ছাত্রলীগ নেতাদের ক্ষমতা প্রদর্শনের রাজনীতি ত্যাগ করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। নতুন দায়িত্ব পাওয়ার পর কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় ও সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে সংগঠনটির কয়েকজন নেতা গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তাদের সাংগঠনিক অভিভাবক শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গণভবনে গেলে তিনি এ নির্দেশ দেন। পরে প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব হাসান জাহিদ তুষার সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন।
ছাত্রলীগ নেতাদের সতর্ক করে শেখ হাসিনা বলেন, তোমাদের ওপর বিশ্বাস ও আস্থা নিয়ে দায়িত্ব দিয়েছি। বিশ্বাস ও আস্থার মর্যাদা যদি রাখতে না পার তাহলে। ক্ষমতা প্রদর্শনের রাজনীতি ত্যাগ করার নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, ক্ষমতা সো আপ করা, ছাত্রনেতাদের কাছ থেকে আশা করি না। ছাত্রনেতাদের বিনয়ী থাকতে হবে। যত উপরে উঠবে তত বিনয়ী হতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, মোটরসাইকেল নিয়ে চলতে হবে, প্রোটোকল নিয়ে চলতে হবে, ক্ষমতার সঙ্গে চলতে হবে এগুলো করা যাবে না। এগুলো করলে সাময়িকভাবে কিছু টাকা পয়সা হবে, কিন্তু হারিয়ে যাবে। সেটা হবে দুঃখজনক। এটা আমি তোমাদের কাছে চাই না।
শেখ হাসিনা বলেন, তাৎক্ষণিকভাবে কিছু পেলেই নিয়ে নিতে হবে এই ধারণা নিয়ে রাজনীতি করলে কিছু পাওয়া যায় না। যখন যেভাবে চলার সেই শিক্ষা নিয়ে চলতে হবে। সেই শিক্ষা বাবা-মায়ের কাছ থেকে পেয়েছিলাম। এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধুকন্যা নিজের জীবনে ত্যাগ স্বীকার করার কথা জানিয়ে বলেন, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য কম্প্রোমাইজ করতে বলেছিল, তখন বলেছিলাম প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ইচ্ছে নেই। নিজের জীবনে রাজনৈতিক প্রতিকূলতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, যত প্রতিকূল অবস্থা আমার জীবনে মোকাবিলা করতে হয়েছে, বাংলাদেশের আর কারও হয়নি। আমাকে অনেক অফার দেওয়া হয়েছে। জীবনে কখনো কম্প্রোমাইজ করিনি।
ছাত্রলীগকে শক্তিশালী সংগঠন হিসেবে গড়ে তোলার নির্দেশনা দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, সিদ্ধান্ত আলোচনার মাধ্যমে সম্মিলিতভাবে নিতে হবে। যাতে সংগঠন আরও শক্তিশালী হয়। তিনি বলেন, নীতি, আদর্শ, সততা, সংযম নিয়ে রাজনীতি করতে হবে। যদি সেটা না কর, একটা আদর্শ নিয়ে রাজনীতি না কর, তাহলে ভবিষ্যতে কার কাছে দেশ রেখে যাব। তোমাদের কাজের মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে আসতে হবে আগামী দিনের নেতৃত্বে। মানুষ তাহলে সাদরে গ্রহণ করবে।
বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, আমি চাই, একটা আদর্শ নিয়ে চল, দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাও। ২০৪১ পর্যন্ত তোমরাই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। সাধারণ ছাত্রদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, দেশে বিভিন্ন এলাকা থেকে ছাত্ররা লেখাপড়া করতে এখানে (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) আসে। তাদের সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।
এ সময় ছাত্রনেতাদের বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী, কারাগারের রোজনামচা, বঙ্গবন্ধুর সিক্রেট ডকুমেন্ট পড়ার পরামর্শ দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, এখান থেকে ভালো রাজনৈতিক শিক্ষা পাওয়া যায়। ছাত্রলীগের যাতে ভাবমূর্তি বাড়ে, সেভাবে কাজ করতে সংগঠনের নেতাদের নির্দেশনা দিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, নিজেদের ভাবমূর্তি বাড়াতে হবে, দেশের ভাবমূর্তি বাড়াতে হবে। মানুষের বিশ্বাস নষ্ট হয়ে যায়Ñ এ রকম কোনো কাজে যুক্ত থাকা যাবে না। মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসের মূল্য দিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপির ছাত্র সংগঠন ২০০১-এর পরে ক্ষমতায় এসে যা করেছে, বা এরও আগে যা করেছে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের সেই রকম আচরণ করা যাবে না। তিনি বলেন, সত্যিকারের নীতি আদর্শের রাজনীতি করলে সংগঠন একটা ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে। তাহলে মানুষের আস্থা বিশ্বাস ছাত্রলীগের ওপর অনেক বাড়বে। এটা না করে যদি তাদের (বিএনপি) আচরণ করা হয়, তাহলে আমাদের অবস্থাও তাদের মতো হবে। ছাত্রলীগের প্রতি যদি মানুষের আস্থা-বিশ্বাস না থাকে, তাহলে বিএনপি-ছাত্রদল যা করে গেছে সেই একই ধরনের কাজ হবে।
কোনো কাজই যেন সরকারের সুনাম নষ্ট না করে সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষের আস্থা-বিশ্বাস অর্জনের চেষ্টা করতে হবে। ক্ষমতায় গেলে সাধারণ মানুষ বিরক্ত হলে কষ্টার্জিত সফলতা, সরকার পরিচালনার সুনাম নষ্ট হবে। সাধারণ মানুষ বিরক্ত হয় এমন কোনো কাজও করা যাবে না। এ সময় তিনি ছাত্রলীগের সোনালি অতীতের কথা তুলে ধরে সেখান থেকে শিক্ষা নেওয়ার কথা বলেন নেতাদের।
সরকার পরিচালনা করতে গিয়ে নিজের শ্রমের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি খেটে দেশকে একটা পর্যায়ে নিয়ে এসেছি। এখনো ষড়যন্ত্র অব্যাহত রয়েছে। যারা বলেছিল এদেশ বটমলেস বাস্কেট হবে (আমেরিকার প্রতি ইঙ্গিত করে); পাকিস্তান বলেছিল বাংলাদেশ হবে বোঝা, গরিব-দুঃখী জাতি। আজকে তাদের ওখানে আলোচনা হচ্ছে বাংলাদেশ এমন হলো কেমনে, বাংলাদেশের এই সফলতা। আজকে তারাই স্বীকার করে বাংলাদেশ অর্জন করেছে, বাংলাদেশ রোল মডেল।
