রোহিঙ্গাদের হাতে এনআইডি

ইসির কর্মকর্তাদের জালিয়াতি অনুসন্ধান করবে দুদক

আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১২:৫৮ এএম

মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা নাগরিকদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তি ও জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) দেওয়ার বিষয়টি অনুসন্ধান করবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) । গতকাল সোমবার কমিশনের বৈঠকে বিষয়টি অনুমোদন দেওয়া হয় বলে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রণব কুমার ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, আজ (মঙ্গলবার) অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিয়োগ হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে রোহিঙ্গাদের ভোটার

তালিকায় অন্তর্ভুক্তি ও এনআইডি দেওয়ার বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের অনুসন্ধান করা হবে।

দুদকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, জালিয়াতি, প্রতারণা ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে ইসির কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী রোহিঙ্গাদের এনআইডি দিয়ে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন বলে প্রাথমিকভাবে প্রমাণ পাওয়া গেছে। তারা বর্তমানে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পাবনায় কর্মরত। তাদের মধ্যে আছেন চট্টগ্রাম জেলার সিনিয়র নির্বাচন কর্মকর্তা মো. মুনীর হোসাইন খান ও চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানার সাবেক নির্বাচন কর্মকর্তা আবদুল লতিফ শেখ (বর্তমানে পাবনার জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা)। এ ছাড়া রয়েছেন ঢাকায় এনআইডি প্রজেক্টের টেকনিক্যাল এক্সপার্ট সাগর, একই শাখার সাবেক টেকনিক্যাল এক্সপার্ট সত্য সুন্দর দে, চট্টগ্রামের পটিয়ার বড় উঠান ইউনিয়নের শাহানুর মিয়া, সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাচন অফিসের অস্থায়ী অপারেটর জনপ্রিয় বড়–য়া ও চট্টগ্রাম ডবলমুরিং থানা নির্বাচন কার্যালয়ের অফিস সহায়ক জয়নাল আবেদীন, মো. শাহিন, ফাহমিদা আকতার, পাভেল বড়–য়া ও মো. জাহিদ।

রোহিঙ্গাদের ভুয়া পরিচয়পত্র দেওয়ার বিষয়টি অনুসন্ধানের জন্য ১৪ সেপ্টেম্বর দুদকের চট্টগ্রাম কার্যালয় থেকে তারা আরও জানিয়েছেন, ইসির চট্টগ্রাম আঞ্চলিক ও কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ে অভিযান চালানো হয়। ইসির সার্ভারে রোহিঙ্গাদের এনআইডি সংরক্ষিত থাকার প্রমাণ ও এ ঘটনায় জনপ্রতিনিধিসহ ইসির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জড়িত থাকার তথ্যপ্রমাণ মেলে। বিষয়টি দুদকের চট্টগ্রাম কার্যালয় থেকে প্রতিবেদন আকারে কমিশনে পাঠানো হয়। পরে কমিশন এ বিষয়ে বিশদ আকারে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয়।

দুদক জানায়, সম্প্রতি লাকী ওরফে মরিয়ম বিবি নামে এক রোহিঙ্গা নারী স্মাট কার্ড নিতে এসে আটক হন। পরে ইসির তথ্য অনুযায়ী, বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার কাছে বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্র থাকার বিষয়টি শনাক্ত হয়। দুদকের অভিযানের পর ১৭ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম জেলা নির্বাচন অফিস থেকে চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানায় একটি মামলা করা হয়। এ ছাড়া ১৩ সেপ্টেম্বর কক্সবাজার জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা শিমুল শর্মা বাদী হয়ে সদর থানায় ভোটার তালিকায় ৬০০ রোহিঙ্গার নাম ওঠানোর অভিযোগে মামলা করেন। ১৬ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম ইসির আঞ্চলিক কার্যালয় তাদের অফিস সহায়ক জয়নাল আবেদীন ও তার দুই সহযোগীকে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করে। পরে ২২ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম নগরীর লাভ লেনের আঞ্চলিক সার্ভার স্টেশন থেকে গ্রেপ্তার হন ইসির চার কর্মী। তারা হলেন অস্থায়ী কর্মী মো. শাহিন, ফাহমিদা আকতার, পাভেল বড়–য়া ও মো. জাহিদ। রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির অভিযোগে জড়িত সবার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান করবে দুদক।

গত ১৯ সেপ্টেম্বর দুদকের চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-২-এর সহকারী পরিচালক রতন কুমার দাশ, উপসহকারী পরিচালক মো. শরীফ উদ্দিন ও মুহাম্মদ জাফর সাদেক শিবলীর সমন্বয়ে গঠিত এনফোর্সমেন্ট টিম কমিশনের কাছে এক চিঠির মাধ্যমে অনুসন্ধানের অনুমতি চায়। দলটি তিনটি পাসপোর্ট কার্যালয়সহ বিভিন্নভাবে সংগ্রহ করা প্রায় দেড় শ পাসপোর্ট আবেদনপত্রের নথি সংগ্রহ করে যাচাই-বাছাই করে।

দুদকের প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো এনফোর্সমেন্ট দলের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৫ সাল থেকে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে রোহিঙ্গাদের এনআইডিসংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশ হলেও নির্বাচন কমিশনের সবাই দায়সারা কাজ করেছেন। তারা এই অভিযানের আগ পর্যন্ত ল্যাপটপ হারানোসংক্রান্ত জিডি বা মামলা এবং ল্যাপটপ উদ্ধারের বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনের চট্টগ্রাম কার্যালয়ে অভিযান চালানোর পর ১৭ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম জেলা নির্বাচন অফিস কোতোয়ালি থানায় এবং ১৩ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা শিমুল শর্মা বাদী হয়ে সদর থানায় ভোটার তালিকায় ৬০০ রোহিঙ্গার নাম ওঠানোর অভিযোগে মামলা করেন। কোতোয়ালি থানায় করা মামলায় পাঁচ কর্মচারীকে আসামি করা হয়।

দুদকের এনফোর্সমেন্ট দলের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ওই মামলা লোকদেখানো এবং দায়িত্ব এড়ানোর কৌশলমাত্র। এনফোর্সমেন্ট দলের কাছে স্পষ্টভাবে মনে হয়, হাতে গোনা কয়েকজন কর্মচারীর পক্ষে রোহিঙ্গাদের ভোটার করা অসম্ভব। এ ক্ষেত্রে কর্মকর্তারাও জড়িত ছিলেন বলে রেকর্ডপত্রের প্রাথমিক পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয়।

দুদকের কর্মকর্তারা বলছেন, কমিশনের সার্ভারে তথ্য সংযুক্ত করার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ল্যাপটপ ছাড়াও ডিজিটাল ক্যামেরা, স্ক্যানার, ফিঙ্গার প্রিন্ট মেশিন, আইরিশ মেশিন, ডিজিটাল সিগনেচার প্যাডসহ এনআইডিতে ব্যবহৃত ডিভাইসগুলো কোনো কর্মচারীর কাছে থাকার কথা নয়। কর্মকর্তাদের কাছে ওই সব যন্ত্রপাতি থাকে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ল্যাপটপ আত্মসাৎ, ক্ষমতার অপব্যহারের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের ভোটার করার বিষয়গুলো নির্বাচন কমিশনের করা মামলায় উল্লেখ করা হয়নি। দুদককে পাশ কাটানোর জন্য দায়সারা মামলা করে জড়িত কর্মকর্তাদের বাঁচানোর চেষ্টা করা হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত