বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ ও অর্থ ব্যয়ের বিকল্প ভাবনা

আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৩:৩৩ এএম

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বুভুক্ষু দশায় আছে। বহু হাজার কোটি টাকা খরচা করলেও টাকার অভাবে কত কিছু যে হয় না এ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। নতুন নতুন দালান আর কোঠা দেখলে তাই মনটা খচখচ করে, অন্য কিছু কাজ কি হতে পারত না অগ্রাধিকার ভিত্তিতে? কদিন ধরে অবশ্য ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ কী’ তা নিয়েও কথা হচ্ছে। কথা হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ ব্যয়’ নিয়েও।

যেমন- জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে এখন আলোচনা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ওই অর্থের কিয়দংশ খরচের একটা সম্ভাব্য খাত দেখানো যাক, যা হয়তো জাতীয় জীবনে সবচেয়ে গূঢ় পরিবর্তনটা আনতে সক্ষম হতে পারে।

প্রথম কাজটা তো হওয়া দরকার অনুবাদ। ৩৫টি বিভাগ আছে জাহাঙ্গীরনগরে, হয়তো হাজারখানেক বই বাংলা অনুবাদ হলে তাদের চাহিদা মেটে। গড়ে যদি প্রতিটি বই অনুবাদে ২ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়, ১ হাজারটি বই হলে খরচ হয় মাত্র ২০ কোটি টাকা; যদি বইয়ের সংখ্যা ২ হাজার করা যায়, খরচ হবে ৪০ কোটি টাকা। সত্যি বলতে কি, শুরুতে ২ হাজার বইয়ের তালিকা করাটা বেশ কঠিন কাজ হবে। কিন্তু মিলবে প্রচুর জার্নাল, পত্রিকা। সেগুলো অনুবাদ করাটাও জরুরি কাজ। ফলে ধরে নিই বই আর জার্নাল মিলে ৪০ কোটি টাকারই প্রয়োজন পড়বে।

এই অনুবাদগুলোর মান কেমন হবে? শুরুতে নিশ্চয়ই ভালো হবে না। তাই চাই সম্পাদক। প্রতিটি মূল লেখার সঙ্গে অনুবাদকে মিলিয়ে পাঠ করতে গিয়ে যে বিপুল শ্রমটা তাদের দিতে হবে, তার জন্য তারাও পাবেন শব্দপ্রতি ওই পাঁচ টাকা। তাহলে আরও ৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ করতে হবে তাদের জন্য। পরিমাণটা দাঁড়াল ৮০ কোটি টাকা!

বিদেশি ভাষা থেকে বাংলায় ভাবটা আনার কাজটা খুব সহজ নয়। তার জন্য চাই একটা স্থায়ী পর্ষদ। তারা সপ্তাহে অন্তত একটা সভা করবেন এবং প্রতিটি সভা থেকে তারা একটা সম্মানীও পাবেন। কিন্তু এই সভাগুলোতে যারা আসবেন, তাদের মধ্যে বিশেষভাবে থাকবেন বাংলা, ইংরেজি, আরবি, সংস্কৃত, ফারসি, পালি, জার্মান, স্প্যানিশ, চীনা, জাপানি, কোরীয়সহ নানান ভাষার বিশেষজ্ঞ; থাকবেন বিজ্ঞান-ইতিহাস-দর্শন-প্রকৃতিবিদ্যাসহ নানান ভাষায় ব্যুৎপত্তি আছে এমন নাগরিকরা। এই পরিষদ স্থায়ীভাবে গঠন করা হবে, তার নিয়মিত দপ্তর থাকবে। তারা তর্ক-বিতর্ক শেষে অনুবাদকর্মগুলো তৈরি করতে যে ভাষাতাত্ত্বিক সংকটের মুখোমুখি হতে হয়েছে, তার সমাধা করবেন। হয়তো এই পর্ষদের ২০ জন স্থায়ী সদস্য থাকবেন, প্রয়োজনে তারা নির্দিষ্ট বিষয়ের অন্য কোনো পারদর্শী বা বিশেষজ্ঞকে আহ্বান করবেন। ২০ জন বিশেষজ্ঞ বছরে ৫০টি সভা করে প্রতিবার ৫ হাজার খরচ করলে এর পরিমাণ দাঁড়াবে বছরে আরও ৫ কোটি টাকা। ধরে নিই এই পরিষদকে আগামী ২০ বছর একটানা কাজ করতে হবে। আমলাদের পদপ্রান্তে বছরে একবার তাদের হাজির না করে একবারে টাকাটা ছাড় দিলে ১০০ কোটি টাকা তাদের জন্য বরাদ্দ করে দেওয়াই যায়। তারা নাহয় কোনো ব্যাংকে টাকা স্থায়ী জমা রেখে তার সুদেই মাসিক খরচের বড় অংশটা তুলে নেবেন।

এভাবে আমরা হিসাব পেলাম ১৮০ কোটি টাকার। ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা যে এখনো দিল্লি দূর অস্ত!

না, এই যে বইগুলো অনুবাদ করছেন, সেগুলো প্রকাশ করবেন না? ২ হাজার বই যদি প্রকাশিত হয়, প্রতিটি বইয়ে যদি গড়ে ২ লাখ টাকা করে প্রকাশনা ব্যয় করা হয়, ২০০০ গুণ ২,০০,০০০ মানে ৪০,০০,০০,০০০ কোটি টাকা হয়তো সামনের ২০ বছরে ব্যয় করতে পারবেন ওই ২ হাজার বইয়ের সমতুল্য গ্রন্থ ও জার্নাল প্রকাশে। কথায়, মাত্র ৪০ কোটি টাকা।

অনুবাদ, সম্পাদনা ও প্রকাশনা মিলিয়ে মোট দাঁড়াল ২২০ কোটি টাকা।

আর লাগবে একটা স্থায়ী অনুবাদ সংস্থা। যার একটা নিয়মিত কার্যালয় থাকবে, যারা অনুবাদের বিষয়ভিত্তিক অগ্রাধিকার বাছাই করবেন। আগ্রহী অনুবাদকরা তার মধ্য থেকে নিজেদের পছন্দমতো বিষয়গুলো খুঁজে নেবেন। এখানে বসেই কাজ করবেন অনুবাদক ও সম্পাদকরা। এখানেই বসবে পর্ষদের সভাও। এর দাপ্তরিক খরচ বছরে ১ কোটি টাকা ধরে ২০ বছরে যাবে ২০ কোটি টাকা। আবারও আমলাদের পায়ে-পায়ে শিক্ষকদের ঘোরাঘুরি বন্ধ করে এককালীন তা ছাড় দেওয়া যেতে পারে।

কথা উঠতে পারে, এ কাজের জন্য তো বাংলা একাডেমিই আছে। বিশ্ববিদ্যালয় কেন? সত্যি, আছে বটে বাংলা একাডেমি। কিন্তু এই কাজের জন্য আসলে এক কিংবা একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ই দরকার। কারণটা খুব স্পষ্ট। বিশ্ববিদ্যালয়ই হলো সেই স্থান যেখানে বহু বিদ্যার সম্মিলন ঘটে। ধরুন প্রাচীন একটা লাতিন কিতাব, যেটার বিষয় আরব আলকেমি। তখন কী ঘটবে? আপনার এমন একাধিক মানুষের সম্মিলন প্রয়োজন পড়বে, যাদের একজন লাতিন ও বাংলা উভয় ভাষা জানেন, একজন আরবির ব্যুৎপত্তি সম্পন্ন বিশেষজ্ঞের সহায়তা লাগবে, আর লাগবে একজন রসায়নবিদের।

এমনিভাবে ইতিহাস, অর্থনীতি ইত্যাদি মানবিক বিদ্যার জন্য যেমন, বিজ্ঞানেরও যদি সত্যিকারের বিস্তার চাই, তার জন্য গবেষণা চাই, তাহলে তার জন্য বিজ্ঞানে, প্রকৌশলে যা কিছু ঘটছে, তার যথাযথ অনুবাদ দ্রুতই চাই মাতৃভাষায়। কম পানিতে ধানের আবাদ নিয়ে যে গবেষণাটা হয়তো এই মুহূর্তে একজন জাপানি শিক্ষার্থী করছেন লন্ডনে বসে, তার সংবাদ দেশবাসীকে না জানালে নতুনরা শিখবে কীভাবে?

চিনুয়া আচেবে তার ‘থিংস ফল অ্যাপার্ট’ উপন্যাসটি কোনো আফ্রিকান ভাষায় অনুবাদের অনুমতি দেননি; তার বিশ্বাস ছিল ইংরেজি বা ফরাসির মতো ‘অগ্রসর’ ভাষাকেই হতে হবে আফ্রিকায় যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। ১৯৮১ সালে তিনি জাপান গিয়ে রীতিমতো ধাক্কা খেলেন, সেখানকার সবাই দিব্যি জাপানি ভাষায় দর্শন, পদার্থবিজ্ঞান কিংবা আর সব উচ্চতর বিদ্যাচর্চা করছে। তার প্রশ্নের উত্তরে ওয়াজেদা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক কিনিচিরো তোবা বললেন, কীভাবে বিষয়টা সম্ভব হলো : ‘আমার দাদা টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮৮০ দশকের শুরুর দিককার স্নাতক। তার খেরোখাতা ভর্তি ছিল ইংরেজিতে। আমার পিতা একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯২০-এর দশকের স্নাতক, আর তার খেরোখাতার আধাআধি ছিল ইংরেজিতে, বাকি আধখানা জাপানি ভাষায়। এক প্রজন্ম পর আমি যখন স্নাতক হই, আমার সবটা টোকাটুকি হয়েছিল জাপানি ভাষায়। এভাবে আমাদের নিজেদের ভাষার মাধ্যমে পশ্চিমা সভ্যতাকে পুরোটা আত্মস্থ করতে লেগেছিল তিনটি প্রজন্ম।’

আসলে এই সারসংকলনটুকুর মধ্যেই আছে সভ্যতার শুরু থেকে আজ পর্যন্ত কীভাবে নতুন নতুন ভাষায় জ্ঞান ছড়িয়ে পড়ে তার মর্মবস্তুটুকু। শর্ত একটাই, নতুন ভাষায় যারা কথা বলেন, উচ্চতর জ্ঞানে তাদের আগ্রহ আর প্রয়োজন থাকতে হবে।

তো, বিশ্ববিদ্যালয় এভাবেই বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে ওঠে। সনদ দেওয়া তার কাজ না, তার কাজ বিশ্ববিদ্যালয় স্থানীয়করণ, আর নিজেকে চিনে উঠতে নিজের জনগোষ্ঠীকে সাহায্য করা, আর তৃতীয়ত, তার জন্য প্রয়োজনীয় সব কারিগরি ও বৈজ্ঞানিক জ্ঞান উৎপাদন ও বিস্তার।

২. তাহলে অনুবাদ, সম্পাদনা, প্রকাশনা ও দপ্তরের খরচ মিলিয়ে মোট দাঁড়াল ২৪০ কোটি টাকা। এখনো প্রায় বাকি ১ হাজার ১৬০ কোটি টাকা।

এই টাকা খরচা করাও সোজা কিন্তু জরুরি। ৩৫টি বিভাগ আছে জাহাঙ্গীরনগরে। সেরা শিক্ষার্থীদের গবেষণায় ধরে রাখতে চাই গবেষকের সুযোগ-সুবিধা। প্রতিবছর ৩৫টি বিভাগে ৫ জন পিএইচডি ও এমফিল গবেষককে মাসে ৩০ হাজার টাকা করে বেতন দেওয়া হোক। বাংলাদেশে অধ্যাপকরা খাতা দেখা, প্রশ্ন করা নিয়ে যে পরিমাণ নাকাল থাকেন, তা অন্তহীন। তারা গবেষণা এবং অধ্যাপকের সহযোগী হিসেবে বিভাগে কাজ করবেন, সারা দুনিয়ায় যেমনটা থাকে। এতে করে অধ্যাপকরাও গবেষণা ও অধ্যাপনায় অনেক বেশি মনোযোগ দিতে পারবেন।

খুব চোখে লাগছে? ৩০ হাজার টাকা করে মাসে দেওয়া হবে এই ইঁচড়েপাকা গবেষকদের? অনেক বেশি হয়ে যায় না? মোট খরচটা কত বলুন তো? এই ৩৫টি বিভাগে ৫ জন করে ১৭৫ জন শিক্ষার্থীকে ৩০ হাজার টাকা করে দেওয়া হলে এক বছরে মোট খরচ হয় ৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা। গড়ে চার বছরে একজন তার পিএইচডি সমাপ্ত করবেন, ফলে সর্বদাই চারশোর মতো ছাত্র গবেষণায় যুক্ত থাকবে। সে হিসাবে বছরে ৪০০ জনের জন্য খরচ হবে ১৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা। আর এভাবে ২০ বছরে মোট খরচ হবে ২৮৮ কোটি টাকা।

এই বিপুল গবেষণা এবং অনুবাদযজ্ঞ জাহাঙ্গীরনগরকে এনে ফেলতে পারবে এশিয়ার একদম প্রথম এক শ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে। চিনুয়া আচেবে তার লেখায় যেমন টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়কে অমর করেছেন, তেমনি হয়তো গোটা জাতি কৃতজ্ঞ থাকবে জাহাঙ্গীরনগর কিংবা এমন যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে।

মাত্র দুটো প্রকল্প হাজির করা গেল আপাতত। অনুবাদে (২৪০ কোটি) আর গবেষণায় (২৮৮ কোটি)। তাতে মোট খরচ হচ্ছে ৫২৮ কোটি টাকা। ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা থেকে এখনো কিন্তু প্রায় ৮৭২ কোটি টাকার হিসাবে বাকি থাকল। সেই টাকা নিয়ে কী করা যেতে পারে? সেই নিয়ে, কিংবা এই পুরো ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা নিয়েই আসলেই কী করা যেতে পারে, সে বিষয়ে তো জাহাঙ্গীরনগরে যারা পড়াচ্ছেন, যারা পড়ছেন, তাদের কথাও শোনা দরকার। দরকার দেশবাসীরও কথা শোনা।

তো, একটা ভাবনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা যেতে পারে না, যেখানে এই অর্থ কীভাবে ইতিবাচকভাবেই খরচ হতে পারে সমাজ-বিজ্ঞান-শিল্প-সংস্কৃতি-পরিবেশ ইত্যাদি রক্ষায়? আমারই যেমন একটা তৃতীয় প্রকল্পের কথা মাথায় এসেছে, কিছুদিন আগেও আমরা দেখলাম দেশে একটাও আন্তর্জাতিক সনদপ্রাপ্ত খাদ্য পরীক্ষাগার নেই। অধ্যাপক আ ব ম ফারুককে কতভাবেই না হেনস্তা করা হলো। হয়তো ওই ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ পেলে তেমন একটা স্বাধীন গবেষণাগারও দেশে স্থাপিত হয়ে যেতে পারে। কিন্তু শিক্ষার্থীরাও ভাবুক, তারাই তো নেতৃত্ব দেবেন দেশটার।লেখক

রাজনৈতিক সংগঠক ও প্রাবন্ধিক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত