বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যার ৩৮ ঘণ্টা পর গতকাল বিকেল ৫টায় প্রথম ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, আবরারের হত্যার ঘটনা জানার পরও উপাচার্য তাৎক্ষণিক কোনো পদক্ষেপ নেননি, ৩৮ ঘণ্টা ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেননি, আবরারকে দেখতে তার হলে যাননি, এমনকি বুয়েট ক্যাম্পাসে আবরারের জানাজাতেও অংশ নেননি উপাচার্য।
উপাচার্যের এমন ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ঘটনার পর থেকেই সরব রয়েছেন শিক্ষার্থীরা। বিকেল ৫টার মধ্যে উপাচার্যকে ক্যাম্পাসে আসার আল্টিমেটাম দিয়েছিলেন শিক্ষার্থীরা। সে অনুযায়ী বিকেলে ক্যাম্পাসে এলে শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পড়েন তিনি। ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে শিক্ষার্থীদের বেশিরভাগ দাবি নীতিগতভাবে মেনে নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া সত্ত্বেও শের্ষ পযন্ত তা মেনে নেননি শিক্ষার্থীরা। অবরুদ্ধ করেন উপাচার্যকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, আবরার হত্যার পর উপাচার্য ক্যাম্পাসে আসেননি। কোনো সংবাদমাধ্যমে তিনি কথাও বলেননি। এ ছাড়া এ ঘটনার বিষয়ে তিনি কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি বা বক্তৃতা দেননি। তাই আমরা আবরার হত্যার বিচারের সঙ্গে সঙ্গে উপাচার্যের এমন অনুপস্থিতি এবং কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ার ব্যাপারে তার জবাবদিহির দাবি করেছি। একই সঙ্গে তার পদত্যাগ দাবি করছি।
এর আগে ক্যাম্পাসে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা উপস্থিত হয়ে উপাচার্যকে গতকাল বিকেল ৫টার মধ্যে ক্যাম্পাসে এসে জবাবদিহিতার দাবি জানান তারা। পরে বিকেল ৫টায় নিজ কার্যালয়ে প্রবেশ করেন উপাচার্য। এর ৩০ মিনিট পর শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনায় না বসায় তাকে অবরুদ্ধ করা হয়। একপর্যায়ে উপাচার্য বের হয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় তিনি শিক্ষার্থীদের সকল দাবি নীতিগতভাবে মেনে নেওয়া হয়েছে বলে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে জানান। তার বক্তৃতায় আবরার ফাহাদের মৃত্যুর ঘটনাকে তিনি নিঃসন্দেহে ‘খুন’ বলে আখ্যায়িত করেন।
এ সময় উপাচার্য শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, ‘তোমরা যা দাবি দিয়েছ তোমাদের দাবির সঙ্গে অ্যাগ্রি করছি। আমরা নীতিগতভাবে সব দাবি মেনে নিচ্ছি।’ এ সময় শিক্ষার্থীরা উপাচার্যকে দাবিগুলো পড়ে শুনিয়ে ঠিক কোন দাবিগুলো মানা হলো তা জানতে চাইলে তিনি এড়িয়ে চলে যেতে চান। ‘হত্যার ঘটনা জানার পরও এত সময় পার হয়ে যাওয়ার পর কেন তিনি ক্যাম্পাসে এলেন’ শিক্ষার্থীরা এর জবাব চাইলে উপাচার্য সন্তোষজনক উত্তর না দিয়ে বলেন, ‘আমি সারা দিন মন্ত্রী মহোদয়ের (শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি) সঙ্গে যোগাযোগ করেছি, মিটিং করেছি। এগুলো না করলে দাবিগুলোর সমাধান হবে কীভাবে। সব তো আমার হাতে নেই।’
এমনকি আবরারকে হত্যার সে রাতে (রবিবার রাতে) হলে পুলিশের প্রবেশ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। এ সময় তারা উপাচার্যের কাছে জানতে চান, প্রক্টর ও ভিসির অনুমতি ছাড়া পুলিশ কীভাবে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে? এ প্রশ্নের উত্তরে ‘আমি জানি না’ বলে মন্তব্য করলে শিক্ষার্থীরা ক্ষুব্ধ হয়ে উপাচার্যবিরোধী স্লোগান দিতে থাকেন।
এ সময় শিক্ষার্থীরা এ প্রশ্ন তোলেন যে ‘ছেলের জানাজায় আসার জন্য পাঁচটা মিনিট সময় আপনার হলো না’। শিক্ষার্থীদের এমন আবেগী প্রশ্নের কোনো উত্তর দেননি উপাচার্য।
এ সময় শিক্ষার্থীদের আলাদা ডেকে নিয়ে কথা বলার প্রস্তাব দিলে উপাচার্যের সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন শিক্ষার্থীরা। পরে ‘ভুয়া ভুয়া’ বলে স্লোগান দেন আন্দোলনকারীরা। পরে উপাচার্য তার কার্যালয়ে প্রবেশ করলে কার্যালয়ের গেটে তালা মেরে তাকে অবরুদ্ধ করেন শিক্ষার্থীরা। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত গতকাল মঙ্গলবার রাত ৯টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত উপাচার্য অবরুদ্ধ ছিলেন। সাড়ে ৪ ঘণ্টা পর তিনি মুক্ত হন।
উপাচার্য অত্যন্ত দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছেন বলে মন্তব্য করেছেন নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে গতকাল বিকেলে বুয়েট ক্যাম্পাসে গিয়ে তিনি উপাচার্যের পদত্যাগ দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘তার (উপাচার্যের) উচিত হবে পদত্যাগ করা অথবা সরকারের উচিত হবে তাকে সরিয়ে দেওয়া।’
এর আগে গতকাল সকালে সরেজমিনে ভিসির কার্যালয় ঘুরে দেখা যায়, কার্যালয়ের নিচে একজন নিরাপত্তা প্রহরী দাঁড়িয়ে আছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘পূজার ছুটি থাকায় স্যার (ভিসি) গত দুদিন ক্যাম্পাসে আসেননি।’ ভিসির কার্যালয়ের পাশের ভবনের আরেকজন নিরাপত্তা প্রহরী জানান, গত দুই দিন ধরে ভিসিকে তিনি ক্যাম্পাসে দেখেননি। এর আগে সেতুমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ‘ভিসি অসুস্থ’ বলে জানিয়েছিলেন।
জানা গেছে, ভিসি অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বরাদ্দকৃত বাসভবন বাংলোতে থাকেন না। তিনি লালবাগে তার নিজ বাসায় থাকেন।
