১০ বছর পর ‘অনুমতি ছাড়াই’ বিএনপির সমাবেশ

আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০১৯, ১১:৫৪ পিএম

পুলিশের ‘অনুমতি উপেক্ষা’ করে রাজধানীতে সমাবেশ করেছে বিএনপি। দলটির নেতারা বলছেন, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতার আসার পর এই প্রথম রাজধানীতে অনুমতি ছাড়া সমাবেশ করা হয়েছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যা, ভারতের সঙ্গে চুক্তির প্রতিবাদ এবং দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে গতকাল শনিবার বিকেলে নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে এ সমাবেশ করা হয়।

এদিকে বিএনপি নেতাদের অভিযোগ, সমাবেশে আসা দেড় শতাধিক নেতাকর্মীকে পুলিশ আটক করেছে। তবে পুলিশ বলছে, কয়েকজনকে আটক করে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে।

সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার ভারত সফরে যেসব চুক্তি করেছেন তা দেশের স্বার্থবিরোধী। এর প্রতিবাদে বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদ ফেইসবুকে যা লিখেছিলেন তা দেশের জনগণের মনের কথা। অথচ এজন্য তাকে হত্যা করা হয়েছে। তাই জনগণ আবরারের রক্ত বৃথা যেতে দেবে না। আবরারের রক্তে আধিপত্যবাদ, সম্প্রসারণবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের বীজ বপিত হয়েছে।’

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, দুপুর ২টায় সমাবেশ শুরুর কথা থাকলেও সকাল ১০টা থেকে নেতাকর্মীরা কার্যালয়ের সামনে আসতে শুরু করেন। কার্যালয়ের অদূরে কাকরাইল নাইটিঙ্গেল মোড়ে পুলিশের চেকপোস্টে তারা বাধার মুখে পড়েন। তবে বাধা উপেক্ষা করে নেতাকর্মীরা কার্যালয়ের সামনে জড়ো হন। এ সময় ওই সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে তাদের ঘিরে রাখে পুলিশ। একপর্যায়ে নেতাকর্মীর সংখ্যা বাড়তে থাকলে পুলিশ পিছু হটে। তারা নয়াপল্টন ও আশপাশের এলাকার গলিমুখ বন্ধ করে দেয়। সমাবেশস্থলে র‌্যাব ও পুলিশের বিপুলসংখ্যক সদস্যের পাশাপাশি মোতায়েন করা হয় সাঁজোয়া যান ও জলকামানবাহী গাড়ি।

তারা আরও জানিয়েছেন, সকালে নেতাকর্মীরা জড়ো হওয়ার পর থেকে সমাবেশ শুরুর আগ পর্যন্ত কার্যালয়ের সামনের রাস্তায় চেয়ার পেতে বসে ছিলেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ, যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী, তথ্য ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক আজিজুল বারী হেলাল, মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কাজী আবুল বাসার, যুবদলের সাধারণ সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি শফিউল বারী বাবু, ছাত্রদলের সভাপতি ফজলুর রহমান খোকন প্রমুখ। দুপুর ২টার পর আসেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ও মির্জা আব্বাস। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে থাকায় সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন খন্দকার মোশাররফ।

মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘খালেদা জিয়ার মুক্তি ছাড়া গণতন্ত্র মুক্তি পাবে না। ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের মাধ্যমে, জাতীয় ঐক্য সৃষ্টির মাধ্যমে খালেদা জিয়ার মুক্তি হবে, দেশের গণতন্ত্র মুক্ত হবে।’ ভারতের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির সমালোচনা করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই জ্যেষ্ঠ সদস্য বলেন, ‘ফেনী নদীর পানি উত্তোলনে প্রধানমন্ত্রী সম্মতি দিয়েছেন, সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করতে সম্মতি দিয়েছেন, উপকূলে যৌথ নজরদারির নামে ভারতকে ২০টি রাডার বসানোর অনুমতি দিয়েছেন। আমরা যে এলপিজি আমদানি করি তা ভারতে রপ্তানি করার অনুমতি দিয়েছেন। এই চুক্তির প্রতিটি বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী। চুক্তির আগে থেকেই ভারত ৩৬টি পাইপ দিয়ে ফেনী নদীর পানি জোর করে তুলে নিয়ে গেলেও এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী কিছু বলেননি।’

বিএনপির এই নীতিনির্ধারক বলেন, ‘বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা সমুদ্রবন্দরে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ভারতের পণ্য বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দরে খালাস হলে আমাদের ব্যবসায়ীরা আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।’ সাবেক মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আক্ষেপ করে বলেছিলেন গ্যাস না দেওয়ার জন্য ২০০১ সালে তিনি ক্ষমতায় আসতে পারেননি। তাহলে এবার কি তার খেসারত দিলেন? আসলে শুধু ক্ষমতায় থাকার জন্য দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে তিনি চুক্তি করে এসেছেন। আর এর খেসারত দিতে হবে দেশের জনগণকে।’

খন্দকার মোশাররফ অভিযোগ করেন, সমাবেশে আগত অন্তত দেড় শতাধিক নেতাকর্মীকে পুলিশ আটক করেছে। তাদের থানা থেকেই মুক্তি দেওয়ার জন্য পুলিশের প্রতি অনুরোধ জানান তিনি। তবে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মতিঝিল জোনের জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার মিশু বিশ্বাস দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কয়েকজনকে আটকের পর তাদের সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে।’

সমাবেশে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, ‘সরকার দুর্নীতিতে আকণ্ঠ ডুবে গেছে। তারা এখন এমন খাদে পড়েছে যেখান থেকে তাদের নিষ্কৃতি নেই। আমি মনে করি সরকারের পতন সময়ের ব্যাপার মাত্র। দেশের জনগণ এই সরকারকে বরদাশত করবে না।’ স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, ‘এই নতজানু সরকার যতদিন ক্ষমতায় থাকবে, ততদিন আমাদের ন্যায্য অধিকার আদায় হবে না। দেশের স্বার্থ রক্ষা হবে না। এখন থেকে কর্মসূচি পালনে আর পুলিশের অনুমতির জন্য বসে থাকবে না বিএনপি।’

ডিএমপিতে বিএনপির প্রতিনিধিদল : সমাবেশের অনুমতি চাইতে গতকাল সকালে দুই দফায় ডিএমপি কার্যালয়ে যায় বিএনপির একটি প্রতিনিধিদল। ওই দলে ছিলেন বিএনপির প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী ও সহসাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম আজাদ। পরে এ্যানী দেশ রূপান্তরকে বলেন, তাদেরকে সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি।

অন্য রুটের বাস নয়াপল্টনমুখী : সমাবেশ শুরুর পর একপর্যায়ে পুলিশ রাস্তা পরিবর্তন করে মতিঝিল-দৈনিক বাংলা-পল্টন মোড় হয়ে শাহবাগমুখী বাস বিকল্প অটো সার্ভিস, গাবতলী মিনি সার্ভিস (৮ নম্বর), বিহঙ্গ পরিবহন, রাইদা পরিবহন, নিউ ভিশনের গাড়ি নয়াপল্টন সড়কে পাঠিয়ে দেয়। পরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের নেতৃত্বে নেতাকর্মীরা রাস্তার এক দিক ফাঁকা করে দিয়ে সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করেন। নেতাকর্মীদের অভিযোগ, সমাবেশ বাধাগ্রস্ত করতেই পুলিশ এ কাজটি করেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত