আমাজনের বন, পরিবেশ ও আদিবাসী গোষ্ঠীর সংগ্রাম– সবই লুকিয়ে আছে ‘দাভি ইয়ানোমাম্মি কোপেনাওয়াল’র জীবনে। এবারের বিকল্প নোবেলজয়ী নেতা ও সংগঠন ‘হুতুকারা’ নিয়ে লিখেছেন ওমর শাহেদ
ব্রাজিলের সবচেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ আদিবাসী তারা–‘ইয়ানোমাম্মি’; মোট ৩৫ হাজার। ব্রাজিল ও ভেনেজুয়েলায় ছড়িয়ে থাকা আমাজনের বৃষ্টিময় বনমালা তাদের ঠিকানা। বিশ্বের বৃষ্টিময় যেকোনো বনের মধ্যে সবচেয়ে বড় জায়গায় তারা থাকেন! তারপরও তাদের জীবন দুর্দশায় ভরা, জমিটুকু তাদের এক নেতার মাধ্যমে লড়াইয়ে পাওয়া। এক অসাধারণ গল্প। পরতে পরতে ছড়ানো ব্যথা।
‘তিনি যখন ঘর ছাড়েন তখন বিশ্ব সংকটে পড়ে’–বলে খবরের শিরোনাম দিয়ে প্রচার করেছে বিশ্বখ্যাত ও বহু পুরনো ব্রিটিশ দৈনিক ‘দি গার্ডিয়ান’। ঠিক কবে জন্মেছেন, দিনক্ষণটি স্পষ্ট করে বলতে পারেন না আমাজনের এই রাজপুত্র। তবে মনে পড়ে, বছরটি ১৯৫৬ সালের আশপাশ হবে। ব্রাজিলের আমাজন রাজ্যের মারকানাতে তোতোতবেই নদীর তীরে এক ইয়ানোমাম্মি সমাজে জন্মেছিলেন। তার এই দুর্গম অঞ্চলেই পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে বিচ্ছিন্ন জীবনযাপনকারী আদিবাসী গোষ্ঠীটির মানুষদের শরীরে মরণ রোগ ঢুকিয়ে দেন প্রথমে ব্রাজিলিয়ান সরকার ও পরে দক্ষিণ আমেরিকান খ্রিস্টান মিশনারিরা। সত্তরের দশকে সামরিক সরকার ইয়ানোমাম্মিদের এলাকার একপাশ থেকে আরেক পাশে ভেতর দিয়ে একটি রাস্তা বানান। ফলে সমাজগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; প্রথম দেখেছে বাইরের দুনিয়া ও সমাজের চেহারা। সামরিক বাহিনীর অনেক সদস্য ও নির্মাণ শ্রমিকরা বয়ে আনা রোগ তাদের দেহেও ঢুকেছে। এই প্রথম রোগ হয়েছে তাদের। আশির দশকে এলো নতুন ভয়ানক বিপদ ও দুর্ভোগ। ২০ হাজার থেকে আনুমানিক এক লাখ স্বর্ণ খনি শ্রমিক তাদের জমিগুলোতে আমন্ত্রিত হয়ে এলেন। তারা ইয়ানোমাম্মিদের গ্রামগুলোকে জ্বালিয়ে দিলেন, তখনই প্রথম তাদের গুলি করে মারলেন। রোগের সঙ্গে আবার পরিচয় করালেন। সেই হাম ও ম্যালেরিয়া মহামারি হয়ে ছড়িয়েছে তাদের গ্রামগুলোতে। ফলে ২০ ভাগ জনসংখ্যাই গিয়েছেন মরে। এরপরই ‘দাভি কোপেনাওয়াল’ নামের অসাধারণ ব্যক্তিত্ব, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত জননেতার মঞ্চে প্রবেশ।
পর্তুগিজ শিখেছিলেন তিনি খ্রিস্টান মিশনারিদের কাছে। সেই ‘নিউ ট্রাইভস মিশন’ নামের সংগঠনের কাছে দেশের রাষ্ট্রভাষা শিখলেও পরিচয় ছাড়েননি ‘দাভি কোপেনাওয়াল ইয়ানোমাম্মি’। জটিল, ব্যথায় ভরা মন নিয়ে আশির মাঝামাঝিতে শুরু করলেন তার আসল কাজ। সরকারি, বেসরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা ও দেনদরবারের কাজ প্রথম তিনিই আদিবাসীদের মধ্যে শুরু করলেন। তিন বা তারও বেশি ব্রাজিল প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে প্রখর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, তীক্ষ্ন বুদ্ধিমান মানুষটির। সবার হয়ে তার দাবি– ‘আমাজনের বিশাল বনমালার সন্তানদের জমির আইনগত নিরাপত্তা দিতে হবে।’ আন্তর্জাতিক মহলের সঙ্গেও যোগাযোগ হলো। কয়েকটি তেমন সংগঠন ও নিজের ইয়ানোমাম্মিদের কমিশন গড়ে তুলে তাদের নিয়ে প্রচারণা চালানো শুরু করলেন। ফলে ১৯৯২ সালে প্রথম ‘আর্থ সামিট’র ঠিক আগে সরকার তাদের অঞ্চলের আনুষ্ঠানিক দাবির স্বীকৃতি দিলেন। সামিট মানে রাষ্ট্রনেতাদের শীর্ষ সম্মেলন। হয়েছিল রাজধানী রিও ডি জেনিরোতে। ৯৬ হাজার বর্গ কিলোমিটারের বিরাট সেই বনভূমিতে তারা ন্যায্যভাবে থাকা শুরু করলেন। গ্রিসের চেয়ে বড়, সুইজারল্যান্ডের দ্বিগুণ! বিশ্বে উদ্ভিদ, প্রাণী ও প্রাণের বংশবিস্তার এবং গতির সবচেয়ে বড় আধার। তাদের জীবন ও জীবিকার উৎস এই বিরাট আমাজন ছড়িয়ে আছে ব্রাজিল থেকে ভেনেজুয়েলাতে। সীমানা নির্ধারণ করতে গিয়ে অসাধারণ পরিশ্রম করেছেন তিনি ও বন্ধুরা। অভ্যন্তরীণ বিষয় বাদে অন্যান্য বিষয়ে চুক্তিবদ্ধ ফেডারেল পুলিশ (ব্রাজিল ও ভেনেজুয়েলার যৌথ বাহিনী) পুরো অঞ্চল থেকে ২০ হাজার থেকে শুরু করে মোট ১ লাখ স্বর্ণ খনি শ্রমিককে সরিয়ে নিলেন। তারপরও সোনার লোভ থেকে লোলুপ, অভাবীদের সরানো যায়নি। ১৯৯৩ সালে অসুস্থ একদল খনি শ্রমিক ‘হাকাসিমু’ নামের ভেনেজুয়েলার সীমান্তের ধারের প্রত্যন্ত ইয়ানোমাম্মি এক সমাজে জোর করে ঢুকে পড়লেন, তারা নরহত্যা চালালেন। পরে ব্রাজিলের এক আদালত ১৬ জন মানুষ, যাদের মধ্যে শিশু, তরুণ এবং বয়স্করাও আছেন– তাদের গণহত্যার দায়ে ও গ্রাম পোড়ানোর অভিযোগে অভিযুক্ত করে পাঁচ অপরাধীকে কারাদণ্ডে দণ্ডিত করলেন। গণহত্যার রায়টি ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্টও ২০০৬ সালে বহাল রাখলেন। এখনো সারা বিশ্বে গ্রামটি ‘হাকাসিমু ম্যাসাকার’ নামে পরিচিত। সেই বিচার বিশ্বের যেকোনো দেশের জন্যই গণহত্যার মামলা পরিচালনার বিরল উদাহরণ। মামলায় তার জনগোষ্ঠীর হয়ে আদালতে ওকালতিতে অন্যতম প্রধান ভূমিকা রেখেছেন কোপেনাওয়াল, অন্যতম প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবেও আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। এই মামলার পরের বছরই তিনি তাদের আরও সংগঠিত এবং উন্নত জীবনের দিকে নিয়ে গেলেন। ব্রাজিলে বসবাস করা ইয়ানোমাম্মি ১১ সমাজপতিকে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করলেন– ‘হুতুকারা ইয়ানোমাম্মি অ্যাসোসিয়েশন’। ইয়ানোমাম্মিদের ভাষায় হুতুকারার মানে– ‘যেখানে বিশ্বের জন্ম, সে জায়গার আকাশ’। তার পর থেকে অ্যাসোসিয়েশন দিনে দিনে বেড়ে উঠেছে তাদের পরিচর্যায়। তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই, জাতীয় পর্যায়ে অন্যদের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রে ইয়ানোমাম্মিদের জন্য বিরাট কণ্ঠস্বর ও প্রতিষ্ঠান হয়েছে। শুরু থেকেই কোপেনাওয়াল হুতুকারার প্রেসিডেন্ট হিসেবে সেবা দিচ্ছেন। হুতুকারার মাধ্যমে তাদের সমাজগুলোতে শিক্ষা ব্যবস্থা চালু হয়েছে, অন্যদের সঙ্গে দুর্গম এলাকার আদিবাসীদের এই মানুষদের যোগাযোগ শুরু হয়েছে। তিনি তাদের সংস্কৃতির রীতিনীতি মেনে বিরাট এলাকার জমিগুলোর জরিপ শেষ করেছেন। সরকার ও তাদের দলিল তৈরি করে দিয়েছেন। জমিগুলো অন্যদের হাত থেকে বাঁচাতে পরিকল্পনা করে দীর্ঘদিন তাদের কাজ করতে হয়েছে। আরও কয়েকবার ইয়ানোমাম্মিদের বেঁচে থাকার ভবিষ্যৎতিনি ঠিক করে দিয়েছেন। তিনি সংগঠনে এখন প্রতিজ্ঞা নিয়ে তরুণ হুতুকারা কর্মীদের তাদের ভূমি ও অধিকারের আদায়ের সংগ্রামে যুক্ত করতে কাজ করছেন। আদিবাসী গোষ্ঠীতে, আমাজনের বিরাট বনের গহিনে থেকেও লেখাপড়ার সঙ্গে সব সময় আছেন তিনি। বাইরের অ-ইয়ানোমাম্মি পৃথিবী সম্পর্কে সবসময় জানতে খুব ‘সিরিয়াস’; পশ্চিমের প্রযুক্তি ও ওষুধের জ্ঞান তীব্রভাবে তার সমাজগুলোতে ছড়িয়ে দিতে চান। তবে সেজন্য তাদের হাজার হাজার বছরের উপজাতীয় মূল্যবোধ এবং জ্ঞান যাতে হারিয়ে না যায়– সেদিকেও খুব জোর দেন। ১৯৭০ দশকে সেই যে লেখাপড়ার মাধ্যমে তিনি এই দুটি বিষয়ে আগ্রহী হয়েছেন সেই থেকে তার উদ্যোগে চালু হওয়া ইয়ানোমাম্মিদের সমাজে মূল্যবান ওষুধ তৈরি ও শিক্ষা প্রকল্পগুলো চলছে। এ কাজের জন্য ১৯৮৯ সালে প্রথম ‘রাইট লাইভলিহুড অ্যাওয়ার্ড’ সম্মান ও পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।
নব্বই দশকে স্বপক্ষের কমিশনকে নিয়ে চিকিৎসা সংগঠন ‘উরিহি’ করেছেন। সংগঠনটি তাদের স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে, তাদের মাধ্যমে ম্যালেরিয়াসহ অন্য সংক্রামক রোগগুলোর হার সাফল্যের সঙ্গে কমিয়ে এনেছে। স্বাস্থ্যকর্মীরা চিকিৎসকদের সরাসরি রোগীদের সমাজগুলোতে নিয়ে গিয়েছেন, ভ্যাকসিন দেওয়ার কাজ পরিচালনা করেছেন। প্রশ্ন ও সন্দেহ ছাড়াই অসাধারণ উদ্যোগ ও সেবাটি অনেক জীবন বাঁচিয়েছে। ম্যালেরিয়া, হাম, শ্বাস-প্রশ্বাসের রোগসহ অন্য রোগগুলোর মহামারি ঠেকিয়েছে। ২০০৪ সালে ‘ইয়ানোমাম্মি হেলথ কেয়ার’ নামেও পরিচিত প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব ব্রাজিলের সরকার নিয়ে নেয়। তখনই তিনি বলেছিলেন, ‘ইয়ানোমাম্মিদের জন্য এ দুর্ভাগ্য।’ ফলও হয়েছে তেমন– বিরামহীন অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও উপজাতি এই মানুষদের তাদের সমাজগুলো থেকে কয়েক মাসের জন্য জোর করে বাইরে বের করে আনা হয়েছে। তাতে আমাজনের ক্ষতি হয়েছে। তারপরও থেমে থাকেননি কোপেনাওয়াল। কমিশনের সমর্থন নিয়ে তাদের সংগঠন হুতুকারা একটি পাইলট প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করেছে। লক্ষ্য ছিল– তাদের ভাষার বর্ণমালা তৈরি করে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য তুলে ধরা, জাতীয় সমাজের সঙ্গে তাদের যোগাযোগে সক্ষম করে তোলা। ছোট প্রকল্পটি এখন অনেক ডালপালা মেলেছে। মাশরুম আকারে বৃত্তের মধ্যেই ১২টি সমাজে তারা লেখাপড়া শেখাচ্ছেন। শিশু-কিশোর, মেয়েরা শিক্ষিত হচ্ছে।
তারা আত্মার মাধ্যমে বাস করেন। তাদের জীবনযাপনে বিশ্বাসটি ও তেমন কাজ গুরুত্বপূর্ণ এবং মৌলিক। আলাদা পুরোহিত আছেন। আত্মার নানা রোগ ও ব্যথা কমানো, বিশ্বের উৎপত্তি, সৃষ্টি ও বিবর্তনের ব্যাখ্যা দেন তারা, স্বপ্নের ব্যাখ্যা করেন। উদ্ভিদ ও গাছপালা সম্পর্কে তাদের পূর্বপুরুষের যে জ্ঞান সেটির রক্ষক তারা। বিস্তৃত ও গভীর এই জ্ঞানগুলো পূর্বপুরুষের কাছে পাওয়া। তারা আত্মার ডাকে চলেন। তাদেরই একজন তিনি। বললেন, ‘আমাদের জ্ঞান ও পুরোহিত্যের মাধ্যমেই ইয়ানোমাম্মিরা কেবল আমাদের জন্য নয়, পুরো মানবতার জন্যই আমাজনকে সংরক্ষণের কাজ করছেন।’
কীভাবে তাদের বিশাল এই বনভূমিতে পরিবেশ সংরক্ষণ করতে হয়, ধরে রাখতে হয়- এই বিষয়ে ইয়ানোমাম্মি সমাজের জ্ঞান বিশ্বজুড়েই জীববৈচিত্র্যের ধ্বংস হওয়া ও জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে খারাপ প্রভাবগুলোর হাত থেকে বাঁচতে গুরুত্ব পেয়েছে। এখন নতুন জীবনও পেয়েছে তাদের ভাবনাগুলো। কাজের প্রধান পুরুষদের একজন দাভি কোপেনাওয়াল সতর্ক করেছেন সবাইকেই, ‘আমাজনের বনমালার ক্রমাগত ধ্বংস, বৈশ্বিক উষ্ণতা দিনে দিনে বাড়া এবং জলবায়ুর যে পরিবর্তন ঘটছে; সেটি মানবতাকে ধ্বংস করে দেবে।’ তিনি দুঃখ করেছেন, ‘আদিবাসী এই উপজাতির জ্ঞান এবং আমার মতো পুরোহিতদের শক্তি আমাজন ও এর উন্নত জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের মাধ্যমে সবার উপকারে ব্যবহার করা উচিত ছিল।’ তার এই ভাবনাগুলো ছড়িয়ে আছে একটি বইতে। প্রথম ইয়ানোমাম্মি হিসেবে বইটি লিখেছেন তিনি– ‘দ্য ফলিং স্কাই : ওয়ার্ডস অব অ্যা ইয়ানোমাম্মি শ্যামন (আকাশটি পড়ে যাচ্ছে : একজন ইয়ানোমাম্মি শ্যামনের কথা)।’ প্রকাশিত হয়েছে ২০১০ সালে। সারা দুনিয়ার সাধারণ মানুষদের মধ্যে আদিবাসীদের সম্পর্কে অনেক কুসংস্কার বদলে দিয়েছে। তুলে ধরেছে ইয়ানোমাম্মিদের মতো মানুষদের অধিকারগুলোকে সবার সম্মান করা ও আমাজনের বিরাট বনমালাকে সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে একজন ‘শ্যামন’র নির্বিকার অথচ ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ কৌফিয়ত। তারপর থেকে আলোচনায় আছে। লন্ডনের বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সাপ্তাহিক ‘দি নিউ সায়েন্টিস্ট’ ২০১৩ সালে বইটিকে বছরের অন্যতম সেরা বিজ্ঞান বইয়ের মর্যাদা দিয়েছে। পরেও আলোচনায় থেকেছে। অরণ্য বিনাশের ওপর লেখা বিশ্বের অন্যতম সেরা বইয়ের মর্যাদা পেয়েছে ব্রিটেনে দি গার্ডিয়ানের বিচারে ২০১৮ সালে। নির্বাচনটি করেছিলেন তাদের পরিবেশ সম্পাদক জন ভাইডাল। সম্মানজনক এই পুরস্কারটির খবর এমন এক সময়ে পেলেন কোপেনাওয়াল, যখন ফের হুমকি বাড়ছে ইয়ানোমাম্মি ও অন্য আদিবাসীদের ওপর। তার বদৌলতে আবার আমাজনের ওপর আন্তর্জাতিক মহল ও সম্প্রদায়ের দৃষ্টি পড়ল।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় কার্বন ডাই অক্সাইড গ্রহণ ও অক্সিজেন ত্যাগ এবং প্রাণী-উদ্ভিদকুলের এই রাজ্য নতুন করে বনের আগুনে পুড়তে লাগল ২০১৯ সালের আগস্টে। এই মাসেই ব্রাজিলের অংশে ৭৫ হাজারেরও বেশি দাবানল হয়েছে। পাশাপাশি তখন থেকে রাষ্ট্রপতি জায়ির বোসোনারুর শাসন আদিবাসীদের পুরনো অধিকারগুলো এবং জমির ওপর অধিকারের ওপর নতুন হুমকি বয়ে এনেছে। তিনি ঘোষণা করেছেন, আদিবাসীদের এক মিলিমিটার জায়গারও সীমানা তিনি নির্ধারণ করবেন না। সরকারিভাবে স্বীকৃত তাদের অঞ্চলগুলোর মালিকানা এবং অধিকার তিনি আবার বিবেচনা করবেন বলে হুমকি দিয়েছেন। সংকল্প করেছেন, জমির আকার আরও কমিয়ে দেবেন। ইয়ানোমাম্মিদের অভিযোগ, তিনি যেদিন থেকে দেশের দায়িত্ব নিয়েছেন, তাদের সমাজগুলোতে প্রচণ্ড আক্রমণ শুরু হয়েছে, সম্পত্তি ও ভূমির ওপর বাইরের শক্তিগুলোর আক্রমণ আশঙ্কা করার মতো হারে বাড়ছে। রাষ্ট্রপতির আন্তরিকতা নেই–এমন ভাষণ এবং জ্বালাময়ী বক্তৃতা পক্ষগুলোর মধ্যে মতের অমিল তৈরি করেছে। এরপর থেকে স্বর্ণ খনি শ্রমিক, লুটেরা ও বিরাট খামার গড়ে তুলতে আগ্রহীরা কোনো ধরনের ভয় না পেয়েই তাদের উৎসের ওপর ভীষণভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ছেন। স্বর্ণ খনিগুলোতে আক্রমণের গোপন চেষ্টা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এই কাজের ধারাবাহিক প্রভাবে একটি ইয়ানোমাম্মি সমাজের ৯০ ভাগ বাতাসই দূষিত হয়েছে–২০১৪ সালেই গবেষণায় জেনেছিলেন তারাসহ সবাই। অথচ এসব বন্ধে কোনোকিছুই কর্তৃপক্ষ করছেন না। একমাত্র ভূমিকা রেখেছেন দাভি কোপেনাওয়াল। পুরনো তেজোদ্দীপ্ত ভূমিকাতে ফিরেছেন। হুতুকারা ও অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা ইয়ানোমাম্মি সংগঠনগুলোকে উদ্যোগী করে বনমালাকে বাঁচাতে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। অবৈধভাবে খনিগুলো থেকে স্বর্ণ ওঠানোর ফলে এরই মধ্যে তাদের প্রধান চারটি নদী দূষিত হয়ে গিয়েছে বলে জানিয়েছে হুতুকারা। এই নদীগুলোই তাদের পানীয় জল ও মাছ জাতীয় খাবারের মূল উৎস।
অবস্থা ভীষণ সঙ্গীন পৃথিবীর ফুসফুসের রক্ষকদের। তাদের প্রধান নেতা সর্বশেষ লড়াইয়ের শপথ করেছেন–আমি আমার মানুষদের অধিকার আদায়ের লড়াই চালিয়ে যাব। আমাদের ভূমি, ভাষা, স্বাস্থ্য, প্রথা, অভ্যাস, বনমালা ও জীবনের ওপর পৌরহিত্য এবং আর সবকিছুর জন্যই লড়ব। হুতুকারা ইয়ানোমাম্মি, রাজনীতিবিদ, খনি শ্রমিক, খামারি এবং অন্য যারা এই বনে চুরি করতে চান তাদের হাত থেকে আমাদের জমিগুলোকে হুতুকারা বাঁচাবে। আমাদের যেটুকু জ্ঞান, পুরোটাই বনের জমির ওপর। ফলে যুদ্ধ আমি থামাতে পারি না। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমাজনের জন্য লড়ব।’
(এবারের রাইট লাইভলিহুড অ্যাওয়ার্ডে দেওয়া তার ভাষণ)
