ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ কোনো সমাধান নয়। ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করলে জঙ্গি ও অন্যান্য অপশক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। তাছাড়া ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের মাধ্যমে আবরার ফাহাদের হত্যাকান্ডের পর বুয়েট প্রশাসনের ব্যর্থতার যে চিত্র ফুটে উঠেছে তা থেকে বাঁচতে এমন ন্যক্কারজনক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গতকাল শুক্রবার দেশ রূপান্তরকে এসব কথা জানান বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের বর্তমান ও সাবেক একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করার পর বিচারের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করে আসছে। এ অবস্থায় শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম গতকাল সন্ধ্যায় এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বুয়েট ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। বুয়েটের এ সিদ্ধান্তের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে দেশ রূপান্তরের পক্ষ থেকে সরকারি দল আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ, বিএনপির ছাত্র সংগঠন ছাত্রদল, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের বর্তমান নেতৃত্বসহ সাবেক ছাত্র নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তারা তাদের প্রতিক্রিয়া জানান।
ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাবেক ভিপি ও নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, বুয়েটে আসলে কোনো রাজনীতি ছিল না। রাজনীতির নামে শুধুমাত্র ছাত্রলীগের দখলদারিত্ব ছিল। ছিল অপরাজনীতি। বুয়েটে রাজনীতি থাকলে আবরার ফাহাদের মতো ছাত্রকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করতে পারত না। কারণ, তখন অন্য ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারত। ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার মধ্য দিয়ে বুয়েটের চলমান সংকটের কোনো সমাধান হবে না।
বুয়েট প্রশাসনের সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি নাহিয়ান খান জয় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ কোনো সমাধান নয়। এটি নিষিদ্ধ করলে জঙ্গি ও অন্যান্য অশুভ শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে।
তিনি বলেন, ছাত্রলীগও আবরার ফাহাদের হত্যার বিচার চায়। এ বিষয়ে জড়িত থাকার অভিযোগে ছাত্রলীগের ১১ নেতাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এ রকম ঘটনার সঙ্গে যদি কেউ জড়িত হয় তাহলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। র্যাগিং, টর্চার সেল সম্পর্কে জানতে চাইলে জয় বলেন, এ রকম ঘটনার সঙ্গে যে জড়িত থাকুক তাদেরকে সাংগঠনিকভাবে বহিষ্কার করা হবে। এখন উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন। তবে এ সিদ্ধান্ত সঠিক নয়। ভবিষ্যতে এ বিষয় নিয়ে বুয়েট প্রশাসন আবারও ভেবে দেখবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন এই ছাত্রনেতা।
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন শ্যামল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ছাত্রদল ছাত্ররাজনীতি বন্ধের বিপক্ষে। ছাত্ররাজনীতি বন্ধ কোনো সমাধান নয়। এর মাধ্যমে বুয়েট প্রশাসন নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করতে চায়। নিজেদের রক্ষা করতে চায়। ছাত্রদল চায় ছাত্রলীগের লাগাম টেনে ধরা হোক। তাদের অপরাজনীতির কারণে বিশেষ করে দখলদারিত্ব, সন্ত্রাসের কারণে সারা দেশের ক্যাম্পাসগুলোতে অস্থিতিশীল পরিবেশ বিরাজ করছে।
তিনি বলেন, সব সময় সম্প্রসারণবাদী, আধিপত্যবাদী শক্তিগুলো চায় ছাত্ররাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতে। কারণ তারা জানে ছাত্রসমাজ তাদের অবৈধ কর্মকা- মেনে নেবে না। ছাত্ররা গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী। সরকারের ব্যর্থতায় রাষ্ট্র যখন বিপথগামী হয় তখন রাষ্ট্রকে সঠিক পথে আনে ছাত্ররাজনীতি। তাই অপশক্তিগুলো সব সময় ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করতে চায়।
ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি যুব ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক খান আসাদুজ্জামান মাসুম দেশ রূপান্তরকে বলেন, এটা বিরাজনীতিকরণের অংশ। ক্যাম্পাসগুলোতে যারা সন্ত্রাস করছে তাদের প্রতিহত করতে না পেরে অগণতান্ত্রিক আচরণ করছে। এর মাধ্যমে বুয়েট ভিসি নিজে বাঁচার চেষ্টা করছেন। সব চেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো যারা চিহ্নিত অপরাধী তাদের অস্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে এবং ছাত্ররাজনীতি স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে।
ডাকসুর ভিপি ও কোটা সংস্কার আন্দোলনের যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল হোসেন নুরু বলেন, ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ কোনো সমাধান নয়। বরং ছাত্ররাজনীতির নামে যারা অপরাজনীতি করে সেই ছাত্র সংগঠন বিশেষ করে ছাত্রলীগ, ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে।
তিনি বলেন, এটি কোনো সমাধান নয়। বরং চলমান শিক্ষার্থীদের আন্দোলন থামানোর একটি কৌশল। ছাত্ররাজনীতি বন্ধ থাকলেও ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের একটা প্রভাব থেকে যাবে। ছাত্ররাজনীতি বন্ধ না করে বরং ছাত্র সংসদ নির্বাচন করা উচিত। এতে করে ছাত্রনেতাদের মধ্যে ভালো কাজের প্রতিযোগিতা থাকবে। তাছাড়া সরকারের উচিত প্রশাসনকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া।
বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মেহেদী হাসান নোবেল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মূল সমস্যা উদঘাটন না করে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করা কোনো সমাধান হতে পারে না। বুয়েটে রাজনীতি বলতে ছিল প্রশাসন ও ছাত্রলীগের স্বৈরতান্ত্রিক নীতি। বুয়েটে রাজনীতি নিষিদ্ধ করার মধ্য দিয়ে প্রশাসনের স্বৈরতান্ত্রিক নীতিকেই জায়েজ করা হয়েছে। ছাত্র ইউনিয়ন অবিলম্বে প্রশাসনের এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার আহ্বান জানাচ্ছে।
