আবুল কাসেম ফজলুল হক
সাবেক অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
রাজনীতির নামে দেশে যা চলছে তা দুর্বৃত্তায়ন। দুর্নীতিগ্রস্ত জাতীয় রাজনীতির প্রভাব ছাত্র সংগঠনগুলোর ওপর পড়েছে। ছাত্রলীগে রাজনীতির বিন্দুমাত্র চর্চা নেই। একই অবস্থা বাকি ছাত্র সংগঠনগুলোতেও। তবে তারা সুযোগের অভাবে আপাতত কিছু করছে না। ১৯৫২ সালে মাত্র একজন ছাত্র আবুল বরকত পুলিশের গুলিতে নিহত হন। পরদিন গোটা দেশে প্রতিবাদ মিটিং মিছিল হয়। তখন ছাত্রদের রাজনৈতিক আদর্শ ছিল। স্বাধীনতা আন্দোলনে ছাত্র সমাজের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে স্বাধীনতার আগের ছাত্ররাজনীতির আদর্শ বর্তমানে ছিটেফোঁটাও নেই। এর প্রধান কারণ দুর্নীতিগ্রস্ত জাতীয় রাজনীতি। এটা দেশকে ভয়ানক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিয়েছে। ক্যাম্পাসসহ সর্বত্র এর ধাক্কা লেগেছে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ছাত্রলীগ অতীতেও হিংস্র রাজনীতি করেছে, এর ধারাবাহিকতা বর্তমানেও অব্যাহত রয়েছে।
আবরার হত্যায় খুনিদের শাস্তি চাই, বিচার চাই বলে আন্দোলন হচ্ছে। আসলে ভালো করে বিচার করবার ক্ষমতা আমাদের বিচার বিভাগের নেই। এর আগেও ছাত্রলীগের হাতে অনেক শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে, সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি মারা গেছে। একটারও কি বিচার হয়েছে? এজন্য মানুষ বিচার চাই, বিচার চাই বলে আওয়াজ তুলছেন। ন্যায়বিচার যে হয় না এটা আমরা সবাই বুঝতে পারলেও বলছি না। দীর্ঘ সময় ধরে তদন্ত হবে, চার্জশিট দেবে, ট্রায়ালে যাবে আসল কাজ হবে না। হলেও এসব সাময়িক ব্যবস্থা। এগুলো করে ছাত্রলীগের দুর্বৃত্তায়ন বন্ধ করা যাবে না। দেশের সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয় একটা ভাঙা মোটরগাড়িতে পরিণত হয়েছে। যখনই নষ্ট হচ্ছে সাময়িক বিধান দিয়ে ভালো করবার চেষ্টা হচ্ছে। আসল কথা হচ্ছে রাজনৈতিক স্বাস্থ্যের উন্নতি না হলে এসব কোনোকিছুই কাজে আসবে না। এই রাজনৈতিক স্বাস্থ্যের উন্নতি কীভাবে ঘটানো যায় সে আলোচনা ধরাছোঁয়ার বাইরে। বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, গণমাধ্যম মুখে কুলুপ এঁটে আছে। তারা কেউই এ বিষয়ে মন্তব্য করে বিপদে পড়তে চান না।
আমাদের ভিসি সাহেবরা নিয়োগ পান এক ধরনের অস্থির প্রশাসন চালাবার জন্য। ফলে তাদের অসফল বলা যাবে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিয়োগ পেয়ে ছাত্রলীগ নিয়ে অফিসে ঢোকেন। তার প্রটোকল দেয় ছাত্রলীগ। কারণ তিনি জানেন তাকে যারা নিয়োগ দিয়েছে ছাত্রলীগ তাদের লোক। ফলে তাদের অখুশি রাখা যাবে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা নির্বাচন হয়ে গেছে তার আগে যেভাবে জাতীয় নির্বাচন হয়েছে ঠিক তার মতো। একইভাবে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও নানা অপকর্ম চলছে। এর কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিরা ছাত্রলীগকে পুলিশের কাজে ব্যবহার করছেন। বুয়েটের ঘটনায় প্রশাসন যথেষ্ট খারাপ না হলে এরকম হওয়ার কথা ছিল না। হলের মধ্যে ছাত্রলীগ টর্চার সেল চালাচ্ছে এগুলো দেখভাল করা তাদের দায়িত্ব ছিল। এরপরও আমি এককভাবে কর্র্তৃপক্ষকে দায়ী করতে রাজি নই। কেননা জাতীয় রাজনীতি এতটাই নিচে নেমে গেছে যে গোটা জাতিকে টেনে নিচে নামিয়েছে।
বুয়েটের ছাত্ররা সাময়িক অস্থিরতায় ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ চাইছে কারণ তারা রাজনীতি বলতে খুনোখুনি ব্যবস্থা দেখতে পাচ্ছে। এ জন্য চাইছে। তবে খুনিখুনি তো রাজনীতি নয়। কাজেই এই দাবির সঙ্গে বুদ্ধি-বিবেচনা নেই। আমি যেটা বারবার বলতে চাইছি রাজনৈতিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটাতে হবে। সর্বক্ষেত্রে যে একদলীয় রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন জন্ম দেওয়া হয়েছে সেখান থেকে আওয়ামী লীগকে বেরিয়ে আসতে হবে। আমি সরকার উৎখাতের কথা বলছি না। আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক দলের আচরণ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীকে বুঝতে হবে তার দলের লোকজন রাজনীতির নামে যা করছে সেটা কোনো ব্যাখ্যায় রাজনীতির মধ্যে পড়ে না। ছাত্রলীগের আচরণে যে ঘুণ ধরেছে তার পরিবর্তন এখনই দরকার। না হলে সামনে দেশের অন্য ক্যাম্পাসগুলোও অস্থির হয়ে উঠবে। ফলে সব মানুষের দাবি একটাই হওয়া উচিত রাজনীতির উন্নতি চাই, রাজনীতির উন্নতি চাই, রাজনীতির উন্নতি চাই।
