দুই মাস ধরে বেতন ও ওভার টাইমের টাকা না পেয়ে মানবেতর দিন কাটছে রাজধানীর মিরপুরের ‘জারা জিন্স অ্যান্ড নিটওয়্যার লিমিটেড’ নামের একটি গার্মেন্টের সাত শতাধিক শ্রমিকের। অনেকেই বাসা ভাড়া দেওয়া দূরের কথা দুবেলা খাবারও পাচ্ছে না। এর মধ্যেই বকেয়া টাকা না দিয়ে গত বুধবার (১১ সেপ্টেম্বর) হঠাৎ গার্মেন্টে তালা ঝুলিয়ে মালিক পালিয়ে যায়। পরদিন বৃহস্পতিবার বেতন দেওয়ার কথা ছিল বলে জানিয়েছে শ্রমিকরা। এ ঘটনায় ফুঁসে উঠেছে শ্রমিকরা। গত রবিবার সকাল থেকেই মিরপুর সনি সিনেমা হলের সামনের সব কটি সড়ক বন্ধ করে দিনভর আন্দোলন করে তারা। বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে পুলিশ গার্মেন্টের চেয়ারম্যানকে খুঁজে আনলে সড়ক ছেড়ে দেয় শ্রমিকরা। গার্মেন্টের ভেতরে বিকেল থেকে পুলিশ ও বিজিএমইএ প্রতিনিধিদের মধ্যস্থতায় গার্মেন্টের চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলাম রাজুর সঙ্গে শ্রমিকদের দফায় দফায় বৈঠক হলেও তাৎক্ষণিক কোনো সমাধানে আসতে পারেনি উভয় পক্ষ। রবিবার বিকেল থেকে সোমবার সন্ধ্যায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত রিয়াজুল ইসলাম গার্মেন্টের ভেতরেই অবস্থান করছেন। শ্রমিকরাও শান্তিপূর্ণভাবে গার্মেন্টের ভেতরে অবস্থান করছে।
রবিবারের বৈঠকে উপস্থিত পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, রিয়াজুল ইসলাম লোকসান হওয়ার কারণে গার্মেন্টটি চালাতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন। এ সময় শ্রমিকরা বকেয়া বেতনের পাশাপাশি পূর্বঘোষণা ছাড়া হঠাৎ গার্মেন্ট বন্ধ করায় শ্রম আইন অনুযায়ী প্রায় ৪ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করে। এই টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানান রিয়াজুল ইসলাম। এ সময় বিজিএমইএ প্রতিনিধিদের মধ্যস্থতায় শ্রমিকরা কিছুটা ছাড় দিয়ে দুই মাসের বকেয়া বেতন, ওভারটাইম ও এক মাসের বেসিক বেতন বাবদ ২ কোটি ১৬ লাখ টাকা দাবি করে।
তিনি আরও জানান, প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মেশিন বিক্রি করে এই টাকা পরিশোধ করতে চান। তবে মেশিনের দাম এক কোটি টাকার বেশি না ওঠায় তিনি বুধবার বিকেল ৪টার মধ্যে টাকা পরিশোধ করবেন বলে জানান। শ্রমিকরা টাকা ছাড়া তাকে ছাড়বে না বলে জানিয়ে দেয়। বুধবার পর্যন্ত তিনি গার্মেন্টটির ভেতরেই অবস্থান করবেন বলে বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়।
এ বিষয়ে গতকাল সন্ধ্যায় শাহআলী থানার ওসি সালাউদ্দিন মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রবিবার বিকেল ৩টায় শ্রমিকরা রাস্তা ছেড়ে ফ্যাক্টরিতে শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান নেয়। আজও (সোমবার) অল্পকিছু শ্রমিক ফ্যাক্টরিতে আছে। ফ্যাক্টরির মালিকও সেখানে আছেন। উভয় পক্ষের সর্বসম্মতিক্রমে ২ কোটি ১৬ লাখ টাকা পাওনা দিলে শ্রমিকরা সব ছেড়ে চলে যাবে এমন একটি সমঝোতা হয়েছে। মালিক প্রথমে মানতে না চাইলেও পরে বিজিএমইএর মধ্যস্থতায় মেনে নিয়েছেন। বুধবার মালিক টাকা পরিশোধ করবেন বলে জানিয়েছেন।’
রিপন হোসেন নামের এক শ্রমিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গার্মেন্ট বন্ধ করলে যে ক্ষতিপূরণ আমাদের পাওনা তা দিতে সম্মত হয়নি মালিক। আমরা ছাড় দিয়েছি। কিন্তু ন্যূনতম পাওনা টাকা না নিয়ে আমরা যাব না। বুধবার বিকেল পর্যন্ত আমরা শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান করব। মালিককেও আমরা যেতে দেব না। কারণ সে চলে গেলে আর খুঁজে পাওয়া নাও যেতে পারে। টাকা না দিলে আমরা ফের রাস্তায় নামতে বাধ্য হব।’
গার্মেন্টটির শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত দুই মাস ধরে কোনো কাজ নেই তাদের। তারা প্রতিদিন আসে আর যায়। গত ঈদুল আজহার আগে বেতন না পেয়ে আন্দোলন করে। তখনো বিজিএমইএর হস্তক্ষেপে অর্ধেক বেতন দেয়। ঈদের পর থেকে আর কোনো বেতন পায়নি তারা। ফলে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ছেলে-মেয়েকে দুবেলা ঠিকমতন ভাতও দিতে পারছে না বেশিরভাগ শ্রমিক। মিরপুর উত্তর বিশিল বউবাজারের একটি ভাড়া বাসায় থাকেন গার্মেন্টটির শ্রমিক রেখা বেগম (৩০)। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাসা ভাড়া সাড়ে ৪ হাজার টাকা। দুই মাস ভাড়া দিতে পারি না। ঠিকমতন খেতেও পারি না। দুই ছেলে-মেয়ে নিয়ে বিপদে পড়ে গেছি।’ সুমি আক্তার (৪০) নামের আরেক শ্রমিক জানান, তার স্বামী অসুস্থ। এজন্য গার্মেন্টে কাজ নিয়েছেন। কিন্তু বেতন না পাওয়ায় স্বামীর ওষুধও কিনতে পারছেন না।
প্রসঙ্গত, মিরপুর চিড়িয়াখানা রোডের মল্লিক টাওয়ারের ৫ম ও ৬ষ্ঠ তলার দুটি ফ্লোর নিয়ে গার্মেন্টটি প্রতিষ্ঠিত। গত ১১ সেপ্টেম্বর শ্রমিকরা গার্মেন্টে এসে দেখে তালা ঝুলছে। এর আগে কোনো ধরনের নোটিস দেওয়া হয়নি বলে জানায় শ্রমিকরা। তারা শ্যামলীতে মালিকের বাসায় গিয়েও দেখে সেখানেও সে নেই। বিষয়টি নিয়ে তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর কার্যালয়ে যায় তারা। কিন্তু সেখানেও কোনো সুরাহা হয়নি।
আমাদের সাভার প্রতিনিধি জানান, সাভারে বকেয়া বেতন পরিশোধ এবং কারখানা চালুর দাবিতে টানা চার দিন ধরে বিক্ষোভসহ কর্মবিরতি পালনা করে আসছে ‘সার্ক নিটওয়্যার লিমিটেড’ নামের একটি পোশাক কারখানার ৯ শতাধিক শ্রমিক। গতকাল সোমবার দুপুরেও দাবি আদায়ে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছে তারা।
বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা জানায়, গত কয়েক দিন ধরে কারখানা কর্র্তৃপক্ষ শ্রমিকদের বকেয়া বেতন পরিশোধ না করে বিভিন্ন ধরনের টালবাহানা করে আসছে। এ ছাড়া তিন মাস ধরে কারখানার কর্মকর্তাদেরও বেতন আটকে রেখে গা ঢাকা দিয়েছে মালিকপক্ষ।
