আর্থিক ব্যবস্থায় তারল্য সংকটে থাকলেও দেশের সব ধরনের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ সীমা বাড়ানোর নির্দেশনা জারি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। মূলত বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়াতেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক এমন উদ্যোগ নিয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সব ধরনের ব্যাংকের অগ্রিম আমানত অনুপাত (এডিআর) বাড়িয়ে আগের অবস্থানে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
গত কয়েক বছর জিডিপি অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগ একই জায়গায় রয়েছে। আর্থিক খাতে ২০১৮ সাল থেকে চলমান তারল্য সংকটের কারণে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে কমতে দেখা গেছে। এ কারণে সর্বশেষ ঘোষিত মুদ্রানীতিতেও বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহের লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে আনা হয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকগুলোতে তারল্য বাড়ায় এডিআর অনুপাত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ফলে ব্যাংকগুলো বিদ্যমান সীমার থেকে আরও বেশি ঋণ বিতরণ করতে পারবে। তবে এতে আগ্রাসী ব্যাংকিংয়ের ঝুঁকি বাড়বে আগের মতোই।
গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, এখন থেকে প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলো তাদের আমানতের ৮৫ শতাংশ বিনিয়োগ করতে পারবে। আর শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর জন্য এই সীমা দাঁড়াবে ৯০ শতাংশ। তবে বিনিয়োগ সীমা বাড়ানো হলেও এডিআর সমন্বয়ের সময় বাড়ানো হয়নি। বিনিয়োগ সীমা বাড়ানোর ফলে ব্যাংকগুলোর জন্য এডিআর সমন্বয় অনেকটাই সহজ হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রচলিত ধারার যেসব ব্যাংকের বিনিয়োগ ৮৫ শতাংশের বেশি রয়েছে, তাদের চলতি মাসের মধ্যেই তা সমন্বয় করতে হবে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে। আর ইসলামি ব্যাংকগুলো ৯০ শতাংশের নির্ধারিত সীমায় এডিআর সমন্বয় করবে।
২০১৭ সালে আগ্রাসী ঋণ বিতরণের কারণে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর একটি বড় অংশ নির্ধারিত এডিআর অতিক্রম করে ফেলে।
এডিআর বাড়ার মাধ্যমে ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় তা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আমানতের তুলনায় ঋণ বেশি হওয়ায় ২০১৮ সালের ৩০ জানুয়ারি এক সার্কুলারের মাধমে প্রচলিত ব্যাংকগুলোর এডিআর ৮৫ শতাংশ থেকে ৮৩ দশমিক ৫ শতাংশ ও ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোর জন্য তাদের বিনিয়োগ-আমানত অনুপাত (আইডিআর) ৯০ থেকে ৮৯ শতাংশে নামিয়ে আনতে নির্দেশনা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এজন্য ব্যাংকগুলোকে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এডিআর সমন্বয়ের সময় বেঁধে দেওয়া হলেও পরে দুই দফায় তা বাড়িয়ে চলতি বছর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত করা হয়।
জানা গেছে, অধিকাংশ ব্যাংক এডিআর সমন্বয় করতে পারলেও এখনো ১২টি ব্যাংক নির্ধারিত সীমার বাইরে রয়েছে।
চলতি অর্থবছরের জন্য ঘোষিত মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন করা হয়েছে ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ। এর আগে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের শেষ ছয় মাসের মুদ্রানীতিতে গত জুন পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ১৬ দশমিক ৫০ শতাংশ। তবে তারল্য সংকটের কারণে চলতি জুন নাগাদ ঋণ প্রবৃদ্ধি হয় ১১ দশমিক ২৯ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টরা জানান, আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ব্যাংকগুলোর এডিআর নতুন সীমায় নামিয়ে আনার নির্দেশনা রয়েছে। এসব কারণে ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে সতর্কতা দেখানোয় প্রবৃদ্ধি আশানুরূপ হারে বাড়ছে না। এমন পরিস্থিতিতে বিনিয়োগ সীমা বাড়িয়ে আগের অবস্থানে ফিরে গেল বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যাংকগুলোতে তারল্য পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। ব্যাংকগুলোতে আমানত বাড়তে শুরু করেছে। বিক্রি কমছে সঞ্চয়পত্রের। তাছাড়া ডলার সংকটও কিছুটা কমেছে। বিপুল পরিমাণ ঋণপত্র-এলসি খোলার চাপও কমেছে। এসব সূচক বিবেচনায় এডিআর কিছুটা শিথিল করা হয়েছে। এর ফলে বিনিয়োগ বাড়বে, অর্থনীতি চাঙ্গা হবে।
২০১৮ সালের শুরুতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে ব্যাংক মালিকদের বৈঠকে ব্যাংক ব্যবস্থায় তারল্য সংকট সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা রাখা বেসরকারি ব্যাংকগুলোর নগদ জমা সংরক্ষণ (ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও-সিআরআর) এক শতাংশ কমানো ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের তহবিলের ৫০ ভাগ অর্থ বেসরকারি ব্যাংকে রাখার সিদ্ধান্ত হয়। তবে কোনো পদক্ষেপই ব্যাংক খাতে তারল্য পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। নগদ অর্থের টানাটানির কারণে কলমানি মার্কেটের সুদহারও বেড়ে গেছে। একই
কারণে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে গেছে। তবে সম্প্রতি সঞ্চয়পত্রে কড়াকড়ি আরোপ ও পুঁজিবাজারে ঝুঁকি বাড়ায় সাধারণ মানুষের ব্যাংকে আমানত রাখার প্রবণতা বাড়ছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে।
