরা অগ্রাহ্য করতে পারি না। বুদ্ধিজীবীদের ঐতিহাসিক দায়-দায়িত্ব আছে, সে দায়িত্ব সংকটে নীরব থাকার নয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে আছেন দেশের শ্রেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ, নৃবিজ্ঞানী, জীববিজ্ঞানী, পরিবেশবিজ্ঞানী, নগর পরিকল্পনাবিদরা। সেই দায়িত্ব থেকে তাদের অভিমতকে আমলে নিয়ে এক কল্যাণমূলক বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে জাতিকে উপহার দেওয়ার এই তো সময়।
আজ থেকে ৫০ বছর পর আজকের এই কুশীলব শিক্ষকরা কেউই বেঁচে থাকবেন না, ১০০ বছর পর আজকের কোনো শিক্ষার্থীও থাকবেন না। কিন্তু জাহাঙ্গীরনগর থাকবে, এই রাজধানী শহর থাকবে, এই দেশ থাকবে। আর থাকবে আমরা কী বলেছি আর কী করেছি। ১৪৪৫ কোটি টাকার এই বিশাল অধিক উন্নয়ন পরিকল্পনার অব্যবস্থাপনা, অদূরদর্শিতা ও দুর্নীতির ফলে এই বিশ্ববিদ্যালয় যদি ঢাকা নগরের মতো মহা-উন্নয়নের ঠেলায় বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ে, সেই দায় থেকে আমরা কেউ রেহাই পাব না। আমাদের সন্তান, সন্তানের সন্তানদের, অনাগত প্রজন্ম, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান সুবিধাভোগী কৃষক-শ্রমিকের সন্তানের এই প্রশ্নের মুখে দাঁড়াতে হবে যে, আমরা যারা বেঁচে ছিলাম, তারা তখন কী করেছিলাম? সেদিন কী কী অজুহাত দেখাবেন? আমাদের কিছুই করার ছিল না, আমাদের হাতে ক্ষমতা ছিল না, আমাদের কণ্ঠরোধ করা হয়েছিল, আমাদের হাত-পা বাঁধা ছিল? আমাদের মেয়ের চাকরি পাওয়ার ব্যাপার ছিল, আমার প্রমোশন সামনে ছিল, আমার ছুটির দরকার ছিল? আমাকে ভয় দেখানো হয়েছিল, আমাকে লোভ দেখানো হয়েছিল, কিংবা আমি এসব ঝামেলায় জড়াতে চাইছিলাম না, নীরব থেকে এই মহাবিপর্যয়কে আমি পথ করে দিয়েছি?
এই মহাবিপর্যয় অন্তত আমার নামে নয়। এই অপউন্নয়নের দ্বারা ভবিষ্যতের নাগরিকদের উন্নত শিক্ষার সুবর্ণ এই সম্ভাবনা বিনাশের দায়-দায়িত্ব আমরা নেব না। ইতিহাসের পাতায় আমাদের note of dissent লেখা থাকুক।
লেখক
সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
