তিস্তার সেচ ক্যানেল ও কৃষি

আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৩:৩২ এএম

এখন জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাতে উত্তরাঞ্চলসহ সারা দেশের প্রকৃতিতেই পরিবর্তন এসেছে। পরিবর্তন হয়েছে ঋতুচক্রেরও। একসময় বোরো মৌসুমের চাষাবাদে সেচ দিলেও আমন চাষাবাদ ছিল বৃষ্টিনির্ভর। অর্থাৎ আমন চাষাবাদে সেচের প্রয়োজন হতো না। এখন কিন্তু সে পরিস্থিতি আর নেই বললেই চলে। ফলে এখন আমন মৌসুমে খরাপীড়িত এলাকায় সেচের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

উত্তরাঞ্চলের খরাপীড়িত এলাকার আমন ধান আবাদে দেশের সর্ববৃহৎ তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্পের (জরিপ-২) মাধ্যমে কৃষকরা জমিতে সেচ সুবিধা পেতে শুরু করেছেন। এতে করে চলতি আমন মৌসুমে বৃষ্টির অভাব মোকাবিলায় এ প্রকল্পটি কৃষকদের আশীর্বাদে পরিণত হয়েছে। তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, প্রথমপর্যায়ে চালু থাকা ৭১০ দশমিক ৪৫ কিলোমিটার ক্যানেলজুড়ে সেচের পানিতে ভড়ে উঠেছে। এখন প্রতিদিন ৩৩ দশমিক ৬৭ কিলোমিটার প্রধান ক্যানেল, ৭৪ দশমিক ৪৩ কিলোমিটার মেজর সেকেন্ডারি সেচ ক্যানেল, ২১৪ দশমিক ৭০ কিলোমিটার সেকেন্ডারি ক্যানেল ও ৩৮৭ দশমিক ৬৫ কিলোমিটার টারশিয়ারি ক্যানেলে ১২ ঘণ্টা অন্তর অন্তর ৫ হাজার কিউসেক করে সেচ দেওয়া হচ্ছে। উজান থেকেও পানি আসছে। ব্যারাজ পয়েন্টে পানির উথালপাতাল ঢেউ। পানিতে যেমন ভরে উঠেছে নদী, তেমনি ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্পের সব সেচ ক্যানেলের পানিতে টইটম্বুর অবস্থা, যা দেখে কৃষকরা বেজায় খুশি।

রংপুর কৃষি অঞ্চল কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, রংপুর কৃষি অঞ্চলের ৫ জেলায় চলতি ২০১৮-১৯ মৌসুমে ৫ লাখ ৯৪ হাজার ৭১৭ হেক্টর জমিতে রোপা আমন ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে হাইব্রিড জাত ৩৭ হাজার ৬৬২ হেক্টর, উফশীজাত ৫ লাখ ২৬ হাজার ৮০৫ হেক্টর ও স্থানীয় জাত ২৯ হাজার ৭১৭ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ হচ্ছে। এর মধ্যে নীলফামারী জেলায় ১ লাখ ১২ হাজার ৩৫৮ হেক্টর, রংপুরে ১ লাখ ৬৪ হাজার ১৫৯ হেক্টর, লালমনিরহাটে ৮৪ হাজার ৮৪৫ হেক্টর, কুড়িগ্রাম জেলায় ১ লাখ ১৫ হাজার ২৭৩ হেক্টর ও গাইবান্ধায় ১ লাখ ১৭ হাজার ৫৪৯ হেক্টরে চাষাবাদ হচ্ছে। বৃষ্টির পানি কাক্সিক্ষত পর্যায়ে না পাওয়ায় যারা আগাম ব্রি-৩৩, বিনা-৭-সহ স্বল্পমেয়াদি রোপা আমন ধান আবাদ করেছে, তাদের সেচের সুবিধা নিতে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।

তবে, সেচ ক্যানেল সংস্কারের বরাদ্দ পাওয়ার পরও সংস্কারের কাজ শেষ করতে না পারায় সৈয়দপুর ও দিনাজপুরের খানসামা, চিরির বন্দর ও পার্বতীপুর উপজেলা এই সেচ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এসব এলাকার সাধারণ কৃষকরা সেচের জন্য সৈয়দপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডে ধরনা দিয়েও সুফল পাচ্ছেন না। তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পের আওতায় কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার কৃষকের সেচ সুবিধার আওতায় আনা জরুরি। অবশ্য এরই মধ্যে কুড়িগ্রাম জেলার তিস্তার সঙ্গে যুক্ত বুড়ি তিস্তার ক্যানেল সংস্কারকাজ করা হয়েছে।

বুড়ি তিস্তাকেও তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পের মতো দুই পাড় টানাভাবে বাঁধের মতো করা উচিত। তাহলে বুড়ি তিস্তার দুই পাড়ে গাছ রোপণ করে সৌন্দর্যবর্ধন করাও যাবে। তা না হলে এখন বুড়ি তিস্তার সংস্কারের মাটি এলোমেলো করে যেভাবে রাখা হয়েছে, তা বৃষ্টি-বাদলে আবার নদীতে নেমে যাবে এবং প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। অথচ তিস্তা ব্যারাজ এলাকার মতো ক্যানেলের পাড় দিয়ে বিচিত্র প্রজাতির গাছ লাগানো গেলে একদিকে নয়নাভিরাম সৌন্দর্য হবে, অন্যদিকে গাছ বড় হলে অর্থনীতিতেও অবদান রাখতে পারবে। যেমন শীত মৌসুমে তিস্তা ব্যারাজে পিকনিক পার্টির জায়গা দেওয়া সম্ভব হয় না। বুড়ি তিস্তা কুড়িগ্রাম হয়ে উলিপুরের ভেতর দিয়ে চিলমারী উপজেলার ব্রহ্মপুত্রে গিয়ে মিলিত হয়েছে। দীর্ঘ এই নদীর দুই পাড়ে প্রচুর পরিমাণ গাছ লাগানো সম্ভব। এতে পরিবেশের ভারসাম্যও রক্ষা পাবে এবং সেসব দর্শনীয় স্থানে পরিণত হবে।

উল্লেখ্য, উত্তরাঞ্চলের ১৬টি জেলায় কমবেশি সেচভিত্তিক চাষাবাদ বৃদ্ধি পাওয়ায় ধানসহ সবজি উৎপাদন যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি মাত্রাতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করায় পানির স্তরও হু-হু করে নেমে যাচ্ছে। এ কারণে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার পর্যায়ক্রমে কমিয়ে আনাও জরুরি। আবার চাষিদের জন্য পানির সেচেরও কোনো বিকল্প নেই। সংগত কারণে ভূ-উপরিস্থ পানি যেমন বৃষ্টির পানি, বন্যার পানি ছোট-বড় খাল ও ক্যানেলগুলোকে সংস্কার করে ধরে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। এসব পানি লো-লিপ পাম্প দিয়ে চাষের জমিতে সেচ দিলে ভূ-গর্ভস্থ পানির ওপর চাপ অনেকাংশেই কমে আসবে। এমনিতেই উজানের পানি একতরফাভাবে আটকে দেওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা ব্যারাজ এলাকার পানির প্রবাহ কমে আসে। তখন বোরোর ভরা মৌসুম থাকে। এ সময় তিস্তা ব্যারাজ এলাকার ক্যানেলগুলোর এখনকার মতো পানি থাকে না। ফলে সেচকাজ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়।

পরিসংখ্যান বলছে, গত শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার পানির প্রবাহ ছিল গড়ে দুই হাজার কিউসেক। অথচ চলতি বছরের জুন মাসের শেষের দিকে তিস্তা নদীতে পানির প্রবাহ দাঁড়িয়ে ছিল ৯০ হাজার কিউসেক। তবে সাম্প্রতিক সময়ে উজানের পানির ঢলে তিস্তার পানি প্রবাহ চলছে গড়ে ২৫ হাজার কিউসেকে। ফলে নদীর এখন ভরা যৌবন। নদী চলছে দুর্বার গতিতে। যেহেতু ভারতে বন্যার কারণে পানির প্রবাহ বেশি, সেহেতু পানি আর এখন আটকে রাখা হচ্ছে না। ফলে তিস্তা ব্যারাজ এখন পানিতে টইটম্বুর। অবশ্য সামনে শুষ্ক মৌসুম। আর শুষ্ক মৌসুম এলে আবাদের পানির কষ্টেরও শেষ থাকে না। বর্তমানে যেখানে ২৫ হাজার কিউসেক পানি প্রবাহিত হচ্ছে, শুষ্ক মৌসুম এলে যা দুই হাজার কিউসেক এসে হয়তো দাঁড়াবে।

এ জন্য বাংলাদেশের তিস্তাসহ ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যার দাবি দীর্ঘদিন ধরে চলে এলেও আশ্বাস ব্যতীত আমাদের ভাগ্যে কিছু জোটে না। অতিসম্প্রতি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শংকর বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেনের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়েছে। আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, দ্বিপক্ষীয় আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে। শুধু তিস্তা নয়, ৫৪টি নদীর অভিন্ন পানিবণ্টনের বিষয়ে একটি ফর্মুলা বের করতে বাংলাদেশ-ভারত রাজি হয়েছে। এ প্রসঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শংকর বলেন, তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে ভারত সরকারের যে প্রতিশ্রুতি আছে, তার কোনো পরিবর্তন হয়নি।

আগামী অক্টোবর মাসে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভারত সফরে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর অনেকাংশেই নিশ্চিত থাকবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দীর্ঘদিন আটকে থাকা তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি সম্পাদনে ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে রাজি করাতে সাধ্যমতো চেষ্টা চালাবেন, এটা এ দেশের আপামর জনগোষ্ঠীর প্রত্যাশা।

লেখক : সাবেক ছাত্রনেতা ও কৃষিবিষয়ক কলামনিস্ট

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত