আটকে গেছে প্রাথমিকের সাড়ে ১০ কোটি বই ছাপা

আপডেট : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০২:১৮ এএম

প্রাথমিক স্তরে বিনামূল্যের সাড়ে ১০ কোটি পাঠ্যবই ছাপার কাজ আটকে গেছে। কাগজের ছাড়পত্র না পাওয়ায় কার্যাদেশের এক মাস পার হলেও ছাপা শুরু করতে পারেনি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান। এতে ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই দেওয়া নিয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বই ছাপার কাগজসহ অন্যান্য বিষয়াদির মান যাচাইয়ের দায়িত্বে থাকা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কন্টিনেন্টাল ইন্সপেকশন বিডির স্বেচ্ছাচারিতা ও অনিয়মের কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, ছাপার কাগজ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিষয়াদির মান ঠিক নেই অজুহাত দেখিয়ে সময়ক্ষেপণ, নির্দিষ্ট মিল থেকে কাগজ কিনতে বাধ্য করা ছাড়াও দ্রুত ছাড়পত্র দেওয়ার শর্তে মুদ্রকদের কাছে চাঁদা দাবি করেছে কন্টিনেন্টাল। আর এসবের নেপথ্যে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের বই বিতরণ শাখার এক কর্মকর্তা রয়েছেন বলে অভিযোগ এসেছে। পরে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এনসিটিবিকে বিষয়টি সমাধানে নির্দেশ দিয়েছে।

এনসিটিবির একাধিক কর্মকর্তা জানান, কন্টিনেন্টাল কর্র্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে গত ১৫ সেপ্টেম্বর এনসিটিবির চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগ করে মুদ্রণ শিল্প সমিতি। এতে বলা হয়, একই ওজনের (জিএসএম) কাগজ মাধ্যমিক পর্যায়ে ছাড়পত্র পেলেও প্রাথমিক স্তরে আটকে দেওয়া হয়েছে। কাগজের মান যাচাইয়ের জন্য চিঠি দিলে বিনা কারণে এক সপ্তাহ, কখনো ১০ দিনের বেশি ঘোরানোর পর পরিদর্শনে আসে কন্টিনেন্টাল কর্র্তৃপক্ষ।

মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাধারণ সম্পাদক জহরুল ইসলাম বলেন, শুরু থেকেই নানাভাবে হয়রানি করছে কন্টিনেন্টাল। ব্রাইটনেস ঠিক নেই অভিযোগে বাতিলের এক সপ্তাহ পর সে কাগজকেই মানসম্পন্ন বলে ছাড়পত্র দিয়েছে। তিনি বলেন, ৮৮ থেকে ৯০ শতাংশের কম ব্রাইটনেস হলে আর্টপেপার তৈরিই করা যায় না। কিন্তু কন্টিনেন্টাল আমাদের আর্টপেপারের ক্ষেত্রে হয়রানি করার জন্য ৮০ শতাংশের কম ব্রাইটনেসের অজুহাত দিয়ে ছাড়পত্র দিচ্ছে না। এরই মধ্যে গত ১৭ সেপ্টেম্বর এনসিটিবিতে এক সেমিনারে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব আকরাম আল-হোসেনের কাছেও কন্টিনেন্টালের বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির অভিযোগ করেন মুদ্রণকারীরা। তারা বলেন, প্রাথমিকের পরিদর্শন টিম তাদের নানাভাবে হয়রানি করছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কাছে সরাসরি চাঁদাও চাওয়া হয়েছে। অভিযোগ শুনে এনসিটিবিকে দ্রুত বিষয়টি সুরাহার তাগিদ দেন প্রাথমিক সচিব আকরাম আল-হোসেন। এরপর নড়েচড়ে বসেছে এনসিটিবি। চারপক্ষীয় বৈঠকের জন্য মুদ্রণ ব্যবসায়ী, পরিদর্শন প্রতিষ্ঠান ও প্রাথমিক অধিদপ্তরের প্রধানদের চিঠি দিয়েছে সংস্থাটি।

এ বিষয়ে এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহা দেশ রূপান্তরকে জানান, প্রাথমিকের পরিদর্শন প্রতিষ্ঠান নিয়ে একটু জটিলতা তৈরি হয়েছে। চারপক্ষীয় সভা ডাকা হচ্ছে। আশা করছি সেখানে একটি সমাধান আসবে। পরিদর্শন টিমের অনৈতিক সুবিধা চাওয়ার বিষয় তদন্ত হবে। প্রমাণ হলে তাদের কালো তালিকাভুক্ত করা হবে বলেও জানান তিনি।

এনসিটিবির তথ্যানুযায়ী, ২০২০ শিক্ষাবর্ষের জন্য সাড়ে ১০ কোটি বই ছাপার কার্যাদেশ দেওয়া হয় গত ২০ আগস্ট। কার্যাদেশের পরবর্তী ৪৯ দিনের মধ্যে অর্ধেক বই সরবরাহ করার কথা। এরপর চুক্তি অনুযায়ী, ২০ নভেম্বরের মধ্যে শতভাগ বই ছাপিয়ে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছে দিতে হবে। কিন্তু গত মঙ্গলবার পর্যন্ত প্রাক-প্রাথমিকের কিছু হলেও প্রাথমিকের ১০ কোটি বইয়ের একটিও ছাপা হয়নি। পাঠ্যপুস্তক ও বিতরণ শাখার এক কর্মকর্তার অভিযোগ, পরিদর্শন টিম মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানকে অহেতুক হয়রানি করছে। ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি এমন কাগজের ১০৫টি স্যাম্পল সংগ্রহ করে এনসিটিবি বিকল্প পন্থায় সায়েন্স ল্যাবরেটরি, বিএসটিআই ও বুয়েটে পরীক্ষা করিয়েছে। সেখানে কাগজের কোনো সমস্যা পাওয়া যায়নি। এরপর কাগজের ছাড়পত্র দেওয়ার জন্য কন্টিনেন্টালকে বলা হলেও, প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, বিএসটিআই ও বুয়েটের মেশিন চীন থেকে আনা। এসব মেশিনে সঠিক মান যাচাই করা সম্ভব নয়। এটি হাস্যকর যুক্তি।

কন্টিনেন্টালের এমন স্বেচ্ছাচারিতা ও অনিয়মের পেছনে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের বই বিতরণ শাখার সহকারী গবেষণা কর্মকর্তা মাহফুজা খাতুনের প্রভাব রয়েছে বলে এনসিটিবির কাছে অভিযোগ রয়েছে। এনসিটিবি এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, মাহফুজা খাতুনের সুপারিশেই কাগজের মান যাচাইয়ে অনভিজ্ঞ ৩০ জনকে কন্টিনেন্টাল কর্র্তৃপক্ষ নিয়োগ দিয়েছে। এর প্রমাণও পেয়েছে এনসিটিবি। শুধু এবার নয়, বিগত কয়েক বছর মাহফুজা প্রাথমিকের বই পরিদর্শনে সরাসরি হস্তক্ষেপ করছেন, তদন্তে প্রমাণ পাওয়ার পরও অদৃশ্য কারণে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। এরই সুযোগ নিয়ে পরিদর্শন প্রতিবেদন এনসিটিবিতে পাঠাতে সময়ক্ষেপণ করেন মাহফুজা। অভিযোগের বিষয়ে মুঠোফোনে দেশ রূপান্তর থেকে যোগাযোগ করা হলে মাহফুজা খাতুন কোনো মন্তব্য করেননি। পরে গত মঙ্গলবার সরাসরি দপ্তরে গেলেও তিনি সাড়া দেননি। এ সময় মাহফুজা খাতুন অভিযোগের বিষয়ে মহাপরিচালক ও পরিচালকের সঙ্গে কথা বলতে বলেন।

এ বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের বই বিতরণ শাখার উপপরিচালক নবুওয়াত হোসেন সরকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মাহফুজা খাতুনের অভিযোগ বিষয়ে আমাদের কাছে তথ্য নেই। আমরা তাকে অধিদপ্তরের ভালো কর্মকর্তা হিসেবেই জানি। আমরা প্রতিদিনের ফাইল প্রতিদিনই পাস করি। আমাদের কাজ নিয়ে অভিযোগের সুযোগ নেই।’

অভিযুক্ত কন্টিনেন্টালের সহকারী ব্যবস্থাপক ফরহাদ আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগ আনা হয়েছে। পরিদর্শনে গিয়ে মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলোর কাগজপত্রে অনিয়ম পেয়েছি। এরপর তাদের কাগজপত্র ঠিক করতে বলায় ক্ষিপ্ত হয়ে চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগ দিয়েছে। আমাদের কাজে কোনো ধীরগতি নেই। সবকিছু ঠিকমতোই হচ্ছে।’

এ বিষয়ে এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক ফরহাদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত বছর একই অভিযোগ আসার পর তদন্তে প্রমাণও মিলেছে। এবার সবাইকে ডেকে সাবধান করা হয়। কিন্তু এরপরও একই অভিযোগ আসছে। এবার প্রমাণ পেলে সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর এনসিটিবির চেয়ারম্যান নারায়ণ চন্দ্র সাহা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পরিদর্শন প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে মুদ্রণকারীসহ একাধিক অভিযোগ আমার কাছে এসেছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাৎক্ষণিক এ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত