গল্পের গরু গাছ থেকে নামাবে কে

আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১২:০৩ এএম

লক্ষ্য ছিল দুটো এক. সুবিধাবঞ্চিত নারীদের জীবনমান উন্নয়নে সহায়তা, দুই. উন্নত জাতের গাভী পালনের বিস্তার ঘটানো। এই লক্ষ্যে সারা দেশের মোট ৫০টি উপজেলায় একটি প্রকল্পের কাজ শুরু করে সমবায় অধিদপ্তর। প্রকল্পের নাম ‘উন্নত জাতের গাভী পালনের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত মহিলাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন’। প্রকল্পের শর্ত অনুযায়ী, বিভিন্ন উপজেলায় দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থানকারী যে নারীদের সামান্য জমি আছে, যেখানে গরুর গোয়ালঘর বানানো ও ঘাস চাষ করা সম্ভব, এমন নারীরাই এই ঋণ পাবেন। সুবিধাবঞ্চিত নারীরা গাভী পালনের জন্য চার ধাপে মোট ১ লাখ ২০ হাজার টাকা করে পাবেন। সেই টাকায় প্রত্যেকে দুটি করে গাভী কিনবেন। ঋণ পাওয়ার পরবর্তী এক বছর শেষে ২ শতাংশ হারে সুদে ঋণগ্রহীতারা মাসিক কিস্তির মাধ্যমে টাকা পরিশোধ করবেন। গ্রামীণ নারীদের বিদ্যমান সামাজিক বাস্তবতায় সমবায় অধিদপ্তরের এই প্রকল্প নিঃসন্দেহে ইতিবাচক এবং সুবিধাবঞ্চিত নারীদের জীবনমান উন্নয়নে এতে দারুণ সুফলও পাওয়ার কথা।

কিন্তু শনিবার দেশ রূপান্তরের ‘দুস্থ ঋণের টাকা নেতাদের ঘরে’ শিরোনামের শীর্ষ প্রতিবেদনে দিনাজপুরের চিরিরবন্দরে সমবায় অধিদপ্তরের এই প্রকল্পে ঋণ বিতরণে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির যে চিত্র উঠে এসেছে তা ভয়াবহ। দিনাজপুরের চিরিরবন্দর ও সদর উপজেলা এই প্রকল্পের আওতায় ছিল। এর মধ্যে চিরিরবন্দর উপজেলার আবদুলপুর ও অমরপুর ইউনিয়নকে প্রকল্প এলাকা হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটিতে দেখা গেছে, দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা সুবিধাবঞ্চিত নারীদের মাঝে ওই ঋণের টাকা বিতরণের কথা থাকলেও তাদের খুব কম সংখ্যকই তা পেয়েছেন। ঋণ বিতরণের প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপে ওই ঋণ পেয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির পুত্রবধূ ও মেয়েসহ তাদের মতো সচ্ছল সব নারী। এভাবে ঋণ পাওয়া ১০০ নারীর মধ্যে প্রায় সবাই স্থানীয় আওয়ামী লীগ, কৃষক লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতাদের স্ত্রী-কন্যা ও পুত্রবধূ। তাদের মধ্যে আছেন মহিলা আওয়ামী লীগের নেত্রী এবং স্কুল-কলেজের শিক্ষক ও ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানদের স্ত্রীরাও; যাদের সবাই অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল।

দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, প্রকল্পের আওতায় তৃতীয় ও চতুর্থ ধাপে আরও ১০০ সুবিধাবঞ্চিত নারীর মধ্যে ঋণ বিতরণের প্রক্রিয়া প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। যেখানে একইভাবে ক্ষমতাসীন দলের নেতা বা তাদের আত্মীয়-স্বজনদের স্ত্রী-কন্যাদের নাম চূড়ান্ত করা হয়েছে। ঋণ প্রদানে এই অনিয়মের কথা স্বীকারও করেছেন প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা চিরিরবন্দর উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেছেন, মাঠপর্যায়ে গিয়ে প্রকল্পের শর্তাবলি অনুযায়ী সুবিধাভোগী নির্বাচনের কথা থাকলেও দলীয় নেতাকর্মীদের চাপে তা সম্ভব হয়নি। সুবিধাভোগী নির্বাচনের ক্ষেত্রে স্থানীয় সাংসদ ও সাবেক এক পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া একটি তালিকাও ভূমিকা রেখেছে বলে জানিয়েছেন এ সমবায় কর্মকর্তা। অন্যদিকে, খুব কমসংখ্যক সুবিধাবঞ্চিত নারীই এই ঋণ পেয়েছেন। আর প্রকল্পের আওতাধীন গ্রামগুলোর বেশিরভাগ সাধারণ মানুষই এই ঋণ সম্পর্কে কিছুই জানেন না।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, গ্রামের সুবিধাবঞ্চিত নারীদের কল্যাণ এবং উন্নত জাতের গাভী পালন বিস্তারের ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে চালু করা এই প্রকল্প বাস্তবে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির এক মচ্ছবে পরিণত হয়েছে। দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলায় গাভী পালনের ঋণ বিতরণে এমন স্বজনপ্রীতির কারণে সারা দেশের যে ৫০টি উপজেলায় সমবায় অধিদপ্তর এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সেগুলো নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। তাই অবিলম্বে সমবায় অধিদপ্তরের এই প্রকল্পে ঋণ বিতরণে অনিয়মের সার্বিক তদন্ত হওয়া উচিত। তদন্ত সাপেক্ষে অন্যায়ভাবে সুবিধাভোগীদের ঋণ বাতিল এবং সুষ্ঠু তালিকা করে প্রকৃত অর্থে সুবিধাবঞ্চিত নারীদের মধ্যে এই ঋণ বিতরণের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নিতে হবে।

সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, যারা এই স্বজনপ্রীতির অনিয়ম করছেন এবং যারা সেই সুবিধা ভোগ করছেন, তারা বিষয়টিকে অনৈতিক মনে করছেন না। এমনকি তারা যুক্তি দিচ্ছেন যে, ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতি করার কারণে তারা এই ‘সামান্য সুবিধা’ নিতেই পারেন। খেয়াল রাখা দরকার সুবিধাবঞ্চিত নারীদের সহায়তার পাশাপাশি উন্নত জাতের গাভী পালন এ প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য। এখন এই ঋণের টাকায় দেশে কতগুলো গাভী পালন হচ্ছে সে হিসাব জানাতে গেলে হয়তো গাভীগুলোকে গল্পের গরুর মতো গাছে উঠিয়ে দেওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না। কিন্তু গল্পের গরু গাছে উঠলেও, বাস্তবে গরুকে যেমন গাছে তোলা কঠিন; তেমনি কেউ যদি বলেন যে, সব গরু গাছে উঠে গেছে, সেই গরুকে গাছ থেকে টেনে নামানোও কঠিন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত