বাংলাদেশের মন্দিরে মন্দিরে এখন দুর্গোৎসবের প্রস্তুতি প্রায় শেষ। আজ মহালয়ার দিন থেকেই মূলত পূজার আনুষ্ঠানিকতার শুরু। চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালী উপজেলার করলডেঙ্গা মেধস মুনির আশ্রম সনাতন ধর্মালম্বীদের দুর্গাপূজার মূল উৎসভূমি হিসেবে পরিচিত। দুর্গাপূজার উৎপত্তিস্থল হিসেবে খ্যাত এই মেধস আশ্রম সব ধর্মের মানুষের কাছে বর্তমানে দর্শনীয় স্থান হয়ে উঠেছে।
বোয়ালখালী উপজেলা থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে মধ্যম করলডেঙ্গা গ্রামের পাহাড়ের নৈসর্গিক পরিবেশে অবস্থান মেধস মুনির আশ্রম। পৌরাণিক মতে, এই পাহাড়ে দেবী দুর্গা মর্ত্যলোকে অবতীর্ণ হন। রাজা সুরথ আর সমাধি বৈশ্য মহর্ষি মার্কেন্ডের কাছেই প্রথম দেবী মাহত্ম্যম পাঠ নেন এবং দুর্গাপূজা করেন।
আশ্রমটি ৬৮ একর জায়গা জুড়ে। মূল ফটক থেকে ১৫ মিনিট হাঁটার পর ১৪০টি সিঁড়ি ভেঙে পাহাড়ে ওঠার এই আশ্রম। সেখানে উঠলেই দেখা মিলবে বড় দুর্গা প্রতিমার মুখের অবয়বে সুন্দর কারুকার্যশৈলী। শ্রীভাস্কর রচিত ‘মহাশক্তির আবির্ভাব ভূমি চট্টগ্রাম’ নামক এক বইয়ে স্বামী দেবানন্দতে তার পদ্যে (স্তোত্রে) চট্টগ্রামের করলডেঙ্গা পাহাড়ের মেধস মুনির আশ্রমে হাজার বছর পূর্বে প্রথম দুর্গামূর্তির পূজা হয় বলে উল্লেখ করেছেন। আশ্রমটির প্রবেশপথে ২০ সিঁড়ি পূর্বে ডানপাশে নেমে গেছে শান বাঁধানো পুকুরের ঘাট, যা সীতাপুকুর নামে পরিচিত। পুকুরে যাওয়ার রঙিন সিঁড়ি। এই পুকুরে সীতা দেবী স্নান করেছিলেন বলে রামায়ণে আছে। পাহাড়ের বুক থেকে নেমে পানিই সীতাপুকুরের পানির উৎস।
করলডেঙ্গা ইউনিয়নের বাসিন্দা হরিপদ দাশ জানান, ‘সীতা দেবী রামচন্দ্রের বনবাসের সময় এই পাহাড়ে অবস্থান করেছিল, এখানে সংরক্ষিত আছে সীতা দেবীর পায়ের ছাপও।’ পুকুরে নামার সিঁড়ির আগেই সমতল জায়গায় আছে মেধস মুনি, সুরথ রাজা ও সমাধি বৈশ্যের মন্দির। ১৯৭১ সালের ৫ এপ্রিল গানপাউডার দিয়ে মন্দির জ্বালিয়ে দিয়েছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। স্বাধীনতাযুদ্ধের সেই ক্ষত নিয়ে মন্দিরে পূজা-অর্চনাসহ বন্ধ থাকে সাত বছর। অবশেষে ১৯৮৯ সালে পাথরের মূর্তি দিয়ে পুনঃস্থাপন করা হয় বলে জানান বোয়ালখালীর পোপাদিয়া গ্রামের সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধা আরতী আচার্য্য।
এখানে রয়েছে মোট ১২টি মন্দির। দুর্গা মন্দিরের পর হাতের ডান পাশে নিচে যাওয়ার পাহাড়ি সিঁড়ি বেয়ে নামতে দু’পাশে বন পেরিয়ে আবার উপরে কামাক্ষ্যা মন্দির। এই মন্দিরের সামনে দেখা মিলবে মুনি ঋষিদের যজ্ঞ করার কু-। এরপর শিব মন্দির, যেখান থেকে গভীর পাহাড়ে যাওয়ার পথ শুরু। শিব মন্দিরের পেছনে দাঁড়ালেই দেখা যায় অবিরাম ছুটে চলা পাহাড়ি জলধারা।
আশ্রমের মহারাজ বুলবুলা নন্দ বলেন, প্রতি বছর পিতৃপক্ষ শেষে মহালয়ার দেবীপক্ষের সূচনা হয়। মা দুর্গাকে মহালয়ার দিন ভোর থেকে চ-ী পাঠের মাধ্যমে আরাধনার মধ্য দিয়ে আহ্বান করা হয়। দুর্গাপূজা শক্তির পূজা। এটি অশুভ শক্তিকে বিনাশ করে শুভ শক্তিকে প্রতিষ্ঠার পূজা। এই দর্শন থাকতেই হবে।
তিনি আরও বলেন, ১১৬ বছর আগে দৈববলে পাহাড়-পর্বত পরিভ্রমণ শেষে বেদানন্দ স্বামী এই তীর্থভূমি আবিষ্কার করেন। এই আশ্রমটিতে আসতে একসময় অনেক কষ্ট হতো মানুষের, চারদিকে জঙ্গল আর জনপদহীন। বর্তমানে ভক্তদের অনুদানে বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে উঠেছে এই মেধস আশ্রমে। এই আশ্রমটিকে জাতীয় তীর্থ হিসেবে ঘোষণার দাবি জানান তিনি।
রামায়ণ মতে, ত্রেতাযুগে শরৎকালে রামচন্দ্র দুর্গাপূজা করেছিলেন। তবে তারও অনেক আগে সত্যযুগেই দুর্গাপূজার সূচনা হয়। ধার্মিক রাজা সুরথ শত্রুদের চক্রান্তে রাজ্য হারিয়ে ঘুরতে ঘুরতে উপস্থিত হন মেধস মুনির আশ্রমে। মেধস মুনি তার দুর্দশা দেখে তাকে হারানো রাজ্য পুনরুদ্ধারের জন্য দুর্গাপূজা করার উপদেশ দেন। সুরথ রাজা দুর্গাপূজা করেন। দেবী দুর্গার আশীর্বাদে তিনি শত্রুদের পরাস্ত করে আপন রাজ্য উদ্ধারে সক্ষম হন। সেই থেকে প্রচলিত হয় দুর্গাপূজা।
