শুরু থেকেই বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ। ১৯৬২ সালের যে অধ্যাদেশ অনুযায়ী বুয়েট চলছে, তার ১৬ ধারায় স্পষ্টভাবে বলা আছে, ছাত্র সংসদ, হল সংসদ ছাড়া ছাত্রকল্যাণ পরিচালকের লিখিত অনুমোদন না নিয়ে কোনো ধরনের ছাত্রসংগঠন বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করবে না। এমনকি ক্যাম্পাসে সভা বা এ ধরনের কর্মকাণ্ড না করার কথাও বলা আছে তাতে। এ
ব্যাপারে ছাত্রসংগঠনগুলোকে অধ্যাদেশ মানতে কখনই বাধ্য করতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ। এমনকি এর আগে ২০০২ সালে ঘোষণা দিয়ে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করলেও তা শেষ পর্যন্ত রক্ষা করতে পারেনি। ২০০২ সালের জুনে ছাত্রদলের দুপক্ষের গোলাগুলিতে বুয়েটের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সাবেকুন নাহার সনির মৃত্যুর পর বিশ্ববিদ্যালয়ের নিষেধাজ্ঞা অনুযায়ী কিছুদিন ছাত্ররাজনীতি বন্ধ ছিল। পরে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তাদের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগই প্রথম সে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বুয়েটে ফের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু করে। ২০১০-১১ সালেই দখলে নেয় পুরো ক্যাম্পাস ও হল। নামমাত্র ছাত্রদল থাকলেও অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ে অন্য ছাত্রসংগঠনগুলো।
বুয়েটের সাবেক শিক্ষার্থীরা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, বুয়েটের অধ্যাদেশ অনুযায়ী ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ থাকলেও সেটা কখনই নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি বুয়েট কর্র্তৃপক্ষ; বিশেষ করে ১৯৯১ সালে বিএনপি ও ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে দল দুটোর ছাত্রসংগঠন ছাত্রদল ও ছাত্রলীগ প্রকাশ্যে রাজনীতি শুরু করে। ক্যাম্পাসে কার্যালয় খোলে। হলগুলো দখলে নেয়।
এই সাবেক শিক্ষার্থীরা আরও বলেন, বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ থাকলেও একসময় সেখানে জাসদ ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রফ্রন্টসহ বিভিন্ন বাম সংগঠনগুলো রাজনীতি করেছে। তারা মিছিল করেছে। নানাভাবে সাংগঠনিক কার্যকম চালিয়েছে। কিন্তু হল দখল করে বা কার্যালয় গড়ে তুলে রাজনীতি করেনি। এ প্রথা চালু হয় বিএনপির সময় থেকেই। আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসার পর ছাত্রলীগের সময় তা ব্যাপক আকার ধারণ করে।
সে সময়ের ছাত্ররাজনীতির বর্ণনা দিয়ে জাসদের ’৭২-৭৩ সালের বুয়েট ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা ছাত্র সংসদ ও হল সংসদ নির্বাচন করেছি। ক্যাম্পাসে রাজনীতিও করেছি। তবে আমাদের সময় ক্যাম্পাসে বা হলে কোনো দলীয় কার্যালয় ছিল না। আমরা মিছিল করতাম। ক্যান্টিনে বা কমনরুমে বসে যে যার সভা করতাম। আলোচনা করতাম।
ছাত্রলীগের নেতারা বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার পর দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার ঘোষণা কতটুকু বাস্তবায়ন করতে পারবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। আবরার হত্যাকা-ের বিচারসহ ১০ দফা দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে গত শুক্রবার বুয়েট উপাচার্য অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম সংগঠনভিত্তিক ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন।
এ ব্যাপারে বুয়েটের ছাত্রকল্যাণ পরিচালক অধ্যাপক মিজানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের এখানে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার কথা না। কারণ যে অধ্যাদেশে বুয়েট চলে, সেখানে ছাত্ররাজনীতি করার সুযোগ নেই। করতে হয়েছে বিশেষ ঘটনার প্রেক্ষাপটে।
এই শিক্ষক বলেন, সনি হত্যার পর একবারই বুয়েট ঘোষণা দিয়ে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করেছিল। কিন্তু পরে সেই নিষেধাজ্ঞা মানাতে পারেনি তখনকার কর্র্তৃপক্ষ। কিছুদিন রাজনীতি বন্ধ ছিল। পরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে ছাত্রলীগ রাজনীতি করা শুরু করে। তখনকার বুয়েট কর্র্তৃপক্ষ তাদের বাধা দেয়নি। এটা তাদের ব্যর্থতা ছিল। ওই সময় ছাত্রলীগকে রাজনীতি করতে না দিলে এখন এই পরিস্থিতি হতো না। আমাদের রাজনীতি নিষিদ্ধের ঘোষণা দেওয়া লাগে না।
অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, এখানে ছাত্রসংগঠন বাদে অন্য সংগঠনগুলো তাদের কার্যক্রম চালাতে পারবে। সে ক্ষেত্রে আমাদের কাছে লিখিত আবেদন করতে হবে। এভাবে আমরা ডিবেটিং, সাংবাদিক সমিতিসহ ৩০টির মতো সংগঠনকে অনুমতি দিয়েছি। তারা কাজ করছে।
দ্বিতীয়বারের মতো ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার ঘোষণা বাস্তবায়ন নিয়ে বিভিন্ন মহলে সংশয় দেখা দিয়েছেÑ এমন প্রশ্নের উত্তরে এই ছাত্রকল্যাণ পরিচালক বলেন, এখন আমরা বদ্ধপরিকর। আমরা ইতিমধ্যেই বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের মূল সংগঠনকে মৌখিকভাবে অনুরোধ জানিয়েছি তারা যেন এখানে কোনো শাখা না দেয়। বিদ্যমান কমিটিগুলো বিলুপ্ত ঘোষণা করে। পরে প্রয়োজন হলে চিঠি দেওয়া হবে। সবাই মিলে চেষ্টা করলে অবশ্যই বুয়েটকে ছাত্ররাজনীতির বাইরে রাখা যাবে।
এ ব্যাপারে বুয়েট শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক এ কে এম মাসুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, অধ্যাদেশ অনুযায়ী বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি করার কোনো নিয়ম নেই। ছাত্রসংগঠনগুলো আইন অমান্য করে অনুপ্রবেশ করেছে। এসব অনুপ্রবেশ ঠেকাতে হলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষকে কঠোর হতে হবে। যারা রাজনীতি করবে, তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনকে ব্যবস্থা নিতে হবে।
বুয়েটে ছাত্ররাজনীতির অতীত ইতিহাস তুলে ধরে বুয়েট ছাত্র সংসদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ থাকলেও সেখানে ছাত্রসংগঠনগুলো রাজনীতি করেছে। তবে এখনকার মতো দলভিত্তিক বহিঃপ্রকাশ ছিল না। দল থেকে কোনো নির্দেশ আসত না। আমরা সংসদ ও হল নির্বাচন করেছি। কখনই কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চাইলে অবশ্যই বুয়েটকে ছাত্ররাজনীতির বাইরে রাখতে পারবে। কারণ এখানে যারা লেখাপড়া করে, ভবিষ্যতে তারা কেউই মূলধারার রাজনীতি, এমপি, চেয়ারম্যান বা কাউন্সিলর হবেন না। সুতরাং এখানকার ছাত্রছাত্রীদের দলীয় লেজুড়বৃত্তি রাজনীতি করার কোনো দরকার নেই।
এই সাবেক ছাত্র নেতা বলেন, আমি ’৬৯ সালে বুয়েটে ভর্তি হই। তখন থেকেই ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয়। আমরা বুয়েটে ছাত্র সংসদ ও হল সংসদ নির্বাচন করেছি। এ জন্য আমাদের বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি করতে হয়নি। এটার দরকারও নেই।
গত ২০ বছরে বিভিন্ন রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনের কর্মীদের হাতে বুয়েটে নিহত হয়েছেন তিনজন শিক্ষার্থী। এর বাইরে বিভিন্ন সময়ে ঘটছে শিক্ষার্থী নির্যাতনের রোমহর্ষক ঘটনাও। ২০০২ সালের জুনে ছাত্রদলের দুপক্ষের গোলাগুলিতে দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী সাবেকুন নাহার সনি নিহত হন। তার মৃত্যুর পরও ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। এরপর ২০১৩ সালে হেফাজত ও শিবিরকর্মীরা যন্ত্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী আরিফ রায়হান দ্বীপকে হত্যা করে। সর্বশেষ ৬ অক্টোবর রবিবার গভীর রাতে বুয়েটের ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা করে।
এসব তথ্য তুলে ধরে গত শুক্রবার বুয়েট উপাচার্যের কাছে শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন তোলেন, সনি নিহত হওয়ার পরও ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। ২০০৯ সালে আবার তা শুরু হয়। আন্দোলন স্তিমিত হলে আবার রাজনীতি শুরু হবে নাÑ এর নিশ্চয়তা কী? এর জবাবে উপাচার্য অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম বলেন, কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়। স্থায়ীভাবেই রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। রাজনীতি নিষিদ্ধ করার পরও যারা এ কাজে যুক্ত থাকবে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
