জীবনের পাশে দাঁড়ান

আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০১:০৩ এএম

পকেটের পয়সা খরচ করে রক্তের গ্রুপ নির্ণয় ও রক্ত দান করে আসেন। রক্তের বিনিময়ে গাছ লাগানোর শর্ত দেন উপকারভোগীকে। এরপর গাছের গায়ের পেরেক তুলে ফেলবেন আহ্বান ফাউন্ডেশনের বন্ধুরা। স্বপ্ন ছড়ানো ও বিলানো এই তরুণদের নিয়ে লিখেছেন জাওয়াদুল আলম

ওয়াহেদুজ্জামান তুহিন তখন দশম শ্রেণিতে পড়েন, ২০১২ সাল। হঠাৎ তার বাবা আবদুল বারী হৃদরোগে আক্রান্ত হলেন। তাকে বাঁচাতে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে গেলেন। চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানালেন, আপনার বাবাকে বাঁচাতে জরুরি ভিত্তিতে অপারেশন করতে হবে। সে জন্য আট ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন। এত ছোট একটি ছেলের পক্ষে বাবার জন্য অত ব্যাগ রক্ত জোগাড় করা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। তারপরও মা শাহীনা বেগমের সঙ্গে নানা জায়গায় গিয়েছেন তিনি, মাকে সাহায্য করেছেন। নিজে যে রক্ত দিয়ে সাহায্য করবেন, সেই বয়সও তার হয়নি। দেখেছেন, স্বামীকে বাঁচাতে মায়ের ভীষণ কষ্ট, কান্না আর চেষ্টা। ফলে সেই বয়সেই সিদ্ধান্ত নিলেন, বড় হয়ে চিকিৎসক বা প্রকৌশলী হবেন না। মানুষের পাশে দাঁড়াবেন। রক্ত দান ও সংগ্রহে তাদের উদ্বুদ্ধ করে হাজার জীবন বাঁচাবেন।

তিনি ডেফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ডিআইইউ) ’র ছাত্র। ফার্মেসি বিভাগের পড়েন। লেখাপড়ায় ভালো, সামাজিক কাজেও আছেন। রক্ত দিয়েছেন যেকোনো জরুরি প্রয়োজনে। স্নাতক চতুর্থ বর্ষে পড়ার সময় থেকে নিজেই বন্ধুদের নিয়ে গড়ে তুলেছেন তাদের কাজের ক্ষেত্র। সেই স্বপ্নটি যখন দেখেছেন, কাছের তিন বন্ধু ও একই বিভাগের সঙ্গী–আহসানুল মাহবুব জুবায়ের, আশরাফুল ইসলাম এবং রাজেক মাহমুদকে ইচ্ছেটি খুলে বললেন। তারাও সব ধরনের সাহায্য করবেন, পাশে থাকবেন এবং কাজ করবেন বলে জানালেন। ফলে ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে সব কাজ গুছিয়ে শুরু হলো ‘আহ্বান ফাউন্ডেশন’। পরের মাসেই নিজেদের ক্যাম্পাসে কাজে নেমে পড়লেন তারা। ডিআইইউ’র ঢাকার ধানমন্ডি ক্যাম্পাসে সারা দিন ধরে বিভিন্ন বিভাগের ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করে তাদের কার্ড দিয়ে গ্রুপ জানিয়ে দেওয়া হলো। সবটুকু কাজই তারা একটি পয়সাও না নিয়ে করেছিলেন। সেদিনই তাদের উদ্যোগে আগ্রহী হয়ে কাজ করতে শুরু করেছেন ফার্মেসিরই মৃন্ময় আহমেদ, রাকিব আহসান এবং আইনের ফেরদৌস আহমেদ। তারা ছয়জন মিলেই কাজগুলো করেছেন। ফার্মেসিতে কীভাবে রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করতে হয় তাদের শেখানো হয়। বই পড়া, হাতে শেখা বিদ্যা কাজে লাগিয়ে তারাও খুশি। সেদিন তাদের কাজে বিশেষভাবে সাহায্য করেছেন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এ কে আজাদ, সিনিয়র লেকচারার (জ্যেষ্ঠ প্রভাষক) সাবরিনা চৌধুরী এবং লেকচারার বা প্রভাষক ফাইরুজ ফাহিম। তারা বিভাগের গবেষণাগার থেকে সব ধরনের উপকরণ সরবরাহ, ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছেন। কাজের সময় নিজেরা থেকে তদারকি করেছেন, উৎসাহ জুগিয়েছেন। এখনো গর্বের সঙ্গে তুহিন বলেন, ‘সারা দিনে আমরা শ’খানেকের বেশি ছাত্রছাত্রীর রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করতে পেরেছি।’ সেদিনের সেই অমূল্য কাজের সব ছবি তিনি নিজের ফেইসবুক পেইজে আপলেড করেছেন। তারপর অনেক লাইক, কমেন্ট স্বাভাবিকভাবেই পেয়েছেন। ক্যাম্পাসে অনেকে তাদের চিনে ফেলেছেন, যেকোনো কাজে সাহায্য করবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন। যারাই তাদের এরপর কয়েকদিন দেখেছেন, বলেছেন যেকোনো সহযোগিতায় আছেন। এভাবে দুই মাধ্যমেই অনেক শুভার্থীকে পেলেন, কাজের জন্য আগ্রহী কর্মীর সংখ্যাও বাড়ল। আহ্বানের কর্মী, বন্ধু হতে যোগাযোগ হলো অনেকের সঙ্গে। কিছুদিনের মধ্যে পঞ্চাশের বেশি হয়ে গেলেন তারা। এবার কাজে নামতে আর দেরি করলেন না তুহিন ও তার দল। তারা এই স্বেচ্ছাসেবী তরুণের সংগঠনকে গুছিয়ে তুলতে লাগলেন। মাসে ১শ টাকা সদস্যদের চাঁদা হিসেবে ফি আলোচনার পর সবাই মিলে ধার্য করলেন। সেই টাকা তারা সংগঠনের নানা কাজে ব্যয় করবেন বলে ঠিক করলেন। নিজেদের কোনো প্রয়োজনে এই খরচ কাজে লাগানো হবে না শপথ নিলেন। সিদ্ধান্ত দিলেন– কেবল ছাত্রছাত্রীদেরই তারা আহ্বানে আনবেন। তাকে অবশ্যই সুস্থ, স্বাভাবিক মানুষ হতে হবে এবং নিয়মিত রক্ত দান করতে হবে। তাছাড়াও দেশের, মানুষের প্রয়োজনে যেকোনো ধরনের সামাজিক কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ার মানসিকতা এবং প্রচেষ্টা থাকতে হবে। ঢাকার ধানমণ্ডি লেকে পুরো দিন সব সদস্যের রক্ত পরীক্ষা করে, তাদের তালিকা তৈরি করে, সেগুলো কার্ড বানিয়ে দিয়ে কাজে নামল একটি নতুন স্বপ্ন। কিছুদিন পর জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় তারা বেড়াতে আসা মানুষদের অনুরোধ করে বিনামূল্যে রক্ত পরীক্ষা করে দিলেন। তাদের রক্ত দানের জন্য উৎসাহী করলেন। আমাদের কেন রক্ত প্রয়োজন আর জীবন কীভাবে তা বাঁচায় ভালোভাবে, বিনয়ের সঙ্গে জানালেন। নিজেরা রক্ত পরীক্ষার সব উপকরণ, লিফলেট, ব্যানার সংগঠনের টাকায় কিনে ফেললেন। আহ্বান ফাউন্ডেশন গর্বের সঙ্গে বলতে ভুলল না–গত নয় মাসের মধ্যে আমরা দুই হাজারের বেশি ছাত্রছাত্রী, পুরুষ, নারীর রক্তের গ্রুপ নিজেদের কষ্টে, সামাজিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে বিনা খরচে করে দিয়েছি। তাদের একজনও যদি কোনো মানুষের জীবন বাঁচাতে এগিয়ে আসেন তাহলেই আমাদের সাফল্য। সব পরিশ্রম সার্থক। তাদের সব কর্মীই এভাবে রক্তের খোঁজে, রক্তের প্রয়োজনে, রক্ত জানতে কাজ করছেন। তাদের পাবেন– https://www.facebook.com/Ahhoban– এই ঠিকানায়। সেখানেও রক্তের প্রয়োজনে আহ্বান করতে পারেন যে কেউ যেকোনো সময়। এখন তারা ডেঙ্গুর বিপক্ষে যুদ্ধ করছেন সমাজের উপকারের প্রতিজ্ঞায়। রক্ত দিয়ে চলেছেন, হাসপাতালগুলোতে তাদের সেবা করছেন অক্লান্ত পরিশ্রমে। 

আরও উদ্যোগ আছে সৃজনশীল এই তরুণ দলের–আহ্বানের যে বন্ধুই রক্তদান করুন না কেন, যে মানুষের, রোগীর পাশেই দাঁড়ান না কেন; তাদের সেবা পাওয়া সেই পরিবারটি বাংলাদেশের যেকোনো জায়গার মাটিতে দুটি গাছের চারা রোপণ করবেন। টাকা নয়, এভাবেই তারা রক্তের বিনিময়ে দেশের সেবা করছেন। অন্যতম সহ-প্রতিষ্ঠাতা ওয়াহেদুজ্জামান তুহিনের ভাষ্য, ‘আমরা পাশে কষ্টের সময়গুলোতে থাকি বলে ভালোবেসে বা উৎসাহে কোনো কোনো মানুষ, সংগঠন টাকা বা যাতায়াতের খরচ দিতে চান। তবে গরিবের পক্ষে তো দোয়া ছাড়া আর কোনোকিছু দেওয়ার নেই। তাদের সবাইকে এক কাতারে এনে, বাংলাদেশের প্রতি ভালোবাসা তাদের মধ্যে আরও ছড়াতে বৃক্ষ রোপণের এই অনুরোধ সবসময় আমরা সবাই করি। তাতে মানুষ যেমন অক্সিজেন নিয়ে জীবন বাঁচাবেন, তেমনি গাছের ফল, ছায়া সবাই ভোগ করতে পারবেন। প্রয়োজনে বিপদের সঙ্গী হবে গাছটি।’ 

মাস দুয়েক আগে রক্তের বিনিময়ে গাছের চারা রোপণের কর্মসূচি তারা শুরু করেছেন। সাভার, ধামরাই, ময়মনসিংহ–ঢাকা বিভাগের এই তিনটি স্থানে অন্তত ৪২টি গাছের চারা রোপণ করেছেন বলে গর্বের সঙ্গে জানানো হলো। অসহায়ের পাশে বিপদে দাঁড়াতে আছে তাদের বন্যার্তদের সহযোগিতা। গাইবান্ধায় যে বন্যা হয়েছে সর্বশেষ, সেখানে গিয়েছেন তারা ঢাকা থেকে ৩শ পরিবারের জন্য নিজেদের চাঁদায়; ক্যাম্পাসের বড় ভাই মহিউদ্দিন চিশতি, ওয়ালি উল্লাহ, নাঈম আহমেদের অর্থ ও প্রয়োজনীয় সাহায্যে নানা খাদ্য ও সাহায্য নিয়ে। সেই চাল, ডাল, চিঁড়া, মুড়ি, গুড়, বিস্কিট, পানি বিশুদ্ধের ট্যাবলেট এবং প্রাথমিক চিকিৎসার সব ওষুধ বিলিয়েছেন গ্রামে গ্রামে নৌকায় ঘুরে। এবারের রমজানে তারা ছিলেন এতিমের বন্ধু। ২৭ রোজায় ১শ গরিব ও এতিম শিশুকে দিয়েছেন ঈদের নতুন জামা। ছিন্নমূল, পথের মানুষ এমন ৫০টি পরিবারকে দিয়েছেন ঈদের দিন খাওয়ার জন্য নানা খাদ্য। তাতে ছিল সয়াবিন তেল, চাল, ডাল, আটা। তাদের সব আয়োজনের টাকা তারাই কষ্ট করে টিউশনি থেকে জমিয়ে, মা-বাবার কাছে চেয়ে জোগাড় করেন। বন্ধু ও ডিআইইউ’র সব ছাত্রছাত্রীদের অনবদ্য সহযোগিতা তো আছেই। 

তবে এসব কাজ করতে গিয়েও বাধা আসে। পরশ্রীকাতর ও অন্যের ভালো সহ্য করতে না পারা এবং কারও পাশে না দাঁড়িয়ে, নিজেকে নিয়ে থাকতে অভ্যস্ত বাঙালি তাদের খোঁটা, বাধা এবং কুৎসিত মন্তব্য করতে ছাড়ে না। হৃদয় এফোঁড়, ওফোঁড় করে দেয়। তুহিনের বাবাকেই তার বয়স্ক, অভিজ্ঞ কর্মজীবী সহকর্মীরা সুযোগ পেলেই বলেন, ছেলেকে ঢাকায় পড়তে পাঠিয়েছেন, কিন্তু সে তো ঘুরে ঘুরে বাজে কাজে সময় নষ্ট করছে। এ জন্যই তো আমাদের দেশের কোনো উন্নতি হয় না বলে আমি মনে করি। কারও কাছে কোনো দান চাইতে গেলে অনেক সময় তারা বলে বসেন, আপনারা তো টাকা মেরে দেবেন। তারপরও ভুঁইফোঁড় সংগঠনের ভিড়ে তারা আলো ছড়িয়ে যাবেন। মানুষের পাশে দাঁড়াতে কোনোদিন কার্পণ্য না করে খবর নিয়ে দান, সহযোগিতায় থাকাই ভালো–জানাল আহ্বান ফাউন্ডেশন। কারণ সমাজের ভালো তো ব্যক্তি, সংগঠন সবাই মিলেই করতে হয়। করা হয় এভাবেই সারা দুনিয়ার সবখানেই। তাদের ভালো কাজের সঙ্গ এখন অনেক, অনেক তরুণ তাদের পথে আছেন। ডিআইইউ তো বটেই, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ (ডব্লিউইউবি), গ্রিন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ (জিইউবি) ’তে তারা আছেন অনেক প্রাণ। 

ডব্লিউইউবি ও জিইউবিতে তারা এখন দেড়শ। ঢাকার বাইরের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও সুযোগ, সাহায্য পেলে ছড়িয়ে যাবেন। রক্ত দান, দুর্গত মানুষের সাহায্য করার কাজ করবেন। ঢাকাসহ সারা বাংলাদেশের সবগুলো পথের ধারের সড়কের গাছের বুক, শরীর থেকে পেরেক, কাঠ তুলে তাদের জীবনকে আরও সহজ, ভালো করে বাঁচাবেন আহ্বানের বন্ধুরা। আপনিও পাশে থাকুন। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত