রংপুর-৩ আসনে উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের ছাড়ের অপেক্ষায় রয়েছে জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি (জাপা)। ইতিমধ্যে এ আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী প্রত্যাহার করে নেওয়ার ব্যাপারে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘গ্রিন সিগন্যাল’ পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন জাপার এক শীর্ষ নেতা। তবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত চিন্তামুক্ত হতে পারছে না দলটি। আজ সোমবার মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন যেকোনো সময় ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে এই ছাড়ের ঘোষণা আসতে পারে বলে আশা করছেন দলের নেতারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জাপার নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের দুই নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা আগেই সিগন্যাল পেয়েছি। তবুও প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছি। আশা করছি তিনি আমাদের প্রয়াত চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে তার এই আসনে মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে জাপার প্রার্থীকেই ঘোষণা দেবেন।
এ দুই নেতার একজন দেশ রূপান্তরকে এমনও বলেন, আমরা শতভাগ আশাবাদী যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই আসনে জাপার প্রার্থীকেই সমর্থন দেবেন। এ ব্যাপারে আমাদের দলের মহাসচিবের (মশিউর রহমান রাঙ্গা) সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে ছাড় দেওয়ার প্রস্তাবও করেছি। এখন ঘোষণার অপেক্ষায় আমরা। এরশাদের মৃত্যুর পর আসনটি শূন্য ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। আগামী ৫ অক্টোবর এ আসনে ভোটগ্রহণ। আজ সোমবার মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন। ফলে এ উপনির্বাচন মহাজোটগতভাবে হচ্ছে কি নাÑ সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়ও শেষ হয়ে আসছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মহাজোটের শরিক হিসেবে এরশাদকে ছেড়ে দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। এজন্যই জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা আওয়ামী লীগের কাছ থেকে উপনির্বাচনেও ছাড় আশা করছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গতকাল রাতে জাপার মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা প্রস্তাব দিয়েছি। যতক্ষণ না প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দেন, ততক্ষণ কিছুই বলা যাবে না। তবে আমরা আশাবাদী মহাজোটের শরিক হিসেবে আওয়ামী লীগ এ আসনে আমাদের ছাড় দেবে।
এর আগে গতকাল দুপুরে দলের চেয়ারম্যানের বনানী অফিসে বিভাগীয় সাংগঠনিক টিমের যৌথ সভা শেষে সাংবাদিকদের অনুরূপ আশার কথা বলেন মহাসচিব ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মশিউর রহমান রাঙ্গা। তিনি বলেন, রংপুর-৩ আসনের উপনির্বাচনে প্রার্থিতার বিষয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আলাপ হয়েছে। আজকালের মধ্যে তারা সিদ্ধান্ত জানাবে। আশা করছি, এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টির প্রার্থীকে সমর্থন দেবে। একাদশ জাতীয় নির্বাচনে আমরা জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করেছি, এ আসনটি ১৯৮৬ সাল থেকেই জাতীয় পার্টির। এরশাদ এ আসনে বারবার নির্বাচিত হয়েছেন।
গতকাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ এ আসনে ছাড় দেওয়ার ব্যাপারটি স্পষ্ট করেনি। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের রাজধানীর সেতু ভবনে এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের বলেন, জাতীয় পার্টি ছাড় চাইলে আওয়ামী লীগ বিবেচনা করতে পারে। রংপুরের আসনটি আসলে জোটের নিয়ম অনুযায়ী জাপার ছিল, এরশাদ সাহেবের আসন। এখন জাপা সংসদে বিরোধী দলের আসনে। তারা আলাদাভাবে নির্বাচনে এলে আসতে পারে, সেটা তাদের ব্যাপার। আর যদি জোটগতভাবে আমাদের কাছে আসনটি চান, তখন আমরা বিবেচনা করব। এই মুহূর্তে আমাদের প্রার্থী আছে। যতক্ষণ পর্যন্ত আলোচনা না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত কিছু বলা যাচ্ছে না। তারাও কোনো আবেদন করেননি। তাই এ ব্যাপারে কিছু বলা যাচ্ছে না।
এ ব্যাপারে জাপার প্রেসিডিয়াম মেম্বার ও যুব সংহতির সভাপতি আলমগীর শিকদার লোটন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২২টা আসন নিয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাপার সমঝোতা হয়েছিল। তার মধ্যে এ আসন একটি। তাছাড়া এটা আমাদের দলের চেয়ারম্যানের আসন। আমরা আশা করছি তার প্রতি সম্মান দেখিয়ে আওয়ামী লীগ এখানে জাপার প্রার্থীকেই সমর্থন দেবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জাপার একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত ৭ সেপ্টেম্বর গণভবনে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে দলের সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ডের সভায় উপনির্বাচনে রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম রাজুকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দেন। তখনই প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে মনোনয়ন প্রত্যাহার করা লাগতে পারে বলে জানান। মনোনয়ন চূড়ান্ত না হওয়ার আগপর্যন্ত নির্বাচনী কাজে অর্থ খরচ না করারও নির্দেশ দেন তিনি। এর আগেই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জাপার শীর্ষ কয়েকজন নেতা দেখা করেন এবং এই আসনে প্রার্থী নিয়ে আলোচনা করেন। পরে সাদ এরশাদকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়।
ওই শীর্ষ নেতাদের বরাত দিয়ে এক প্রেসিডিয়াম মেম্বার বলেন, সেদিনই বোঝা গেছে এ আসনে মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে জাপার প্রার্থীকে ছাড় দেওয়া হবে। এরপর আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে জাপার নেতাদের আরও আলোচনা হয়েছে। আমরা আশা করছি আজ আওয়ামী লীগ তার মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেবে এবং সাদ এরশাদকে মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হবে। তবে সবকিছুই নির্ভর করছে চূড়ান্ত ঘোষণার ওপর।
এদিকে এই আসনে উপনির্বাচন পরিচালনার জন্য পার্টির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদেরকে আহ্বায়ক এবং তাকে সদস্য সচিব করে গতকাল ১১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করেছে জাপা। এ কমিটি সাদ এরশাদের পক্ষে এবং জাপার ভেতরকার দ্বন্দ্ব নিরসনে কাজ করবে। এই কমিটির সদস্য আলমগীর শিকদার লোটন দেশ রূপান্তরকে বলেন, রংপুরের মানুষ লাঙ্গলের পক্ষে। তারা এরশাদকে খুবই পছন্দ করেন। তার আসনে তারই ছেলে সাদ এরশাদ প্রার্থী হওয়ায় জাপার জয় নিশ্চিত। তার পক্ষে ইতিমধ্যেই প্রতিটি ওয়ার্ডে কাজ শুরু হয়েছে। দলের ভেতর যে দ্বন্দ্বের কথা বলা হচ্ছে, সেটা মেটাতে আমরা রংপুরে যাব। নেতাদের সঙ্গে বসব। আশা করি এসব মিটে যাবে।
তবে গতকাল পর্যন্ত মনোনয়ন প্রত্যাহারের কোনো নির্দেশ কেন্দ্র থেকে রংপুরে যায়নি বলে জানিয়েছেন এই আসনে রংপুরের দলীয় প্রার্থী অ্যাডভোকেট রেজাউল করিম রাজু। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমার নেত্রী (শেখ হাসিনা) আমাকে নৌকা প্রতীক দিয়েছেন। যতক্ষণ না পরবর্তী কোনো নির্দেশ আসবে, ততক্ষণ আমরা মাঠে থাকব। কেন্দ্রীয় নেতারা যে সিদ্ধান্ত দেবেন সেটাই চূড়ান্ত হবে। মনোনয়ন প্রত্যাহার করতে বললে করব। নেত্রী যা বলবেন তাই হবে। তার নির্দেশেই মাঠে আছি। মহাজোটের পক্ষে কাজ করতে বললে তাই করব।
এ আসনে আওয়ামী লীগের ছাড়ের ব্যাপারে আশাবাদী তৃণমূল জাপাও। রংপুর জেলা জাপার ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুর রাজ্জাক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ছাড়ের ব্যাপারটি চূড়ান্তই বলা চলে। এখন পর্যন্ত পজিটিভ। তবে ঘোষণা না আসা পর্যন্ত নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না। এই নেতা আরও বলেন, যারা এখনো জাপার দলীয় প্রার্থী সাদ এরশাদের বিপক্ষে, আশা করছি তাদের সঙ্গে সমঝোতা হবে। আমরা চেষ্টা করছি দ্বন্দ্ব মেটানোর। শেষ পর্যন্ত আমরা একসঙ্গেই কাজ করব।
আওয়ামী লীগ ও জাপায় প্রার্থী নিয়ে টানাপড়েন থাকায় গতকাল পর্যন্ত এ আসনে কোনো নির্বাচনী আমেজ লক্ষ্য করা যায়নি বলে জানিয়েছেন আমাদের রংপুর প্রতিনিধি। তিনি জানান, মাঠে কোনো প্রার্থী নামেননি। আওয়ামী লীগের প্রার্থী গতকাল সদর থানার পাগলা পীর এলাকায় ছোট আকারে এক কর্মিসভা করেছেন। সাদ এরশাদ সিলেটে। জাপার বিদ্রোহী প্রার্থী দলের বহিষ্কৃত নেতা ও এরশাদের ভাতিজা আসিফ শাহরিয়ার চুপচাপ। বিএনপি প্রার্থী রিটাও চোখে পড়ার মতো কিছু করছেন না। ফলে এখানকার মানুষের মধ্যে এখনো নির্বাচনী আমেজ নেই। এখানকার মানুষ অপেক্ষায় রয়েছেন প্রার্থীর চূড়ান্ত ঘোষণায়।
১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টির প্রার্থী শফিকুল গণি স্বপন জেতার পর থেকে রংপুর আসনটি আর কখনো জাতীয় পার্টির হাতছাড়া হয়নি। সর্বশেষ দুটি নির্বাচনে এ আসন থেকে এমপি হয়েছিলেন পার্টি চেয়ারম্যান এরশাদ। ২০১৪ ও ’১৮ সালের ওই নির্বাচনে এরশাদের বিপরীতে কোনো প্রার্থী দেয়নি মহাজোটে তাদের শরিক আওয়ামী লীগ। চলমান একাদশ সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা এরশাদ গত ১৪ জুলাই মারা গেলে রংপুর-৩ আসনটি শূন্য হয়।
আসিফ জাতীয় পার্টির কেউ না : গতকাল দলের মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, এরশাদ জীবদ্দশায় তার ভাতিজা আসিফকে জাতীয় পার্টি থেকে বহিষ্কার করেছেন। তাই আসিফ এখন আর জাতীয় পার্টির কেউ না। গত রংপুর সিটি নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়ে সামান্য ভোট পেয়েছিলেন তিনি। তাই এ আসনের নির্বাচনে আসিফ কোনো আলোচ্য বিষয় নয়।
পরিবর্তন হচ্ছে জাপার কাউন্সিলের তারিখ : মহাসচিব আরও জানান, আওয়ামী লীগের সম্মেলন একই তারিখ (২০ ও ২১ ডিসেম্বর) হওয়ায় জাতীয় পার্টির কাউন্সিলের তারিখ (২১ ডিসেম্বর) পরিবর্তন করা হবে। এ ক্ষেত্রে আগে বা পরে হতে পারে। আগামী কাউন্সিলের আগেই বিভাগীয় কমিটির মাধ্যমে জেলাগুলোর কাউন্সিল শেষ করতে হবে। জেলা থেকে যারা নেতৃত্ব দেবেন সংসদ নির্বাচনের জন্য তাদের ঠিক করা হবে।
