বাবা নিজের সঙ্গে মিলিয়ে নাম রেখেছেন ‘মোহাম্মদ বেলাল ফকির’। সারা জীবন ফকিরের স্বভাব, খেয়ালেই থাকছেন ছেলে। ময়মনসিংহের দানবীর হাজি মোহাম্মদ বেলাল ফকির। তাকে নিয়ে লিখেছেন ও ছবি তুলেছেন শাহ মোহাম্মদ আলী আজগর
জন্ম ১৯৬৭ সালে, ভালুকার হবিরবাড়ি ইউনিয়নের কাশর গ্রামে। বাবা সুলতান ফকিরের সাত ছেলে, দুই মেয়ের প্রথম ছেলে সন্তান বেলাল। নাম বেলাল ফকির। ছোটবেলা থেকেই ফকিরি স্বভাব তার এই ছেলের। প্রাথমিকে পড়ার সময় থেকেই খেলা, গান ও গরিবের বন্ধু। কলেজে পড়তে পড়তে তাদের পাশে দাঁড়াবেন বলে কিছু করতে পড়ায় ইস্তফা দিলেন। তবে সাহায্য করতে পারেননি তখনো তেমন। তারপরও পাশে দাঁড়ানো থামাননি। ছোটবেলায় বাড়িতে সাহায্য চাইতে এলে মা-বাবার আড়ালে চাল, কী টাকা দিয়ে দিতেন; বাবার মার খেয়েছেন; স্বভাব বড়বেলায়ও বদলায়নি। এভাবেই কেটেছে ’৯৯ সাল পর্যন্ত। গরিবের পাশেও ছিলেন। আমাদের সবচেয়ে স্থায়ী ১৯৯৮ সালের বন্যায় মা সুফিয়া খাতুনের কাছ থেকে জমানো ৫০ হাজার টাকা চেয়ে নিয়ে চিড়া, মুড়ি, গুড়, স্যালাইন বিলিয়েছেন নিজের, পাশের শ্রীপুর ও সখীপুর উপজেলায়।
হাজার দিন দেখেছেন– বাড়ি থেকে ফেলে দেওয়া ভাতের মাড়, আটা চেয়ে খাবার জোটাচ্ছেন হাজারো মানুষ। সে বছর তাই তাদের জন্য করতে বাবার কাছ থেকে চেয়ে ২০ লাখ টাকা নিয়ে ব্যবসা শুরু করলেন। কাশর বাজারে আজও আছে ‘বেলাল এন্টারপ্রাইজ’। শুরুতেই তার ঠিকাদারি ব্যবসার কর্মচারী ১০ জন। আশপাশ ও ময়মনসিংহের শিল্প এলাকাগুলোর কারখানায় তারা ইট, বালু, বাঁশ ও কাঠ সরবরাহ করেন। শুরুতে বখাটে, সন্ত্রাসী, দারোয়ান, ম্যানেজারদের ২শ থেকে হাজার টাকাও ঘুষ দিয়ে কাজ আনতেন। ম্যানেজার, মালিকের দেখা, কাজ পেতে টানা ঘুরেছেন। সময়ে বিল না পেয়ে অনেক কষ্ট করেছেন। সুদে গাড়ি কিনতে ১০ লাখ টাকা দিয়ে ফেরত পাননি। তাতে ব্যবসায় অনেক লোকসান হয়েছে। বেলাল ধার করে পথে বসা ঠেকিয়েছেন। পরে এসব চাঁদাবাজি বন্ধ করেছেন। সততা, পরিশ্রম ও মেধা খাটান বলে তারা তিন বছর পর থেকে এখনো লাভে আছেন।
তার জীবনটি আরও বদলে গেছে ২০১১ সালে। হৃদরোগ নিয়েই আরও বেশিদিন মানুষের সেবা করার জন্য বাঁচতে তখন হজ করতে গেলেন। আল্লাহর ঘর (কাবা শরিফ) ছুঁয়ে কাঁদলেন, ‘হে আল্লাহ মানুষের সেবা করতে আপনি আমাকে সৎভাবে বাঁচার হায়াত দান করুন।’ শরীর ভালো হলো। তবে অসুখ সারল না। দুই বছর পর ভারতে গিয়ে চিকিৎসা করতে হলো। দুটো রিং পরতে হলো। মনের জোর বাড়াতে আরও কাজ শুরু করলেন।
তার জমি কেনা-বেচার ব্যবসাও আছে। তাদের ও আশপাশের এলাকায় শিল্পপতিরা কারখানা গড়ে তোলার জন্য বিরাট জমি কেনেন। দালালরা লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন। পরে তারা সৎ বেলাল ফকিরের দেখা পেলেন। দেশের উন্নয়নে তাদের কথায় রাজি হয়ে কাজে নামলেন। চমকে গেলেন, উপজেলা ভূমি অফিস দালালে ভর্তি। তারপরও জমির মালিক, ক্রেতার কাছে তিনি সবসময় সৎ থাকেন। ভালুকায় হাজি মকবুল হোসেন ও মোহাম্মদ শাহজাহান, শ্রীপুরে শফিউদ্দিন আহমেদকে ১শ, ৬০ ও ১শ বিঘা জমি কিনে দিয়েছেন। ভালো লাভ হয়েছে। তারা সন্তুষ্ট হয়ে কারখানার সব নির্মাণের কাজ দিয়েছেন। স্কয়ার, আরিফ কম্পোজিটের কাছে বাবার কাছে অন্যতম সন্তানের ভাগ হিসেবে পাওয়া জমি থেকে ৭০ বিঘা জমি লাভে বেচেছেন। বিরাট কেনা-বেচাগুলো তাকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। দালালের হাত থেকে ক্রেতাদের বাঁচাতে তিনি সবসময় নিজের টাকায় জমি কিনে নিজের নামে রেজিস্ট্রি বায়না করেন। সব দলিল ঠিক আছে জেনে দখল নিয়ে কোম্পানিকে সাফ কবলা রেজিস্ট্রি দলিল করে দেন। সব কষ্ট নিজে সামলান। তাতে এখন বিঘাপ্রতি দামে ২ টাকা হারে লাভ পান। টাকাগুলোর সব লাভের জন্য জমান না। ২০০২ সালে কোরবানির ঈদে ১ লাখ টাকার চাল, চিনি, সেমাই ৫শ অসহায়ের মাঝে বিলিয়েছেন। ২০০৮ সালের বন্যায় জামালপুরে বন্যার্তদের মাঝে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকার শুকনো খাবার কিনে বিলিয়েছেন। জীবনের শুরু থেকে এভাবে যেখানেই বন্যা হয় বেলাল ফকির গিয়ে সাহায্য করেন।
২০১৭ সালের মে দিবসে তাদের গ্রামে শিলাবৃষ্টিতে হাজার হাজার মানুষের বাড়ি, দোকান ভেঙে পড়েছে। তিনি মসজিদে থেকে বেঁচেছেন, মানুষের আহাজারি শুনেছেন। টানা ঝড় থামলে তাদের শিল্প ইউনিয়নের শ’খানেকেরও বেশি কারখানার মালিক ও ম্যানেজারদের কাছে সাহায্যের জন্য গিয়েছেন। প্রতিশ্রুতি দিয়েও কেউ রাখেননি। তিনি তাদের কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। রাতেই চিঁড়া, মুড়ি কিনে ট্রাকে পরদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত ছয়-সাত হাজার মানুষের মধ্যে বিলিয়েছেন। সব হারানো মানুষদের দেখে বাড়ি ফিরে কেঁদেছেন। পৈতৃক জমি বিক্রি করে সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ৫০ বছর বয়সের ছেলেকে তখন বাবা মেরেছেন পর্যন্ত। ভাই-বোন, স্ত্রী-সন্তানসহ সবাই বাধা দিয়েছেন। তবে তাকে ঠেকানো যায়নি। ১৭০ শতাংশ (২৫ কাঠা) জমি দুই কোটি ৪০ লাখ টাকায় বিক্রি করেছেন। ৪শ বান্ডিল ঢেউটিন কিনে তাদের ঘরের ব্যবস্থা করেছেন। তারা আরও সাহায্যের জন্য বাড়িতে চলে এলে ১০ মে আরও দুই বিঘা জমি বিক্রি করে ঘর তোলার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।
এ বছর টাঙ্গাইলের কালিহাতি, জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ, বকশিগঞ্জের বন্যার্তদের কাছে গিয়ে তিনি ১৬ টন চাল, ১শ কেজি মুড়ি ও ৪ কেজি চিঁড়া কিনে বিলিয়েছেন। অনেক মসজিদ গড়ে আরও ভালোভাবে তৈরি করে দিয়েছেন। সে সব বলতে চান না। তারপরও ভালুকার বড় কাশর জামে মসজিদ, ডুবালিয়া পাড়া জামে মসজিদ, শ্রীপুরের বাঁশবািড় জামে মসজিদ, জৈনা বাজার জামে মসজিদসহ চারশ’র বেশি মসজিদের পাশে থেকেছেন বলে জানালেন। ২০০৭ থেকে আজ পর্যন্ত যখন যা পারছেন, দান করছেন। কষ্ট শুনে সামলে থাকতে না পেরে এই বয়সে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কাছে গিয়েছেন। ট্রাক ভরে ১৫ টন চাল কিনে নিয়ে গিয়েছেন, নিজেও বিলিয়েছেন। তাদের অসহায় জীবন দেখে সঙ্গে সঙ্গে দুই লাখ টাকা ১ হাজার মানুষের মধ্যে সমান ভাগে নগদে বিলিয়েছেন।
ময়মনসিংহের হবিরবাড়ি, রাজৈর, ভালুকা, কাচিনা, ডাকাতিয়াসহ প্রায় সব ইউনিয়নে সেই ২০০৯ সাল থেকে শীতের সময় আছেন, এখনো তিনি থামেননি। কম্বল, শাল, জ্যাকেটও কিনে বিলিয়ে দেন। গত বছর সবচেয়ে শীতের জেলা পঞ্চগড়ে শীতের পোশাক বিলিয়েছেন।
পরিবেশ বাঁচাতেও বেলাল ফকির আছেন। ২০১০ সালে কর্মচারী, আত্মীয়, প্রতিবেশী ও অসহায়দের বাঁচাতে পাঁচশর বেশি আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, করই, আমলকী, হরিতকী, নিমসহ ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা বিলিয়েছেন। প্রতিটি গাছ বাড়ির উঠানের পাশে লাগাতে বলেছেন। এরপর থেকে প্রতি বছর তিনি ৫০ থেকে ৬০টি ফলদ, বনজ গাছ পথের ধারে রোপণ করেন। সেগুলো পুরো উপজেলায় ছায়া দেয়, পরিবেশ ও জলবায়ু বাঁচায়। সে বছর থেকে উপজেলা, আশপাশের স্কুল, কলেজ, মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা, রাস্তার পাশ, বাড়ির উঠান ও আঙিনাতে গাছ লাগানোর জন্য সবাইকে উৎসাহ দেন।
নিজের বাড়িতে আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, পেয়ারাসহ নানা ধরনের ফলসহ অন্য গাছের চারা লাগিয়েছেন, নিজের হাতে যত্ন করেছেন। এখনো গাছ রোপণ করেন, যত্ন করেন। তার ঠিকানা– ভালুকা উপজেলা সদরের ১৪ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে কাশর গ্রাম। পৈতৃক বাড়িটি এক একরের, চারদিকে ইটের দালানে ঘেরা।
প্রতি সকালে বেলাল ফকিরের ঘুম ভাঙে মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা, সন্তানের জীবন বা পড়ায় সাহায্য, চিকিৎসার খরচ চাইতে আসা মা, বাবার কান্নায়। তিনি, তার পরিবার কাউকে ফেরান না। যতটুকু পারেন করেন। তারা হাজারো মেয়েকে সংসার গড়ে দিয়েছেন। এমন হাজার অসহায় ছাত্রছাত্রীর লেখাপড়ার খরচ দিয়েছেন। রুস্তম আলী তার টাকায় মুদি দোকান করে ভালো আছেন। তার মেয়ের বিয়ের খরচও বেলাল ফকির দিয়েছেন। চিকিৎসার টাকা নিয়ে সুস্থ হয়েছেন এভাবে আরও অনেকে। যার কেউ নেই তার ফকির চাচা আছেন, সবাই জানেন।
যুবকদের মাদক থেকে বাঁচাতে, খেলার প্রতি আগ্রহী করতে ২০১৫ সালে কাশর হাইস্কুল মাঠে বেলাল ফকির প্রথম ক্রিকেট প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন। তাতে তাদের, শ্রীপুরের মোট ১৫টি দল ছিল। ব্যাট, বল, হেলমেট, ট্রফিসহ সব খরচ দুই লাখ টাকায় তিনি দিয়েছেন। সেই থেকে প্রতি বছর উপজেলার গ্রামে গ্রামে তিনি খেলার সামগ্রী কিনে বিলান। গেল বছর পাশের রাজৈর ইউনিয়নে জামিরাপাড়া এস এম উচ্চ বিদ্যালয়ে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আয়োজনের জন্য এক লাখ টাকা দিয়েছেন।
পুরো উপজেলার যেকোনো সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় আয়োজনে সাধ্যমতো করেন তিনি। হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধদেরও ফেরান না। এখন রাজনৈতিক দলগুলোকেও সাহায্য করতে হয়। উপজেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফাও স্বীকার করলেন, ‘বেলাল চাচা নানাভাবে নানা সময় সমাজের উন্নয়নে পাশে থাকেন, সাহায্য করেন।’ তবুও বেলাল ফকিরের দুঃখ ঘোচে না, ‘আমার কাছে ছেলে-মেয়েরা খেলার সামগ্রী থেকে যেকোনো কিছু আয়োজন, প্রয়োজনে সাহায্য চেয়ে খালি হাতে কেউ-ই ফেরে না। তারপরও তারা মাদক ছাড়তে পারছে না, জীবন ধ্বংসের পথে জড়িয়ে যাচ্ছে।’ হতাশ না হয়ে তিনি কাজ করে যাচ্ছেন। বাল্যবিয়ে ও মেয়েদের উত্ত্যক্ত যেন কেউ না করে, সে জন্য নিজের খরচে স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসাগুলোতে সেমিনার, আলোচনা সভার আয়োজন করে চলেছেন। জনসচেতনতা গড়ে তুলছেন। সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক, অভিভাবকসহ গণ্যমান্যদের রাখছেন। ছাত্রছাত্রীদের টিফিন, খাতা-কলম উপহার দিচ্ছেন। তাদের তিনি বলেন, ‘কারও প্রতি কোনো অন্যায় আচরণ করবেন না।’ গ্রামের ডুবালিয়া পাড়া থেকে কাশর বাজার; আইডিয়ালের মোড় থেকে কাশর বাজারের পাকা পথে ইট-সুরকি কিনে নিজের খরচে রাস্তা সংস্কার করে দিয়েছেন। উপজেলার শিক্ষিত, অল্প শিক্ষিত বেকার ছেলেমেয়েদের পরিচয়ের সূত্রে বিনা পয়সায় নানা শিল্প-কারখানায় বিভিন্ন পদে চাকরি দিচ্ছেন। হাজী মোহাম্মদ বেলাল ফকির বলেন, ‘তাদের সংখ্যা দুই থেকে তিন হাজার হবে। শ্রমিক থেকে ম্যানেজার হিসেবে তারা কাজ করছেন।’ তিনি নিজের বড় মেয়ে দিলরুবা খাতুনের বিয়ে দিয়েছেন। ছোট মেয়ে জিন্নাত আরা ঢাকার উত্তরার মাইলস্টোন কলেজের স্কুল শাখায় পড়েন। অন্য মেয়েরা– সুরাইয়া মিমি, জিন্নাতুন নেসা মৌ এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রী। মেয়েদের ও নিজেদের ভবিষ্যৎ না ভেবে জমি, আয় মানুষকে সাহায্য করতে দান করেন বলে বাসায় কথা উঠলেও তাকে থামানো যায় না। কর্মজীবনের শুরু থেকে আজও আয়ের অর্ধেক তিনি মানুষের ভালো জন্য খরচ করেন। বাকি আয়ের ২৫ ভাগ আত্মীয়দের প্রতিষ্ঠার জন্য দেন। বাকি টাকা কখনো তার কাছে থাকে, কখনো রাখতে পারেন না। কাশর বাজারে ১৪ শতাংশ জমি কিনেছেন দুর্যোগে আশ্রয়কেন্দ্র বানাবেন বলে। আশ্রয়কেন্দ্রের কাজ চলছে।
কোনো শত্রু নেই তার, সম্ভবও নয়। অনেকের হয়ে সে কথাই বললেন ময়মনসিংহ জেলা জাতীয় পার্টির যুগ্ম অর্থ সম্পাদক আবু জাফর সরকার। তার কাছে তিনি সবার চেয়ে ভালো মানুষ। তাকে মিথ্যা মামলায় জড়ানো হয়েছিল, মামলাটি হয়রানির জেনে তিনি মামলার খরচ দিয়েছেন। উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ মনে করেন, ‘বেলাল সাহেবের মতো সব বড়লোক মানুষের পাশে থাকলে অভাব, কষ্ট এই দেশ থেকে চলে যাবে।’
