প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে যারা ‘পিটিয়ে পিটিয়ে অমানবিকভাবে’ হত্যা করেছে, তাদের কঠিনতম শাস্তি হবে। তিনি বলেন, কেউ যদি কোনো অপরাধ করে, সে কোন দল করে, কী করে, তা আমি দেখি না, অপরাধী অপরাধীই। বুয়েটে এই ঘটনা যখন ঘটে, সকালে শুনে আমি সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছিলাম আলামত সংগ্রহ করতে, সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করতে। ছাত্ররা নামার আগেই আমরা তৎপরতা শুরু করি। কে ছাত্রলীগ বা কী জানি না। অপরাধী অপরাধীই, অন্যায়কারীর বিচার হবে।’
গতকাল বুধবার বেলা সাড়ে ৩টায় গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র সফর নিয়ে এই সংবাদ সম্মেলন ডাকা হয়। সংবাদ সম্মেলনে সম্প্রতি ভারতের
সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি, ফেনী নদীর পানি, এলপিজি রপ্তানি, ত্রিপুরাকে চট্টগ্রাম বন্দর ও বিমানবন্দর ব্যবহারের প্রস্তাব, রোহিঙ্গা ও আসামের নাগরিকপঞ্জি নিয়ে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের বিষয় তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
সংবাদ সম্মেলনে আবরার ফাহাদ হত্যা এবং ছাত্ররাজনীতি নিয়েই বেশি প্রশ্ন করা হয়। বুয়েটে আন্দোলনরত শিক্ষার্থী এবং সাবেক শিক্ষক ও শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে তাদের ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের বিষয়টি এলে শেখ হাসিনা সামগ্রিকভাবে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের বিপক্ষে মত দেন।
আবরার ফাহাদ হত্যা প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘আমি তো বলেছি, ঘটনার সঙ্গে জড়িত কোথায় কে ছিল সব কয়টাকে গ্রেপ্তার করতে। তবে পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করার পর সেটা আনতে দেবে না। আমার মনে প্রশ্ন দেখা দিল, এটা কেন? হত্যাকারীদের কেউ কি এর মধ্যে আছে যে ফুটেজ প্রকাশিত হলে তাদের পরিচয় বের হয়ে যাবে কি না। পরে তারা ফুটেজ নিয়ে এলো এবং কর্তৃপক্ষকে একটা কপি দিয়ে এলো।
তিনি বলেন, ‘একটা বাচ্চা ছেলে, ২১ বছর বয়স। তাকে হত্যা করা হলো। মারা হলো পিটিয়ে পিটিয়ে। কী অমানবিক। পোস্টমর্টেম রিপোর্টটা দেখেছি। সব ইনজুরি ভেতরে।’ তিনি বলেন, ‘একটা কথা আমার মাথায় এলো। ২০০১ সালে আমাদের নেতাকর্মীদের হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। মারা হতো এমনভাবে যাতে বাইরে থেকে বোঝা যেত না।’
আওয়ামী লীগের সভাপতি বলেন, ‘যারা এ ধরনের ঘটনা ঘটাবে তারা আমার পার্টির এটা আমি কখনই মেনে নেব না। আমি সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রলীগকে ডেকেছি। তাদের বহিষ্কার করতে বলেছি, পুলিশকে বলেছি অ্যারেস্ট করতে। ছাত্ররাজনীতিতে, এই বুয়েটে আমাদের অনেক নেতাকর্মীকেও তো হত্যা করা হয়েছে। কেউ কোনো দিন বলেছে, কেউ অ্যারেস্ট হয়েছে? এটা করা হয়নি। আমি ক্ষমতায় আসার পর চেষ্টা করেছি সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ স্বাভাবিক করতে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘মাস্তানি’ চলবে না : শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘মাস্তানি’তে জড়িতদের ধরতে সারা দেশের সব কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তল্লাশির কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। এই অভিযানে কারও দলীয় পরিচয় দেখা হবে না বলেও হুঁশিয়ার করেছেন তিনি। শেখ হাসিনা বলেন, ‘প্রত্যেকটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রতিটি হল; শুধু ঢাকা না, সারা বাংলা দেশে প্রত্যেকটা জায়গায় সার্চ করা হবে। সেই নির্দেশটাও আমি দিয়ে দেব।’
উপস্থিত সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘এখানে আমি আপনাদের মাঝেই বলে দিচ্ছি, সেটা করব করব। আপনাদের সহযোগিতা চাই। আপনারা বের করে দেন যে, কোথায়, কারা এই ধরনের অনিয়ম, উচ্ছৃঙ্খলতা করছে। কোনো দল-টল আমি বুঝি না। পরিষ্কার কথা, কোনো দল আমি বুঝি না।’
সরকারপ্রধান বলেন, ‘সামান্য টাকায় সিট ভাড়ায় একেকজন রুমে থাকবে আর তারপর সেখানে বসে এই ধরনের মাস্তানি করবে আর সমস্ত খরচ বহন করতে হবে জনগণের ট্যাক্সের পয়সা দিয়ে। সেটা কখনো গ্রহণযোগ্য নয়। সারা দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রতিটি হল সব জায়গায় সার্চ করা হবে এবং দেখা হবে সেই নির্দেশ দিয়ে দেব।’
তল্লাশি চালানোর ব্যাপারে শেখ হাসিনা সাংবাদিকদের সহযোগিতা চেয়ে বলেন, ‘কোথায় অনিয়ম, উচ্ছৃঙ্খলতার মতো কর্মকা- কারা করছে। কোনো দল-টল আমি বুঝি না।’
বুয়েট চাইলে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করতে পারে : শেখ হাসিনা বলেন, বুয়েট যদি মনে করে ছাত্ররাজনীতি ব্যান করে দিতে পারে। এটা তাদের ব্যাপার। তবে ছাত্ররাজনীতি পুরোপুরি বন্ধের বিপক্ষে মত দেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেকোনো আন্দোলন-সংগ্রামে ছাত্ররাই মুখ্য ভূমিকা নিয়েছে। তবে বুয়েট যদি মনে করে ছাত্ররাজনীতি ব্যান করে দিতে পারে। এটা তাদের ব্যাপার। তবে ছাত্ররাজনীতি পুরো নিষিদ্ধের কথা তো মিলিটারি ডিক্টেটরের কথা বলে মন্তব্য করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারাই এসে এটা নিষিদ্ধ করে, সেটা নিষিদ্ধ করে।
এ সময় তিনি ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তুলে ধরে বলেন, ছাত্রলীগ সব সময় একটি স্বাধীন স্বতন্ত্র সংগঠন ছিল। তবে নীতি-আদর্শের প্রশ্নে মূল দল তো কিছু দিকনির্দেশনা দেবেই। জিয়াউর রহমান আসার পর নষ্ট রাজনীতি শুরু হয়েছে, যেটা করছিলেন আইয়ুব খান। ছাত্র সংগঠনগুলোকে মূল দলের অঙ্গসংগঠন করা হয়। শেখ হাসিনা বলেন, নেতৃত্ব উঠে এসেছে ছাত্র নেতৃত্ব থেকে। রাজনীতি শিক্ষার ব্যাপার, ট্রেনিংয়ের ব্যাপার। আমি নিজেই ছাত্ররাজনীতি করে এসেছি। দেশের ভালো-মন্দের চিন্তা তখন থেকেই আমার তৈরি হয়েছে। এজন্য তিনি দেশের মানুষের ভালো-মন্দ দেখতে পারছেন বলেও মন্তব্য করেন সরকারপ্রধান । তিনি বলেন, একটা ঘটনার (আবরার হত্যাকা-) কারণে পুরো ছাত্ররাজনীতিকে দোষারোপ করা ঠিক হবে না।
দেশের স্বার্থ শেখ হাসিনা বিক্রি করবে, এটা হতে পারে না : ভারতের সঙ্গে গ্যাস নিয়ে চুক্তি বিষয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, দেশের স্বার্থ শেখ হাসিনা বিক্রি করে দেবে এটা কখনো হতে পারে না। তিনি বলেন, আমরা বিদেশ থেকে এলপিজি এনে প্রক্রিয়াজাত করে ভারতে রপ্তানি করব। এটা প্রাকৃতিক গ্যাস নয়। অন্য পণ্য যেমন আমরা রপ্তানি করি ঠিক তেমন। এটা নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির কিছু নেই। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এলপিজি আমাদের দেশে উৎপন্ন হয় না। এখন এই গ্যাস আমরা আমদানি করছি। রান্নায় সিলিন্ডারে সরবরাহ করছি। আগে স্বল্প পরিমাণে আমাদের এলপিজি উৎপাদন হতো। আমদানি করা গ্যাস গ্রামে বিভিন্ন কোম্পানি সরবরাহ করছে। আগে ১০ কেজির সিলিন্ডার ১৬০০ টাকা দাম পড়ত। বাজার উন্মুক্ত করে দেওয়ায় এখন ৯০০ টাকা। এখন অনুমোদিত ২৬টি কোম্পানি কাজ করছে।
সরকারপ্রধান আরও বলেন, আমরা ত্রিপুরায় যে গ্যাস দিচ্ছি সেটি এলপিজি। আমাদের দেশে যেমন সরবরাহ করছি সেটিই ত্রিপুরায় দিচ্ছি। যারা এর বিরোধিতায় সোচ্চার মানে বিএনপি। আমি ২০০১ সালের কথা মনে করিয়ে দিতে চাই। আমেরিকা গ্যাস বিক্রির জন্য বলেছিল, আমি বলেছিলাম দেশের চাহিদা মিটিয়ে আমরা তারপর বিক্রি করব। যে কারণে ২০০১ সালে আমরা ক্ষমতায় আসতে পারিনি। আর যারা গ্যাস বিক্রি করে দিচ্ছে বলেছে তারাই গ্যাস দেবে বলে মুচলেকা দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল।
ত্রিপুরাকে চট্টগ্রাম সমুদ্র ও বিমানবন্দর ব্যবহারের প্রস্তাব দিয়েছি :
শেখ হাসিনা বলেন, ভারতের ত্রিপুরাকে চট্টগ্রাম বিমানবন্দর ও চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছি, ত্রিপুরাকে যোগাযোগ সুবিধার জন্য চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর এবং চট্টগ্রাম বিমানবন্দর ব্যবহারের প্রস্তাব দিয়েছি। তারা আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের জন্য চট্টগ্রাম বিমানবন্দর ব্যবহার করতে পারে। ত্রিপুরাকে পানি দেওয়ার যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী বলেন, ত্রিপুরা এ দেশের সমুদ্র ও বিমানবন্দর ব্যবহার করলে আমরা বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হব।
তিনি বলেন, যেটাই করছি তাতে দেশ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ত্রিপুরাবাসীকে ফেনী নদীর যে পানি দেওয়া হচ্ছে, তা হচ্ছে খাবার পানি। কেউ খাবার পানি চাইলে, তা যদি না দেই, সেটা কেমন হয়! তিনি বলেন, ত্রিপুরা আমাদের ঐতিহাসিক বন্ধু। মুক্তিযুদ্ধে ত্রিপুরার মানুষ আমাদের আগলে রেখেছে। মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা করেছে। সেই ত্রিপুরায় সামান্য খাবার পানি দেওয়ার জন্য আপত্তি থাকতে পারে না। মাত্র ১ দশমিক ৮২ কিউসেক পানি নেবে তারা। আমরা যে পানি দিচ্ছি, তার পরিমাণ অত্যন্ত নগণ্য। এটা নিয়ে কেন এত চিৎকার, আমি জানি না।
