দ্বিজেন শর্মা একটি নাম, একটি ইতিহাস। তিনি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন উদ্ভিদবিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদ। তার চর্চার ক্ষেত্র উদ্ভিদবিজ্ঞান কিন্তু বিচরণক্ষেত্র সাহিত্য। তার অন্বেষণ সমাজতন্ত্র, মানবিকীতন্ত্র ও শিল্পসাহিত্য জিজ্ঞাসা। তিনি লেখক, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক সর্বোপরি নিসর্গপ্রেমী। বাংলাদেশের উদ্ভিদজগৎকে সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরতে দ্বিজেন শর্মার চেয়ে এত বেশি কাজ আর বোধ হয় কেউ করেননি। তার রচনা ‘শ্যামলী নিসর্গ’ এক অনুসন্ধিৎসু বিজ্ঞানীর মনের দর্পণ, যার মধ্যে প্রথমত, আমরা ঢাকা শহরের বৃক্ষসম্পদের খোঁজ পাই এবং সারা বাংলাদেশকেও আবিষ্কার করি।
দ্বিজেন শর্মার ভাবনায় উদ্ভিদজগৎ প্রধান হলেও তিনি পরিবেশবান্ধব বাস্তুসংস্থান বিষয়ে প্রচুর লিখেছেন। সেসব লেখায় প্রকৃতির পাশাপাশি উঠে আসে বিজ্ঞান ও নন্দনশাস্ত্র। তার লেখায় বিজ্ঞানের সঙ্গে সাহিত্যের রং-রস কল্পনার মিশ্রণ থাকলেও, কখনো বৈজ্ঞানিক সত্যকে পাশ কাটাননি। মনে পড়ে, ছেলেবেলায় বাড়িতে নানা রকম পত্র-পত্রিকার সঙ্গে আসত সোভিয়েত ইউনিয়নের দু-একটি পত্রিকা, বই। সাদা গ্লোসি কাগজে ঝকঝকে লেখা, ঝলমলে ছবি। মস্কোর প্রগতি প্রকাশনার সব চমৎকার বই। মনকাড়া প্রচ্ছদের মলাটে মোড়া মজাদার গল্প আর মলাটের ওপর মুক্তোর মতো ঝলমল করে লেখক-অনুবাদকের নামÑ মার্কস, লেনিন, তলস্তয়, গোর্কি; দ্বিজেন শর্মা, ননী ভৌমিক, শুভময় ঘোষ, হায়াৎ মামুদ, দেবী শর্মা ও সমর সেন। তখন থেকেই দ্বিজেন শর্মা নামটি পরিচিত। তার বিজ্ঞান, শিশুসাহিত্য গ্রন্থ পাঠ করার অর্থই বিশেষ কিছু আনন্দকে পাঠ করা, আনন্দকে নতুনভাবে অনুভব করা। প্রতি লেখার কাব্যময়তা বাংলা গদ্যসাহিত্যের শক্তিতে নতুন মাত্রা যোগ করে।
দ্বিজেন শর্মা সভ্যতার সংকট নিয়ে আশা এবং হতাশায় ভুগতেন। তিনি লিখেছেন, ‘শোষিত মানুষ পুঁজির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে বারবার, কিন্তু সফল হতে পারেনি। তাই মানবসভ্যতার বিরুদ্ধে এখন প্রকৃতি বিদ্রোহ করতে শুরু করেছে। তার ধ্বংসাত্মক রূপ ক্রমেই প্রকট হচ্ছে। স্মরণীয়, প্রকৃতি একটি নির্বাক শক্তি। মানুষের প্রতি তার প্রেম-অপ্রেম কোনোটাই নাই, সে মানুষসহ পুরো জীবজগৎ ধ্বংস করে ফেলতে পারে। এটাই সভ্যতার বর্তমান সংকট, যার প্রতিবিধান আমরা কেউ জানি না। ...পুঁজির কোনো মুখ নেই। এটিও প্রকৃতির মতোই একটি অন্ধ শক্তি।’
বাস্তবতা ও আশাবাদের কথা জানিয়ে তিনি আরও লেখেন, ‘এখনকার বিশ্বায়ন বাস্তবতার বাইরে থাকা আমাদের জন্য বড়ই কঠিন। সামান্য ভরসা আছে হয়তো লাতিন আমেরিকায়। তবে তাদের দেশ বড়, লোকসংখ্যা কম, প্রাকৃতিক সম্পদ পর্যাপ্ত এবং ধর্মীয় মৌলবাদমুক্ত। তবে এরপরও আমরা জনসংখ্যা হ্রাস, প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণ, বনভূমির আবাদ, জলাশয় পুনঃখনন ও সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা, জলাভূমি ও নদী রক্ষা, কঠোর হস্তে কল-কারখানার দূষণ রোধ করতে পারি। যথার্থ সর্বজনীন শিক্ষা, সর্বসাধারণের মধ্যে প্রকৃতি ও পরিবেশের গুরুত্ব প্রচার, বৃষ্টিজল ও কৃষিজমি রক্ষা, সঞ্চয়ের ব্যাপক উদ্যোগ, নবায়নসাধ্য জ্বালানি ইত্যাদির মধ্য দিয়ে আমরা নিজেদের রক্ষা করতে পারি।’
তিনি বলতেন, এ মুহূর্তে আমাদের শহরে সবচেয়ে প্রয়োজন প্রচুর সংখ্যায় বড় গাছ লাগানো। এ প্রকৃতিবিদ রাষ্ট্রের অপবৈজ্ঞানিক, অপকীর্তির বিরুদ্ধে সদা সোচ্চার ছিলেন। সমাজতন্ত্রের আকাক্সক্ষা, এর নির্মাণ, সাফল্য-ব্যর্থতা নিয়ে তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও বিশ্লেষণ আমাদের চিন্তাজগৎকে নাড়িয়ে দেয়।
দ্বিজেন শর্মার লেখা ‘শ্যামলী নিসর্গ’, ‘নিসর্গ নির্মাণ ও নান্দনিক ভাবনা’, ‘কুরচি তোমার লাগি’, ‘ফুলগুলি যেন কথা’, ‘মম দুঃখের সাধন’, ‘গহন কোন বনের ধারে’ বইগুলোতে প্রকৃতি, পরিবেশ সুরক্ষা, সৌন্দর্যায়ন, বাস্তুসংস্থান সংকট ও সম্ভাবনা সম্পর্কে তার চিন্তার বিস্তারিত পরিচয় মেলে। ‘জীবনের শেষ নেই’, ‘বিজ্ঞান ও শিক্ষা : দায়বদ্ধতার নিরিখ’, ‘সতীর্থবলয়ে ডারউইন’, ‘ডারউইন ও প্রজাপতির উৎপত্তি’, ‘বিগল যাত্রীর ভ্রমণকথা’ এই অসাধারণ বইগুেেলা এতটাই সুখপাঠ্য যে, একবার পাঠ শুরু করলে শেষ না করে থামা যায় না। সোভিয়েত শিক্ষাবিদ আনাতলি লুনাচারস্কির শিক্ষা এবং হিমালয়ের তরুলতার জ্ঞান আহরণের জন্য ইংরেজ উদ্ভিদবিদের অসাধারণ এক অভিযানের কাহিনী ‘হিমালয়ের উদ্ভিদরাজ্যে ড্যালটন হুকার’ তার অসামান্য অনুবাদ গ্রন্থ। তার লেখার পরিধি উদ্ভিদশাস্ত্র, বিজ্ঞানের পাশাপাশি সমাজ, শিক্ষা ও রাজনীতি পর্যন্ত ব্যাপ্ত।
দ্বিজেন শর্মা ১৯২৯ সালের ২৯ মে মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার শিমুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদ্ভিদবিদ্যায় স্নাতকোত্তরের পর বরিশালে ব্রজমোহন কলেজে শিক্ষকতা করেন। পরে ঢাকায় নটর ডেম কলেজে কাজ করেন এক যুগ (১৯৬২-১৯৭৪)। এরপর অনুবাদকের চাকরি নিয়ে চলে যান সোভিয়েত ইউনিয়নে। তিনি প্রায় দুই দশক কাজ করেছেন মস্কোর প্রগতি প্রকাশনে। ষাটের দশকে ব্রজমোহন কলেজে অধ্যাপনার সময় বামধারার রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে পাকিস্তানি শাসকের কোপে পড়ে কিছুদিন জেল খেটেছেন। সেখানেও তার কলম চলেছে। মস্কোতে থাকাকালীন প্রত্যক্ষ করেছেন সমাজতন্ত্রে মানব মুক্তির অভিযাত্রার নানা অনুষঙ্গ। সোভিয়েত রাশিয়ার সংস্কৃতি চেতনা ও আন্তর্জাতিকতা বোধ তাকে মুগ্ধ করেছিল। সেই মুগ্ধতা তার জীবন ও মননকে যেমন সমৃদ্ধ করেছিল, তেমনি পরবর্তীকালে দ্বিজেন শর্মাকে আহত করেছিল সমাজতন্ত্র ভেঙে পড়ার ঘটনাবলি।
দ্বিজেন শর্মা যখন প্রকৃতিচর্চা শুরু করেছিলেন, তখন তিনি ছিলেন একা। প্রকৃতিরাজ্যের প্রতি আমাদের আকৃষ্ট করেছিলেন তিনি। তরু-বৃক্ষ ও প্রকৃতিকে গভীর আবেগে নিয়মিত চর্চার বিষয় করে তুলেছিলেন। তার গড়া
প্রকৃতি-প্রতিষ্ঠান ‘তরুপল্লব’ গাছ দেখা, গাছ চেনাসহ নানা কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। এই প্রকৃতিবিদ এশিয়াটিক সোসাইটির প্রকাশনা ‘বাংলাপিডিয়া’য় অনুবাদ-সম্পাদনা করেছেন। এ ছাড়া উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ প্রকল্পে ইংরেজি-বাংলা মিলিয়ে ৫৬ খণ্ডের গ্রন্থমালা রচনায় চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছিলেন নিরলসভাবে।
আত্মজীবনী ‘জীবনস্মৃতি : মধুময় পৃথিবীর ধূলি’-তে দ্বিজেন শর্মা লিখেছেন, ‘বিদ্যার্জনের আকাক্সক্ষা ছিল। আগ্রহ ছিল বিজ্ঞান ছাড়াও অন্য কিছু কিছু বিষয়ে। কিন্তু বিদ্যালাভের জন্য অন্তত একজন সদগুরু লাগে। অনেক খুঁজেও তেমন কাউকে পাইনি। অবশেষে অগতির গতি রবীন্দ্রনাথকেই কল্পগুরুর আসনে বসালাম।’ বইটি শেষ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথেরই লেখা গান দিয়ে : এই কথাটি মনে রেখো, তোমাদের এই হাসি খেলায়/আমি যে গান গেয়ে ছিলাম জীর্ণ পাতা ঝরার বেলায়/শুকনো ঘাসে শূন্য বনে আপন মনে/অনাদরে অবহেলায়/আমি যে গান গেয়েছিলাম...। গানের পালা শেষ করে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন ২০১৭ সালের আজকের দিনে। ১৫ সেপ্টেম্বর তার প্রয়াণ দিবস। প্রকৃতিপুত্র দ্বিজেন শর্মার প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা।
লেখক : শিক্ষক, ভারতেশ্বরী হোমস, মির্জাপুর, টাঙ্গাইল
