পদোন্নতি প্রক্রিয়াতেও জালিয়াতি?

আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১০:৩৩ পিএম

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের ৪৮ জন শ্রম কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়ার জন্য তাদের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (এসিআর) ঘষামাজা করে নম্বর বাড়ানো হয়েছে। বিষয়টি ধরতে পেরে পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) সব এসিআর শ্রম মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠিয়েছে। নানা দীর্ঘসূত্রতা করে শেষ পর্যন্ত গত মঙ্গলবার তদন্ত কমিটি গঠন করেছে শ্রম মন্ত্রণালয়। কিন্তু তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এসিআরগুলো যে অধিশাখার তত্ত্বাবধানে ছিল সেই অধিশাখার যুগ্ম সচিবকে প্রধান করে। এতে সুষ্ঠু তদন্ত ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বছর চারেক আগে যখন সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা দ্বিগুণ করা হলো; তখন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, বেশি বেতন পেলে তারা কাজের প্রতি অধিক মনোযোগী হবেন এবং দুর্নীতি-অনিয়ম কম করবেন। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে এর ফল কতটা পাওয়া যাচ্ছে তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ থেকে যাচ্ছে।

দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের দ্বিতীয় শ্রেণির ৪৮ জন শ্রম পরিদর্শককে (সাধারণ) প্রথম শ্রেণির সহকারী মহাপরিদর্শক পদে পদোন্নতি দেওয়ার জন্য গত ২৪ জুন পিএসসিতে একটি প্রস্তাব পাঠায় শ্রম মন্ত্রণালয়। নিয়ম অনুযায়ী প্রথম শ্রেণির পদে উন্নীত করার ক্ষেত্রে পিএসসির সুপারিশ বাধ্যতামূলক। প্রস্তাব যাচাই-বাছাই করে পিএসসি দেখতে পায় ১৯ জনের এসিআরে অনুবেদনকারী কর্মকর্তার নম্বর বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বাকিদের এসিআরেও ঘষামাজা রয়েছে। কার এসিআরে কী সমস্যা তা উল্লেখ করে পিএসসি গত ২৪ জুন সংশোধনের জন্য শ্রম মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠায়। চিঠিতে নিয়োগকারী কর্র্তৃপক্ষের পদ বিন্যাসের ছক এবং জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের বিধিবিধান অনুসরণ করে জ্যেষ্ঠতার তালিকা করার প্রত্যয়নপত্রও চাওয়া হয়। এ অবস্থায় শ্রম মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট এসিআর সংশোধনের উদ্যোগ নেয়।

সরকারি পর্যায়ে গঠিত কমিটিগুলো নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অভিযোগের কথা প্রায়শই শোনা যায়।  শ্রম মন্ত্রণালয়ের অধীনে কলকারখানা অধিদপ্তরের যে শাখায় দুর্নীতি ঘটেছে সেই শাখারই যুগ্ম সচিবকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কেননা তার স্বাক্ষরেই এসিআরগুলো মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল। যেসব কর্মকর্তা পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন তাদের দেওয়া বেনামি চিঠিতে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগও এসেছে।

জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত রাজনীতিকরা দেশসেবার শপথ গ্রহণকারী। তেমনি প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে জনগণের সেবায় সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের জন্য আমলারা অঙ্গীকারবদ্ধ। অবশ্য তাদের কর্মপরিধি ও দায়িত্ব ভিন্নতর। কিন্তু কালের অভিজ্ঞতায় জনগণের কাছে দুই পক্ষেরই নতুনতর বাস্তব পরিচিতি হয়েছে নিজ নিজ স্বভাবগুণে। সাধারণ মানুষ জানে, রাজনীতিকদের প্রতিশ্রুতি সর্বদাই ভবিষ্যৎকালবাচক, ফলে তারা এটাও জানেন যে, সুদূর ভবিষ্যতের কোনো আশা অদূর ভবিষ্যতে করে লাভ নেই। অন্যদিকে, আমলাদের কর্মনীতি সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ‘লালফিতার দৌরাত্ম্য’ কিংবা ‘উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি’ কথাগুলো প্রবাদে পরিণত হয়েছে। দেশের মানুষ জানে কখন কোথায় কেন কাজ আটকে থাকে, আর কখন কোথায় কেন অনর্থক ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেওয়া হয়। মানুষ জানে কিছু ‘কমিটির’ প্রতিবেদন কখনই আলোর মুখ দেখে না আর কিছু ‘কমিটি’ সব সময়ই দায়সারা প্রতিবেদন দিয়ে দেয়।

শাসনব্যবস্থার সর্বস্তরে, বিশেষ করে রাজনীতিবিদদের দ্বারা সরাসরি পরিচালিত প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাগুলোয় জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থার ঘাটতি থাকলে তা আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে আরও দুর্নীতিগ্রস্ত ও বেপরোয়া করে তোলে। এই চক্র থেকে বেরোতে হবে এবং সদিচ্ছা থাকলে সেটা যে সম্ভব, কাছের ও দূরের অনেক দেশই তা প্রমাণ করেছে। আমরা কেন পারব না?

বাস্তবিক অর্থেই সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে হলে দুর্নীতিমুক্ত জনপ্রশাসন গড়ে তোলা এবং সুশাসন নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে রাজনৈতিক দৃঢ়তা ও সততার সঙ্গে ছোট-বড় সব দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এটাই কাম্য।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত