আবরার হত্যায় জবানবন্দি

স্টাম্প দিয়ে টানা শতাধিক বাড়ি মারে অনিক

আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০১৯, ১১:৪৯ পিএম

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র আবরার ফাহাদ রাব্বী (২২) হত্যা মামলার আসামি অনিক সরকার ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। গতকাল শনিবার ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে তার জবানবন্দি

গ্রহণ শেষে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। এ নিয়ে আবরার হত্যা মামলায় তিন আসামি ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিলেন। এর আগে গত বৃহস্পতিবার ইফতি মোশাররফ সকাল ও শুক্রবার মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন আবরার হত্যায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দেন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) জনসংযোগ শাখার উপকমিশনার (ডিসি) মাসুদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, আবরার হত্যা মামলায় আসামি অনিক সরকার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। হত্যাকাণ্ডে তার সম্পৃক্ততার কথা স্বীকারের পাশাপাশি অন্যদের ভূমিকার কথাও বলেছেন।

ডিএমপির গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, আবরারকে মারধরকারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আগ্রাসী ছিলেন অনিক সরকার। তিনিই সবচেয়ে বেশি মেরেছেন। স্টাম্প দিয়ে দুই দফায় পিটিয়েছেন। প্রথম দফায় তার পিটুনির সময় আবরার জ্ঞান হারান। অনিক তখন রুম থেকে বের হয়ে যান। কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফিরলে তাকে অন্যরা পেটাতে থাকেন। রাত সাড়ে ১২টার দিকে অনিক দ্বিতীয়বারের মতো ২০১১ নম্বর কক্ষে ঢুকে স্টাম্প দিয়ে আবরারকে এলোপাতাড়ি আঘাত করতে থাকেন। এ সময় তিনি স্টাম্প দিয়ে একটানা শতাধিক বাড়ি মারেন। এভাবে মারার একপর্যায়ে আবরার নিস্তেজ হয়ে মেঝেতেই পড়ে থাকেন।

তদন্তকারী এক কর্মকর্তা বলেন, বুয়েটের শেরেবাংলা হল থেকে যেদিন (৬ অক্টোবর) আবরারের লাশ উদ্ধার হয়, তার ৪-৫ দিন আগেই তাকে মারার পরিকল্পনা করেন অনিক সরকার, মেহেদী হাসান রবিন ও ইফতি মোশাররফ সকাল। সেই পরিকল্পনার তথ্য ও কথোপকথনের প্রমাণ বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের গোপন মেসেঞ্জার গ্রুপ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। এসব তথ্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডির ফরেন্সিক ল্যাবে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আদালত পুলিশের এক কর্মকর্তা অনিকের দেওয়া জবানবন্দি উদ্ধৃত করে দেশ রূপান্তরকে জানান, অনিক বলেন, মারধরের ৪-৫ দিন আগে আবরার আমাদের টার্গেটে ছিল। ঘটনার দিন সে (আবরার) গ্রামের বাড়ি থেকে আসার পর আমাদের মধ্যে সিদ্ধান্ত হয় সন্ধ্যার পর তাকে ২০১১ নম্বর কক্ষে ডাকা হবে। রাত ৮টার পর আবরারকে ওই কক্ষে ডাকা হয়। সে সময় তার মোবাইল ও ল্যাপটপ আনা হয়। তাকে বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ওই সময় আবরার চুপ ছিল। একপর্যায়ে তার মোবাইল ও ল্যাপটপ ঘেঁটে ‘উসকানিমূলক’ কিছু তথ্য পাই আমরা। এরপর মারধর শুরু হয়। আবরারকে প্রথম চড়-থাপ্পড় মারে মেহেদী। তখন ইফতিও চড়-থাপ্পড় মারতে থাকে। একপর্যায়ে সামসুল আরেফিন ক্রিকেট স্টাম্প নিয়ে আসে। এরপর আমি (অনিক) ক্রিকেট স্টাম্প দিয়ে পায়ে পেটাতে থাকি। আমি দুই দফায় ক্রিকেট স্টাম্প দিয়ে অনেক মারি। এরপর ইফতি, মোস্তফা রাফিদ ও তানভীর স্টাম্প দিয়ে তাকে পেটায়। পরে মেহেদী হাসান রবিন এসে তাকে পেটায়। একপর্যায়ে আবরার নিস্তেজ হয়ে পড়ে। এর আগে বমিও করে। এভাবে মারতে মারতে কখন যে মরে যায় আমরা বুঝতে পারিনি। তবে এ ঘটনায় আমি অনুতপ্ত।  

অনিক স্বীকারোক্তিতে আরও জানান, তাদের উদ্দেশ্য ছিল শিবির শনাক্ত করা। তার কাছ থেকে হলের কিছু শিবিরের নাম জানার চেষ্টা ছিল তাদের। আবরার নামগুলো না বলায় ‘চাপ সৃষ্টি’ করেন। অনিক বলেন ‘তাতেও আবরার মুখ না খোলায় আমার মাথা খারাপ হয়ে যায়। স্টাম্প দিয়ে আবরারের পায়ের পাতা, হাঁটু, হাতে পেটাই। তখন জিয়নও স্টাম্প দিয়ে আবরারের হাঁটুতে পেটায়। এরপর ধাপে ধাপে অন্যরা ভেতরে এসে আবরারকে মারধর করে। একপর্যায়ে আবরার নিস্তেজ হয়ে পড়ে। এর আগে আবরার কয়েকবার বমি করে। আবরার নিস্তেজ হয়ে পড়ার পর তাকে কোলে করে সিঁড়িঘরের পাশে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর পুলিশ ও চিকিৎসকদের খবর দেওয়া হয়। চিকিৎসক এসে আবরারকে মৃত ঘোষণা করেন।’

কে এই অনিক : রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার বড়ইকুড়ি গ্রামের ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেনের ছেলে অনিক সরকার (২৩)। অনিকের বড় ভাই মনোয়ার হোসেন সোহেল নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ সম্পন্ন করেন। তার বাবা আনোয়ার হোসেন আওয়ামী লীগের একজন সমর্থক। রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলায় তার একটি কাপড়ের দোকান রয়েছে। এ ছাড়া রাজশাহী-নওগাঁ রোডে ফিলিং স্টেশন রয়েছে। অনিকের তিন মামার মধ্যে মামুন ও হারুন শাহ পঙ্কুল কলেজশিক্ষক। আল মোমিন শাহ গাবরু নামে তার আরেক মামা রাজশাহী যুবলীগের নেতা, তার পদ জানা যায়নি। তিনি বাকশিমইল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান। এই মামার কাছ থেকেই মূলত অনিক ছাত্ররাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হন। পরবর্তী সময়ে প্রথম বর্ষের শেষের দিকে শেরেবাংলা হলের মিঠু ও ফরহাদ নামে ছাত্রলীগের দুই বড় ভাইয়ের পরামর্শে তিনি সক্রিয় কর্মী হয়ে ওঠেন। মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষে এসে তিনি বুয়েট ছাত্রলীগের তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক হন। বুয়েটের ১৫তম ব্যাচের শিক্ষার্থী অনিক হল জীবনের শুরুতে গণরুমে ছিলেন। ৫০৭ নম্বর রুম তার নামে বরাদ্দ, সেখানেই থাকতে তিনি। এর আগে রাজশাহীর মোহনপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন অনিক। নটর ডেম কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন।

উত্তরা থেকে মোয়াজ আবু হুরায়রা গ্রেপ্তার : আবরার হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আরেক আসামি মোয়াজ আবু হুরায়রাকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবির একটি টিম। এ নিয়ে আবরার হত্যা মামলায় ১৯ জনকে গ্রেপ্তার করল ডিবি, তাদের মধ্যে এজাহারভুক্ত ১৫ জন। এর মধ্যে সকাল, জিয়ন ও অনিক নামে তিন আসামি ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে কারাগারে রয়েছেন। বাকি ১৬ জনের ডিবি হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।

ডিএমপির জনসংযোগ শাখার উপকমিশনার মাসুদুর রহমান আরও জনান, গতকাল শনিবার বেলা ১১টার দিকে রাজধানীর উত্তরার ১৪ নম্বর সেক্টর এলাকা থেকে মোয়াজ আবু হুরায়রাকে গ্রেপ্তার করা হয়। মোয়াজ বুয়েটের ১৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। তিনি এজারহারভুক্ত আসামি হলেও বুয়েটের এক শিক্ষার্থী জানান, মোয়াজ টিউশনি শেষে মধ্যরাতে হলে প্রবেশ করার পর ‘বড় ভাইদের’ নির্দেশে অচেতন আবরারকে রুম থেকে বের করতে সহায়তা করেন। হলের ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরায় তার ছবি দেখে পুলিশ তাকে শনাক্ত করে।

মাজেদুল ইসলাম ৫ দিনের রিমান্ডে : আবরার হত্যায় গ্রেপ্তার এজাহারভুক্ত মো. মাজেদুল ইসলামের ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। গতকাল মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তাকে আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। আদালত ৫ দিন মঞ্জুর করে। গত শুক্রবার ভোররাতে সিলেট থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত