বেশ ক’বছর আগে হঠাৎ করেই সংবাদ সম্মেলন ডাকলেন এমেকা ইজিউগো। আশির দশকে মোহামেডানে খেলে যাওয়া এই নাইজেরিয়ান পরবর্তী সময়ে দলের কোচের দায়িত্ব নিয়ে এসেছিলেন। সাদা-কালোদের কোচিংয়ের অভিজ্ঞতাটা এমেকার ছিল তিক্ততায় ভরা। ঠিকমতো বেতনও বুঝে না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে সেদিন সংবাদ সম্মেলনে এমেকা বলেছিলেন, ‘মোহামেডান এখন লোকমানের দোকানে পরিণত হয়েছে।’ এমেকা আঙুল তুলেছিলেন ক্লাবটির ডাইরেক্টর ইনচার্জ লোকমান হোসেন ভুঁইয়ার দিকে। যে লোকটি এখন টক অব দ্য টাউন। বুধবার রাতে র্যাবের হাতে আটক হয়েছেন লোকমান। তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের একটিÑ ঐতিহ্যবাহী মোহামেডানে অবৈধ ক্যাসিনো চালানোর অনুমতি দেওয়া। লোকমান ভুইয়াকে গ্রেপ্তার করায় মোহামেডানের সাবেক খেলোয়াড়, সংগঠকরা ফেলেছেন স্বস্তির নিঃশ্বাস। একই সঙ্গে ক্লাবের দীর্ঘদিনের সুনাম নষ্ট করায় তার প্রতি ক্ষোভও ঝেড়েছেন কেউ কেউ। কারও কারও মাঝে শঙ্কাÑ ক্লাবের নষ্ট হওয়া ভাবমূর্তি ফেরানো নিয়ে।
মোহামেডানের এক সময়ের ডাকসাইটে খেলোয়াড় এবং কোচ গোলাম সারোয়ার টিপু ক্লাবটির বর্তমান অবস্থার দায় পুরোটাই চাপিয়েছেন লোকমানের ওপর, ‘১৯৯১ সালে মোসাদ্দেক আলী ফালুর হাত ধরে এই ক্লাবে প্রবেশের পর থেকে ধীরে ধীরে ক্লাবটির ক্ষমতা করায়ত্ত করেন লোকমান। একমাত্র এই ব্যক্তিটির কারণে ক্লাবটির অনেক প্রকৃত সংগঠক, সাবেক খেলোয়াড় ক্লাবে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন দীর্ঘদিন ধরে। প্রিয় ক্লাবে সেই পরিবেশটাই নেই। লোকমান প্রভাব-প্রতিপত্তি খাটিয়ে ক্লাবে একনায়কতন্ত্র কায়েম করেছিলেন। মোহামেডানের মতো ঐতিহ্যবাহী ক্লাবে অবৈধ ক্যাসিনো পরিচালনা করার অনুমতি দিয়ে ক্লাবের সুনাম নষ্ট করেছেন তিনি।’ ক্যাসিনো কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িয়ে অন্য ক্লাবগুলোর সঙ্গে মোহামেডানও কলঙ্কিত হয়েছে। টিপুর শঙ্কা ক্লাবের হারানোর গৌরব ফিরিয়ে আনা নিয়ে, ‘আমি সত্যিই শঙ্কিত ক্লাবটির সুনাম ফিরিয়ে আনা নিয়ে। এ অবস্থায় ক্লাবকে পৃষ্ঠপোষকতায় কেউ এগিয়ে আসবেন কি না এটা নিয়েও আমি চিন্তিত।’
বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সহ-সভাপতি এবং মোহমেডানের সাবেক ফুটবলার বাদল রায় বলেন, ‘এই সব দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার কারণে ক্লাবটি আজ রীতিমতো ধুঁকছে। ১৭ বছর ধরে কোনো শিরোপা নেই, ভালো দল গঠন করা হচ্ছে না। এসব দুর্নীতির টাকা কোথায় গেলÑ এর সুষ্ঠু তদন্ত হোক। শুনেছি ক্যাসিনো থেকে প্রতিদিন ৭০ হাজার করে টাকা নিয়েছেন তিনি (লোকমান)। আমি অবাক হই, সেটা কীভাবে হয়। যারা ক্লাবকে ভালোবাসে না তারাই এমন করতে পারে। ক্লাবের এই পরিণতি দেখে সমর্থকরা নীরবে কাঁদছেন। যখন জুয়া ছিল না তখন সাফল্য ছিল, যখন থেকে জুয়া শুরু হলো তখন থেকে সাফল্য নেই।’
মোহামেডানের সাবেক সদস্য সচিব মনিরুল হক চৌধুরী মনে করেন, কিছু কুচক্রীর দুর্বৃত্তায়নে ক্লাবটির সকল সুনাম ধুলোয় মিশে গেছে। এ জন্য ক্লাবের লিমিডেট কোম্পানিতে বদলে যাওয়াকেও দুষেছেন তিনি, ‘মোহামেডান ছিল একটা রেনেসাঁ, সংস্কৃতি, একটি বিশ্বাস। সবার সহযোগিতায় এ ক্লাব গড়ে ওঠে। যখন লিমিটেড কোম্পানি হলো তখন থেকেই আসলে ক্লাবটির অবনতি শুরু। আর এখন তো এটা নর্দমায় রূপ নিয়েছে।’
মোহামেডানের আরেক সাবেক তারকা ফুটবলার আব্দুল গাফফার বলেন, ‘বিএনপি আমলে লোকমান ক্লাবে ঢুকে ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিভিন্ন পদে বসাতে থাকেন। ফলে প্রকৃত সংগঠকরা ধীরে ধীরে দূরে সরে যান। এ কারণেই ক্লাবটির আজকের এই পরিণতি।’
সাবেকদের চাওয়া দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিদায় করে ক্লাবে এমন পরিবেশ ফিরে আসুক যাতে ক্যাসিনো নয়, এই ক্লাবকে মানুষ আবার মনে জায়গা দেবে তাদের মাঠের সাফল্য দিয়ে।
