নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা অতীশ দীপংকরের পৃথিবী

আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০১৯, ১০:৩২ পিএম

“পৃথিবীতে ‘প্রেম’ নামক একটি শব্দমাত্র আছে ভগবান। কিন্তু তার বাস্তব অর্থ নেই। সংগ্রাম আছে, ক্ষুদ্র সুখ আছে, বিপুল দুঃখ আছে, অভিযান আছে, রাজ্য জয় আছে, কিন্তু ‘প্রেম’ নেই। হৃদয়ে হৃদয়ে সংযোগ সাধনের কোনো সূত্র নেই, তন্তু নেই, জরাবেষ্টিত পৃথক পৃথক রক্ত কুমুদের মতো মানুষ্যকুল ও জীবকুলের হৃদয়গুলো বিচ্ছিন্নভাবে সংসারের জলতলে ভাসমান।” অতীশ দীপংকর

ড্রাগন অঙ্কিত একটা কাঠের বাক্সে পাওয়া একটা পুঁথি, একটা জপমালা আর একটা দেবী মূর্তিকে ঘিরে ঔপন্যাসিক সন্মাত্রানন্দ এগোচ্ছেন সেই পাল আমলের পাল বংশের দুই কীর্তিমান সম্রাট মহীপাল ন্যায়পালের সময়টা ধরে শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্করের খোঁজে। নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা একটি ইতিহাস আশ্রয়ী উপন্যাস। হাজার বছরের বিস্মৃতপ্রায় অভিযাত্রী পণ্ডিত অতীশ দীপঙ্করের জীবন-ইতিহাস এ উপন্যাসের আশ্রয় কিন্তু বিষয় নয়। এ উপন্যাসের বিষয় চিরন্তনী নারীসত্তা। যে নারীসত্তা যুগে যুগে মানুষকে জয় করার, অগ্রসর হওয়ার, উৎসর্গ করার, পরিত্যাগ করার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। অথচ যে নারীসত্তা অন্তহীন কাল ধরে প্রেমে, দাম্পত্যে, বাৎসল্যে জীবনকে লালন করেছে। জন্মজন্মান্তর ধরে পৃথিবীর ধুলাপথে ফিরে ফিরে এসেছে। কখনো সে নারীসত্তার নাম কুন্তলা, কখনো স্বযংবিদা, কখনো বা জাহ্নবী। যারা এই উপন্যাসের বিষয়বস্তু। তিব্বতি পর্যটক চাগ লোচাবা বিক্রমপুরের বজ্রযোগিনী গ্রামে যে শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপংকরের খোঁজ করছিলেন, সে খোঁজ পুঁথিপত্রের বাইরের এক মানুষের। লোচাবার মাতৃভূমিতে দীপংকর দেবতা রূপে পূজিত হন, কিন্তু তিনি খুঁজছিলেন একজন রক্তমাংসের মানুষকে। আর বজ্রডাকিনী স্বয়ংবিদা বা কখনো কুন্তলারূপী নারী সন্ধান দিচ্ছেন বয়ঃসন্ধিকালের পরিণতমনস্ক দীপংকরের। মানুষে মানুষে জাতিভিত্তিক, সামাজিক অবস্থানভিত্তিক উচ্চ-নীচ ভেদ ও শ্রেণিবৈষম্য দেখে বাল্যকালেই দীপংকর বেদনাহত হয়েছেন। তার পিতা চন্দ্রবংশীয় রাজা। কিন্তু রাজপুত্র হয়েও তিনি সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে মিশতেন। কিন্তু না রাজা, না প্রজা কেউ তার এরকম ব্যবহার অনুমোদন করেননি। বিশেষ করে তার পিতার প্রাসাদে সামান্য দৌবারিকের কন্যা কুন্তলার সঙ্গে তার সখ্য বজ্রযোগিনী গ্রামের জনতার কাছে প্রথমে আপত্তিকর ও পরে রসালাপের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। সামাজিক এই কুৎসার হাত থেকে পুত্রকে রক্ষা করার জন্য দীপংকরের পিতা কল্যাণশ্রী পুত্রকে কৃষ্ণগিরিবিহারে আচার্য রাহুলগুপ্তের কাছে বজ্রযানতন্ত্র শিক্ষার জন্য পাঠিয়েছিলেন। যদিও তন্ত্রে তার প্রথম অভিষেক শিক্ষা তার

পিতৃদেবই দিয়েছিলেন। অথচ দীপংকর কখনো কুন্তলাকে প্রণয়িণীরূপে কল্পনাই করেননি। বহুকাল পরে অদ্বয়বম্র যখন কুন্তলাকে দীপংকরের সাধন সঙ্গিনীরূপে গ্রহণের প্রস্তাব দেন, তখন দীপঙ্কর বেশ আহত স্বরে বলেন, ‘সে কী করে হয় আচার্য্য! আমি তাকে কখনো প্রণয়িণীরূপে কল্পনাই করিনি। আমি তাকে পিতারূপে কল্পনা করতাম।’ কুন্তলার পিতা যদিও ব্রাহ্মণ ছিলেন, তবুও কী এক কারণে সমাজ পতিত হন। রাজগৃহে দৌবারিকের কাজ গ্রহণ করেন। কর্মস্থলে প্রতিপদে তাকে তিরস্কৃত হতে দেখে দীপংকর কল্পনা করতেন যেন তিনিই সেই তিরস্কৃত দৌবারিক। আর তার মনোব্যথার সঙ্গে একাত্ম হতে গিয়ে তিনি নিজেকে কুন্তলার পিতার আসনে বসিয়েছিলেন। কুন্তলার প্রতি তার বাৎসল্য ছিল, প্রণয় না। অবধূত দীপংকরের এই মনোভাব দেখে বিমুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন, ‘তুমি কী বিচিত্র ধাতুতে নির্মিত যুবক! যে বয়ঃক্রমে কিশোর বয়স্করা প্রণয়াকাক্সক্ষী হয়, সেই বয়সে তুমি অপার্থিব উপায়ে বাৎসল্য অনুভব করেছ। বাৎসল্য তো পরিণত বয়সেই সমুদিত হয়।’ তিব্বতের নৈতিক জীবনের মেরুদণ্ড যখন একেবারে ভেঙে পড়েছিল, অনাচার, ব্যভিচার, যখন চরম আকার ধারণ করেছে উপরন্তু পূর্বাচার্য পদ্মসম্ভব, শান্তরক্ষিত কমলশীলের দ্বারা প্রচারিত বৌদ্ধতন্ত্র যখন প্রাচীন পোন্ বা বনধর্মের সঙ্গে মিশে এক বিকট বীভৎস রূপ ধারণ করেছিল তখন তিব্বতের মহারাজা লাহ্ লামা এশেওদ বৌদ্ধ ধর্মের বিশুদ্ধ রূপটি পুনরুদ্ধরের জন্য, তার বিশেষ দূত বীর্যসিংহকে ভারতবর্ষে পাঠান জ্ঞানশ্রী অতীশ দীপংকরকে সে দেশে নিয়ে যেতে। বিক্রমশীল মহাবিহারের উপাধিবারিক দীপংকর শ্রীজ্ঞানের সুবিপুল পাণ্ডিত্য, অজেয় প্রতিভা এবং দুর্দমনীয় সাহসের কথা এশেওদ শুনেছিলেন। তখনই তিনি ভেবেছিলেন, কীভাবে দীপংকর শ্রীজ্ঞানকে তিব্বতে ধর্ম ও সমাজ সংস্কারের জন্য আমন্ত্রণ জানানো যায়! অতঃপর তিনি অধ্যয়ন ও অধ্যাপনাতে আগ্রহী দূত বীর্যসিংহকে একশত পরিচারক ও উপঢৌকন স্বরূপ বিপুল সুবর্ণ দিয়ে দীপংকরকে আমন্ত্রণ জানাতে পাঠান। দেবভাষা ও স্বধর্মশিক্ষার এ অপূর্ব সুযোগ পেয়ে বীর্যসিংহও সানন্দে এ দায়িত্ব পালনে ব্রতী হন। কিন্তু দীপংকর তার এ নিমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, ‘আপনার বার্তা থেকে এইমাত্র প্রতীত হচ্ছে, তিব্বত গমনে ব্যক্তিগত স্তরে আমার দুটিমাত্র উদ্দেশ্য চরিতার্থ হবে। প্রথম, এই বিপুল সুবর্ণ সম্পদ লাভ; দ্বিতীয়, আপনাদিগের দেশে পূর্বাচার্য শান্তরক্ষিত, পদ্মসম্ভব ও কমলশীলের মতো আমাকেও আপনাদের দেবতা বিশেষে পরিণত করবেন। জীবিতাবস্থায় প্রচুর যশ এবং মৃত্যুর পর প্রচুর পূজা আমি পাব। সম্প্রতি না সুবর্ণ না খ্যাতি কোনো কিছুরই বাসনা আমার নেই।’

তথাপি বহুকাল পর বহু সংঘর্ষ, সংঘাত, যুদ্ধবিগ্রহের পর দীপংকরকে যেতে হয়েছিল তিব্বতে। ধর্ম সংস্কারের উদ্দেশ্যে। যা আমরা উপন্যাসে দেখতে পাব। মধ্য তিব্বত বিশেষ করে সাঙ্ ও সামিয়ে বিহারে দীর্ঘ প্রচারকার্যের পর লাসার দক্ষিণে নেথাং বিহারে অতীশ তার জীবনের অবশিষ্ট দিনগুলো অতিবাহিত করেন। ব্রোম্ তোন্ পা অতীশের শিক্ষায় অনুপ্রাণিত হয়ে কাদম্পা সম্প্রদায়ের জন্ম দিলেন। কাদম্পা থেকে পুনরায় নির্মিত হলো গেলুক্পা সম্প্রদায়। তিব্বতীয় ধর্মগুরু দালাইলামা এই সম্প্রদায়েরই উত্তরাধিকারী। অতীশের স্বদেশ ভারতবর্ষ থেকে কালক্রমে প্রধান বৌদ্ধ বিহারগুলো মুছে গেল। নালন্দা, ওদন্তপুরী, জগদ্দল, বিক্রমশীল ঝরে গেল একদিন। সময়ের পরিহাসে তিব্বত একদিন চীনের দ্বারা আক্রান্ত হলো। ভেঙে ফেলা হলো অগণিত বিহার। পুড়িয়ে ফেলা হলো ধর্মগ্রন্থরাজি। নির্মম অমানবিক অত্যচার করা হলো তিব্বতীয় শ্রমণ শ্রমণাদের ওপর। চতুর্দশ দালাইলামা ভারতে শরণার্থী হয়ে চলে যেতে বাধ্য হলেন। এইসব পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে মানুষ তবু নিজেকেই খুঁজেছে। তার এই অন্বেষণ ফুরায় না। মৃন্ময় প্রতিমা, দারুমূর্তি আর ধাতব আইকন খুলে ধরেছে অতীশ চরিতের বহুবিধ বাতায়ন। তবু শেষ পর্যন্ত কাঠ, পাথর বা ধাতু নয়, দীপংকর এক রক্তমাংসের মানুষ। এক বাৎসল্যকরণ হৃদয়, জীবনব্যপী অন্বেষার এক ধ্রুব অর্থ।

লেখক সান্মাত্রনন্দের দৃষ্টিতে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ বস্তুত একই সমতলে অঙ্কিত পরস্পরচ্ছেদী তিন বৃত্তের মতন। সময়ের তিনটি স্তর, ইতিহাসের তিনটি যুগ এ কাহিনীতে বারবার উঠে এসেছে। তবে আলাদা আলাদা এই যুগ বোঝা যাবে এর ভিন্ন ভিন্ন ভাষা আর বানানরীতির প্রয়োগ দেখে। গবেষণাধর্মী এই উপন্যাসে বৌদ্ধ দর্শন ও বৌদ্ধ ধর্মপ্রচারের এক দীর্ঘ পরিক্রমা অনন্য বর্ণনায় ধরা দিয়েছে।

উপন্যাস : নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা, লেখক : সন্মাত্রানন্দ

প্রকাশক : ধানসিঁড়ি; কলকাতা।

 

লেখক

কথাসাহিত্যিক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত