শুধু ক্যাসিনো, টেন্ডারবাজি, দখলবাজি, চাঁদাবাজিই নয় যোগাযোগ, স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ যেসব সেক্টরে অনিয়ম চলছে সেসব সেক্টরেই দুর্নীতিবিরোধী শুদ্ধি অভিযান চালানোর পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এজন্য ইতিমধ্যে সরকারের হাইকমান্ড থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকেই বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গত মঙ্গলবার রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর অনির্ধারিত এক বৈঠকেও চলমান অভিযান নিয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বৈঠকে উপস্থিত পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, গত ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া অভিযান সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিস্তারিত জানানো হয়েছে। তিনি চলমান অভিযান জোরালো করার পাশাপাশি যেখানেই অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া যাবে সেখানেই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। দুর্নীতিবিরোধী টাস্কফোর্সকে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে বলেছেন।
এদিকে গতকাল বুধবার পুলিশ সদর দপ্তরেও একটি বৈঠক হয়েছে। ওই বৈঠকে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ডক্টর মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী, ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোহাম্মদ শফিকুল ইসলামসহ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।
পুলিশ ও র্যাবের কয়েকজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী জিরো টলারেন্স দেখাতে বলেছেন। কারও সঙ্গে কোনো ধরনের আপস করতে বারণ করেছেন। যেসব সেক্টরে দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি বা নানা অনিয়ম হচ্ছে সেগুলোর ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। নির্দেশনা পেয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সবকটি সংস্থা কাজ শুরু করে দিয়েছে।
পুলিশের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ক্যাসিনো ও টেন্ডারবাজবিরোধী অভিযানের ১৫ দিন পেরিয়ে গেলেও নেপথ্যের মদদদাতারা এখনো আছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। তবে যারা এসব ঘটনায় সম্পৃক্ত তাদের একটি তালিকা হচ্ছে। প্রাথমিক তালিকাটি সরকারের নীতিনির্ধারকদের অবহিত করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, চলমান অভিযানে ঢাকা মহানগর যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, যুবলীগ নামধারী ঠিকাদার গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীম, কলাবাগান ক্লাবের সভাপতি কৃষক লীগ নেতা শফিকুল আলম ওরফে কালা ফিরোজ ও মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক লোকমান হোসেন ভূঁইয়াকে দফায় দফায় রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে র্যাব এবং পুলিশ। রিমান্ডে তারা ক্যাসিনো ও টেন্ডারবাণিজ্যে যারা সহায়তা করেছেন তাদের নাম বলেছেন। তাদের তথ্যে প্রশাসনের বর্তমান-সাবেক কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক নেতাদের নাম উঠে এসেছে। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ একাধিক নেতার নাম আসায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও অনেকটা বিব্রত। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের প্রভাবশালী এ নেতাসহ অনেকেই গ্রেপ্তার না হওয়ায় নানা ধরনের জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে। ক্যাসিনোসহ দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরুর পর অনেকে এরই মধ্যে গা-ঢাকা দিয়েছেন। কেউ কেউ বিদেশে পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করছেন। প্রভাবশালী ওই নেতা দেশে না বিদেশে তাও কেউ পরিষ্কার করে বলতে পারছেন না।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স দেখানো হচ্ছে। যেখানেই অনিয়ম হবে সেখানেই অভিযান চালানো হবে। কাউকে ছাড় দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। এ ক্ষেত্রে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও কঠোর। তার নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা কাজ করছি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ অধিবেশন শেষে গত মঙ্গলবার ভোরে দেশে আসার পর সন্ধ্যা ৭টার দিকে গণভবনে তার সঙ্গে দেখা করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধানরা। এই সময় একটি অনির্ধারিত বৈঠক হয়। বৈঠকে পুলিশপ্রধান ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী, র্যাবপ্রধান ড. বেনজীর আহমদ, ডিএমপি কমিশনার মোহাম্মদ শফিকুল ইসলামসহ সবকটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকটি শেষ হয় রাত সাড়ে ১০টার দিকে। এ সময় চলমান অভিযান নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইজিপি। যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয় সরকারপ্রধানকে। জিজ্ঞাসাবাদে কী ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে তাও জানানো হয় তাকে। যাদের নাম আসছে তাদের বিষয়েও প্রধানমন্ত্রীকে জানানো হয়। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ক্যাসিনো, টেন্ডারবাজি, দখলবাজি, চাঁদাবাজির মতো অপরাধ সেক্টরের পাশাপাশি যোগাযোগ, স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ যেসব সেক্টরে নানা অনিয়ম হচ্ছে সেই ব্যাপারে খোঁজখবর নিতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। এসব সেক্টরে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান চালানো হবে যেকোনো সময়। প্রধানমন্ত্রী বলে দিয়েছেন, দুর্নীতির সঙ্গে কোনো আপস করা হবে না। তিনি দুর্নীতিবিরোধী টাস্কফোর্সকে আরও শক্ত অবস্থান নিতে বলেছেন। চলমান অভিযান আরও জোরালো করার নির্দেশ দিয়েছেন। তার নির্দেশনার পর ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যেসব নেতাকর্মী বিলবোর্ড বা পোস্টারিং করে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন তাদের ব্যাপারেও খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। অভিযোগ আছে, তারা জোর করে বিলবোর্ড দখল করে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। আবার চাঁদাবাজি করেও পোস্টারিং করছেন। এক প্রশ্নের জবাবে ওই কর্মকর্তা বলেন, ঢাকা দক্ষিণের প্রভাবশালী ওই নেতার ব্যাপারেও প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করা হয়েছে। তিনি এখন কোথায় আছেন তা বলা সম্ভব হচ্ছে না। তবে যারা দুর্নীতি বা অনিয়ম করছেন তাদের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী কঠোর মনোভাব দেখিয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যেসব কর্মকর্তা সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন তাদের ব্যাপারে কঠোর প্রশাসন। তদন্ত করে তাদের ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন আইজিপি।
পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, গতকাল দুপুরে পুলিশ সদর দপ্তরে ডিএমপি কমিশনারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক করেছেন আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারী। চলমান অভিযান আরও জোরালো করতে ডিএমপি কমিশনারকে বেশকিছু পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। এ প্রসঙ্গে পুুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আইজিপি মহোদয়ের রুমেই বৈঠকটি হয়েছে। ক্যাসিনোসহ নানা বিষয়ে কথা হয়েছে। ক্যাসিনোসহ অন্যান্য অপরাধের সঙ্গে পুলিশের যেসব কর্মকর্তা বা সদস্য জড়িত তাদের একটি তালিকা করা হচ্ছে। তদন্তের পর যাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
একটি সংস্থার দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গ্রেপ্তার হয়ে যারা রিমান্ডে আছেন তারা জিজ্ঞাসাবাদে যে প্রভাবশালী-প্রশাসনের ব্যক্তিদের নাম বলেছেন, তাদের যত দ্রুত সম্ভব আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। কালক্ষেপণ করা হলে কঠিন হবে হোতাদের আটক করতে। তাদের মধ্যে অনেকেই দেশের বাইরে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন বলে আমাদের কাছে তথ্য এসেছে। তবে জড়িতরা নজরদারিতে রয়েছেন। তাদের বিদেশযাত্রা ঠেকাতে বিমানবন্দর ও সীমান্তে সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
গত ১৫ দিনে ঢাকাসহ সারা দেশে ৩৪টি অভিযান (র্যাব ১৮ ও পুলিশ ১৪) চালানো হয়েছে। এসব অভিযানে খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, জি কে শামীম, শফিকুল আলম ফিরোজ ও লোকমান হোসেনসহ ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করে বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। অভিযানে ১৭ কোটি টাকা, ১৬৫ কোটি টাকার স্থায়ী আমানত (এফডিআর) এবং ১৪টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা দেওয়া হয়েছে ২০২ জনকে।
