কারাবন্দিদের উন্নয়নে একগুচ্ছ প্রকল্প ও প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে কারা অধিদপ্তর। এর মধ্যে রয়েছে বন্দিদের আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্বজন নামে পরীক্ষামূলক টেলিফোন বুথ চালু, কয়েদিদের কর্মসংস্থানে কারাগারে তৈরি পোশাক কারখানা স্থাপন, খাবারের মান ও বরাদ্দ বৃদ্ধি, বিশেষ দিনে খাবারের বরাদ্দ বাড়ানো, আটটি কারাগার পুনর্নির্মাণ ও সম্প্রসারণসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ। কারা অধিদপ্তর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কারা অধিদপ্তরের কারা উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি-সদর দপ্তর) মো. বজলুর রশীদ গতকাল শুক্রবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, মন্ত্রণালয়ে পাঠানো প্রতিবেদনে উল্লিখিত সব কাজই বাস্তবায়ন করা হয়েছে। কারাগারকে সংশোধনাগার হিসেবে রূপান্তরের জন্য চলমান কার্যক্রমের অংশ হিসেবে এসব প্রকল্প ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। কারা অধিদপ্তরের বন্দিদের কল্যাণে যা যা সম্ভব সবই বাস্তবায়ন করছে।
কারা অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্দিদের উন্নয়ন এবং কারাগারকে সংশোধনাগার হিসেবে রূপান্তর করতে তারা গত আড়াই বছরে ২৮টি কারাগারে ৫৩ হাজার ৩ জন বন্দিকে আত্মকর্মসংস্থানমূলক ৩৮ ধরনের প্রশিক্ষণ দিয়েছে। গত ২৮ মার্চ থেকে টাঙ্গাইল জেলা কারাগারে আটক বন্দিরা তাদের আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে কথা বলার জন্য ‘স্বজন’ নামে বিশেষ টেলিফোন বুথ স্থাপন করা হয়েছে।
এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল গত বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করায় কারাবন্দিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসা স্বজনের সংখ্যা ৮০ শতাংশ কমেছে। তাই পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যসব কারাগারেও স্বজন নামে টেলিফোন বুথ চালু করা হবে। এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে কারা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
কারাগারে ২০১৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত প্যারালিগ্যাল কার্যক্রমের উদ্যোগে ৯৭ হাজার ৯৪০ জন বন্দিকে আইনি সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এই সহায়তা দেওয়ায় ১১ হাজার ১৪০ জন বন্দির মুক্তি পাওয়া সম্ভব হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, কারাবন্দি কয়েদিদের (কারাদ-প্রাপ্ত) আত্মকর্মসংস্থানের অংশ হিসেবে নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারে একটি তৈরি পোশাক কারখানা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ওই কারখানাসহ দেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দিদের উৎপাদিত পণ্যের বিক্রয়লব্ধ অর্থের লাভের অর্ধেক টাকা কয়েদিদের দেওয়া হচ্ছে।
সব কারাগারে কারাবন্দিদের মুক্তির পর তাদের পুনর্বাসিত করার লক্ষ্যে সেবা বা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। কাশিমপুর কারাগারের পার্ট-২-এ বন্দিদের পুনর্বাসন স্কুল চালু করা হয়েছে। কারাবন্দিদের ধর্মীয় শিক্ষা দিতে ধর্মীয় বিশেষজ্ঞদের প্রতি ভিজিট ৫০ টাকার স্থলে ২০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। কারাগারের ভেতর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কাজে নিয়োজিত পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের বেতন মাসে ২০ থেকে ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বন্দিরে খাবারের মান সম্পর্কে বলা হয়েছে, সকালের নাশতায় রুটি-গুড়ের পরিবর্তে সপ্তাহে দুদিন খিচুড়ি, এক দিন হালুয়া-রুটি ও চার দিন সবজি-রুটি দেওয়া হচ্ছে। রমজান মাসে ইফতার ১৫ টাকার স্থলে ৩০ টাকা করা হয়েছে। বন্দিদের এক কারাগার থেকে অন্য কারাগারে নেওয়ার সময় (ইন-ট্রানজিট) খোরাকাদি ভাতা প্রতিবেলা ৮ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০ টাকা করে দুই বেলায় ১৬ টাকার স্থলে ১০০ টাকা করা হয়েছে। বাংলা নববর্ষে উন্নত খাবারের জন্য জনপ্রতি ৩০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ দিবস বা উৎসবে বন্দিদের উন্নত খাবার সরবরাহে ৩০ টাকার পরিবর্তে ১৫০ টাকা করা হয়েছে। আদালতে পাঠানোর সময় দুপুরের খাবারের বরাদ্দ ৩ টাকা ৬০ পয়সার স্থলে ৩০ টাকা করতে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। যা বাস্তবায়নাধীন। পুরনো ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ইতিহাস, ঐতিহাসিক ভবন সংরক্ষণ ও পারিপাশির্^ক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
কারা অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, পুরনো কারাগারের ৩৬ দশমিক ২১ একর এলাকায় এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। সেখানে থাকছে বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার কারা স্মৃতি জাদুঘর, সবার জন্য উন্মুক্ত পার্ক, কারা প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, কনভেনশন সেন্টার, ডিজিটাল মঞ্চ, সুইমিংপুল, সিনেপ্লেক্স, অ্যাকুস্টিক সাউন্ড সিস্টেম ও ফুডকোর্ট। কারাগারের যে কক্ষগুলোতে বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতাকে রাখা হয়েছিল, সেই কক্ষগুলো সংরক্ষিত রাখা হচ্ছে। প্রকল্পটিতে প্রস্তাবিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৩২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। ২০২০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এর কাজ শেষ হওয়ার কথা।
কারা অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার নির্মাণে তৃতীয় সংশোধিত প্রকল্প, খুলনা জেলা কারাগার নির্মাণের প্রথম সংশোধিত প্রকল্প, রাজশাহীতে কারা প্রশিক্ষণ একাডেমি নির্মাণ, ময়মনসিংহ কারাগার সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণ, মহিলা কারাবন্দিদের জন্য আবাসন নির্মাণ করা হচ্ছে। এছাড়া ঢাকা, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহ বিভাগে কারা নিরাপত্তা আধুনিকায়ন করা হয়েছে। কুমিল্লা কারাগার পুনর্নির্মাণ করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা শুধু বন্দিদের উন্নয়নই নয়, কারা অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্যও বেশকিছু উন্নয়নমূলক প্রকল্পের বিষয়ে তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কারা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের পদমর্যাদা বৃদ্ধি ও বেতন স্কেল উন্নত করা, কারারক্ষীদের ঝুঁকিভাতা দেওয়া, কারা কর্মচারীদের ছেলেমেয়েদের স্কুলবাস দেওয়া ও স্থাপিত কারা প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারি করা।
কারা অধিদপ্তরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, কারাগারে বন্দির সংখ্যা যে হারে বাড়ছে সে তুলনায় অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা বাড়ছে না। বর্তমানে দেশের ৬৮টি কারাগারে ধারণক্ষমতা ৪০ হাজার ৬৬৪ জন। তার বিপরীতে বন্দি আছে প্রায় ৯০ হাজার। কারাগারে সবসময় ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ বন্দি থাকে। তাই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কারাগারের অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা জরুরি। দেশের ৬৮ কারাগারে বর্তমানে ১৪১টি নারী সেলসহ মোট সেল আছে ২ হাজার ৫৭৪টি। প্রায় প্রতিটি সেলেই মারাত্মক ধরনের স্যানিটেশন সমস্যা রয়েছে। এ সমস্যাগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দূর করা জরুরি। এতে বন্দিরা ব্যাপকহারে উপকৃত হবে।
