বিশ্বে এক দেশ থেকে আরেক দেশে দেশান্তরী হওয়াটা সুদূর অতীতকাল থেকেই চলছে। নেহাত পর্যটক হিসেবে যাতায়াত নয়; তীর্থযাত্রা, শিক্ষা, চাকরি, ব্যবসা এবং অভিযাত্রার কারণে গমনও অনেককে এক দেশ থেকে অন্য দেশে অভিবাসী করেছে। তবে বঙ্গীয় সমতলের মানুষরা বড় আকারে দেশান্তরী হয়েছে প্রধানত দাঙ্গার কারণে। ব্রিটিশরা এই উপমহাদেশ ছেড়ে যাওয়ার আগে ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট ঘটে যাওয়া কলকাতার হিন্দু মুসলমান দাঙ্গা বঙ্গীয় সমতলে স্থায়ী ক্ষত সৃষ্টি করে। ১৯২০-এর দশক থেকেই বাংলার মানুষদের হিন্দু-মুসলমানে ভাগ করার এবং বাংলা বিরোধী শক্তির দ্বারা বাংলাকে পদানত করার ষড়যন্ত্র চলছিল।
ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার আগে ক্যাবিনেট মিশনের মাধ্যমে ১৬ মে ১৯৪৬ ও ২৩ মে ১৯৪৬ যখন তারা ভারতকে অ, ই, ঈ, এই তিন ভাগে ভাগ করার প্রস্তাব দেয় এবং সেই তৃতীয় ভাগে বাংলা-বিহার-আসাম রাখার প্রস্তাব দেয়, তখনই এই দাঙ্গার পরিকল্পনা করা হয়। এই দাঙ্গায় প্রায় ১০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। এরপর নোয়াখালীর দাঙ্গা ছিল হিন্দুদের ওপর প্রতিশোধ এবং বিহারের দাঙ্গা ছিল মুসলমানদের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার লক্ষ্যে। এর ফলেই সারা বাংলাকে হিন্দু মুসলমান এলাকা ধরে ভাগ করা হয় এবং ভারত ও পাকিস্তানের অধীন করে দেওয়া হয়। কিন্তু দাঙ্গা পরিস্থিতি থামেনি, ফলে লাখ লাখ মানুষ ভিটেমাটি ছেড়ে দেশান্তরী হয়ে যায়।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ১৯৫১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) জনসংখ্যা ছিল ৪ দশমিক ২ কোটি; যার ২২ শতাংশ ছিল হিন্দু, অর্থাৎ ৯২ দশমিক ৪ লাখ। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের (২০১৮) জনসংখ্যা ১৮ কোটির মতো। বলা হয়, এর ১০ শতাংশ হিন্দু, অর্থাৎ ১৮০ লাখ। নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জনসংখ্যায় হিন্দুদের অনুপাত কমেছে। এর কারণ ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সময়কালে বিহার থেকে ১০ লাখ, পশ্চিমবঙ্গ থেকে ৫০ লাখ এবং ত্রিপুরা ও আসাম থেকে ২০ লাখ মুসলমানের বাংলাদেশ আসা এবং বাংলাদেশ থেকে ৭০ লাখ হিন্দুর ভারতে চলে যাওয়া। ভারত থেকে আসা ৮০ লাখ মুসলমান মৃত্যু ও সন্তান-সন্ততিতে বংশবিস্তার নিয়ে বর্তমানে (২০১৮) ৩০০ লাখ বা ৩ কোটি হয়েছে। এদের বড় অংশই প্রধানত সীমান্ত এলাকার জেলাগুলোতে থিতু হয়েছে। তবে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া হিন্দুরা ভারতের দূর-দূরান্তেও ছড়িয়ে পড়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমারের আরাকান থেকে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের কাহিনী একই প্রকার মর্মান্তিক। ব্রিটিশরা ১৮২৬ সালে আরাকান দখল করে ‘বিভেদ করে শাসন কর’ নীতি অনুসরণ করে। ১৯৪০-এর দশকে শুরু হওয়া দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে আরাকানের বৌদ্ধরা জাপানিদের পক্ষ নেয়। জাপানি সেনারা এগিয়ে আসতে থাকলে ব্রিটিশরা রোহিঙ্গা মুসলমানদের নিয়োগ করে তাদের বাধা দেয়। মুসলমান ও বৌদ্ধদের মধ্যকার সৃষ্ট এই শত্রুতার ফলে ১৯৪২-৪৩ সালে দাঙ্গা হয় এবং উভয় পক্ষের হাজার হাজার লোক মারা পড়ে। এভাবে নৃতাত্ত্বিক ধারায় তারা পরস্পরবিরোধী হয়ে যায়। ১৯৪৮ সালে বার্মা (মিয়ানমার) স্বাধীন হলে যুদ্ধরত অবস্থায় এই দুই গোষ্ঠীকে বার্মার অধীনে দিয়ে ব্রিটিশরা চলে যায়। এ সময় রোহিঙ্গারা পাকিস্তানে যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলে
পাকিস্তানি নেতারা তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসেনি। ফলে তাদের পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে যায়। এরপর থেকে বিভিন্ন সময় দফায় দফায় রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। সম্প্রতি সেখানে ‘আরসা’ (অৎধশধহ জড়যরহমুধ ঝধষাধঃরড়হ অৎসু) নামের একটি বিদ্রোহী সংগঠন গড়ে ওঠে, যারা রোহিঙ্গাদের রক্ষার নামে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলাও চালায়। বিগত ২৫ আগস্ট ২০১৭ আরসার এমনই এক হামলার অজুহাতে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী আরাকানে রোহিঙ্গাদের ওপর ভয়াবহ অভিযান শুরু করে এবং গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়ে ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ শুরু করলে লাখ লাখ রোহিঙ্গা তাদের সম্পত্তি ও আবাদি জমি ফেলে ব্যাপক হারে বাংলাদেশে আসতে থাকে।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের কাছ থেকে পাওয়া স্বাধীনতায় বাংলাদেশ তৎকালীন পাকিস্তানের অংশ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ওই
পাকিস্তানের মানুষ বাংলাদেশের মানুষদের নয়, বাংলাদেশের সম্পদকে চেয়েছিল। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে স্বাধীন হয়। স্বাধীনতাযুদ্ধকে কেন্দ্র করে ১৯৭১ সালে হয় বাঙালি-বিহারি দাঙ্গা হয়। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে কয়েক লাখ বিহারি বাংলাদেশ ছেড়ে ভারত ও পাকিস্তানে চলে যায়। আজ স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরে স্বাধীন বাংলাদেশের সীমানা ঘিরে এর উভয় পাশে বাস্তুচ্যুত মানুষদের নিয়ে এক অদ্ভুত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশের ভেতরে প্রায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু আছে, যারা শরণার্থী হয়ে ক্যাম্পে বাস করছে। বাংলাদেশের বাইরে আসামে ‘বাঙাল খেদাও’ দাঙ্গার ফলে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। এর মধ্যে ১৯ লাখেরও বেশি স্থানীয় বাঙালি ভারতীয় নাগরিকত্ব হারিয়ে উদ্বাস্তু হওয়ার ভয়ে দিনাতিপাত করছে। এসব নিরীহ মানুষ স্বেচ্ছায় নয়, জাতিগত দাঙ্গায় ঘরছাড়া হয়েছে বা ঘরছাড়া হওয়ার হুমকিতে আছে। এ ছাড়া আছে তাদের কাহিনী, যারা মানব পাচারকারীদের প্রলোভনে বিদেশে পাড়ি দিয়েছে।
বাংলাদেশের কিছু মানুষ অবৈধভাবে স্থলপথে ভারতের দিকে পাড়ি দেয়। ভারতের পরিবারগুলোতে পুত্রসন্তানের তীব্র চাহিদা থাকায় অনেক পরিবারে দাসীর পেটে পুত্রসন্তান নেওয়ার চাহিদা আছে। সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগে ডাক্তারি পরীক্ষায় মায়ের পেটে লিঙ্গ জেনে নেওয়ার সুযোগ থাকায় এই চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে। ভারতীয় পরিবারগুলোতে কন্যাসন্তান পেটে থাকতেই নষ্ট করে দেওয়ার প্রবণতা আছে। তাই বাংলাদেশের মেয়েরা যারা অবৈধপথে ভারতে যায়, তারা ওই ধরনের পরিবারে বিক্রি হয়ে যায়। ভারতে দেহব্যবসা খুব রমরমা, তাই সেখানেও অনেকে স্থান পায়। বাংলাদেশের অনেক মেয়ে চোরাপথে ভারত হয়ে পাকিস্তানেও চলে যায়। পাকিস্তানে একটি পাঠান যুবকের বিয়ে করতে যৌতুক হিসেবে যে খরচ করতে হয়, তার চেয়ে অনেক কম খরচে বাংলাদেশের মেয়ে কেনা যায়। বাংলাদেশ থেকে নৌকা বা ছোট জাহাজে চড়ে মালয়েশিয়া যাওয়ার লক্ষ্যে পরিবারসুদ্ধ যারা ওঠে, তারা রোহিঙ্গা। এই রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের আরাকান রাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়ে বাংলাদেশের শরণার্থী ক্যাম্পে আছে। আরাকান থেকে আসার সময় ভিটেমাটি ত্যাগ করে আসায় তাদের কোনো পিছুটান নেই। যারা কিছু অর্থসম্পদ নিয়ে আসতে পেরেছে বা বাংলাদেশে কিছু অর্থসম্পদ সংগ্রহ করতে পেরেছে, তারাই দালালদের ওপর ভরসা করে পরিবারসহ সাগরে ভাসে।
বাংলাদেশকে ঘিরে পূর্ব ভারতের বঙ্গীয় সমতল বা মিলিতভাবে ‘পূর্বদেশ’ এলাকার বিশাল-সংখ্যক মানুষ আজ জীবনের ভয় ভিটেমাটি ছাড়া। বঙ্গীয় সমতলের প্রায় একই এলাকায় থেকেও রাজনৈতিক সীমারেখার বাইরে হওয়ায় তাদের অনুপ্রবেশকারী বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে এবং মানবেতর আচরণ করা হচ্ছে। পৃথিবীর নানা দেশে উদ্বাস্তু মানুষ আছে, যারা ওই সব দেশের মানবিক সরকারগুলোর আইন ও ব্যবস্থাপনায় নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে পারছে। কিন্তু বঙ্গীয় সমতলের এসব মানুষ তাদের নিজ এলাকাতেই পরবাসী। ভারত, মিয়ানমার ও বাংলাদেশ, এই তিন দেশের সরকারই তাদের জীবনের নিরাপত্তা দিতে পারছে না। ভারত ও মিয়ানমার সরকার বরং আসাম ও আরাকানে নাগরিক নিবন্ধনকরণের নামে এমন সব আইন করছে বা এমন ব্যবস্থা করছে, যার ফলে জাতিগত বিরোধ তীব্রতর হচ্ছে। আমরা তাই সমগ্র পূর্বদেশ এলাকার মানুষের মানবিক তথা নাগরিক অধিকার সমুন্নত রাখা এবং তাদের পুনর্বাসন, কর্মসংস্থানসহ থিতু হওয়ার অধিকার দেওয়ার ব্যাপারে জনমত গড়ে তুলতে চাই। আমরা এই সঙ্গে এসব দেশের সরকারগুলোকে বিপন্ন মানুষদের সঙ্গে সভ্য ও মানবিক গুণসম্পন্ন আচরণ করতে আহ্বান জানাচ্ছি।
লেখক
প্রকৌশলী ও চেয়ারম্যান, জল ও পরিবেশ ইনস্টিটিউট
