ইতিহাসের আলোচিত কয়েকটি ছাত্র আন্দোলন

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০১৯, ১২:৪৭ এএম

দাবি আদায় করতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ইতিহাস বহু পুরনো। নিজেদের অধিকার ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ইস্যুতে পৃথিবীর নানা প্রান্তে অসন্তোষ ছড়িয়েছিল শিক্ষার্থীদের মধ্যে। আলোচিত কয়েকটি ছাত্র আন্দোলন নিয়ে লিখেছেন পরাগ মাঝি

প্রথম ছাত্র আন্দোলন

পৃথিবীর প্রথম ছাত্র আন্দোলন সংঘটিত হয় চীনে। ১৬০ খ্রিস্টাব্দে চীনের ইমপেরিয়াল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সরকারের কয়েকটি নীতির প্রতিবাদে রাস্তায় নামে। সেদিন সেই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন এমন কয়েকজন ছাত্রনেতা, যারা মেধাবী হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং ইমপেরিয়ালে পড়তে এসেছেন তুলনামূলক গরিব পরিবার থেকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সেই আন্দোলন সেদিন ছুঁয়ে গিয়েছিল সাধারণ মানুষকেও। ছাত্রদের দেখাদেখি সেদিন সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে স্লোগান দেয় প্রায় ৩০ হাজার মানুষ। সরকার বেশ কঠোরভাবেই সেই আন্দোলন দমাতে চেয়েছিল। সরকারি নীতির প্রতিবাদ করায় সেই আন্দোলনে কারাগারে যেতে হয়েছিল ১৭২ জন শিক্ষার্থীকে। সরকারি কারাগারে তাদের ভোগ করতে হয় অমানুষিক নির্যাতন আর নিগ্রহ।

হোয়াইট রোজ আন্দোলন, ১৯৪৩

১৯৪২ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন নাৎসি শাসনের বিরুদ্ধে মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এই আন্দোলনের সূচনা করেন। তারা নাৎসি শাসনের বিরুদ্ধে এক অহিংস প্রতিরোধ গ্রুপ গঠন করেন। এর নাম রাখা হয়েছিল হোয়াইট রোজ বা শ্বেত গোলাপ। নাৎসি বাহিনীর নির্মমতা সম্পর্কে জার্মানির সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে এবং জনগণকে নাৎসি শাসনের বিরুদ্ধে নীরব প্রতিরোধ গড়ে তোলায় উৎসাহী করে তুলতে তারা একটি লিফলেট ক্যাম্পেইন শুরু করেন।

আন্দোলনের অংশ হিসেবে মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে দেয়ালে লিখে দেওয়া হয় হিটলার ও নাৎসি বিরোধী বিভিন্ন  স্লোগান। ১৯৪২ থেকে ১৯৪৩ সালের মধ্যে হোয়াইট রোজ আন্দোলন ৬টি লিফলেট প্রকাশ করে। এর মধ্যে চতুর্থ লিফলেটটিতে লেখা হয়েছিল- ‘আমরা চুপ করে বসে থাকব না। আমরা তোমার মন্দ বিবেক। হোয়াইট রোজ তোমাকে শান্তিতে থাকতে দেবে না।’

লিফলেটের কপি তৈরি করতে আন্দোলনকারীরা হস্তচালিত ছাপযন্ত্র ব্যবহার করত। এই লিফলেটগুলো তারা অন্যান্য ছাত্র, শিক্ষক এবং ফোনবুকের ঠিকানা ধরে ধরে ডাকে পাঠাতেন। সুটকেসে বহন করে এইসব লিফলেট তারা জার্মানির অন্যান্য শহরেও বিতরণ করতেন। ফোনের বুথে বুথে রেখে আসতেন, যেন এগুলো সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছায়।

১৯৪৩ সালে ১৮ ফেব্রুয়ারি হোয়াইট রোজের দুই সদস্য জার্মান গুপ্ত পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। একে একে ধরা পড়েন হোয়াইট রোজ গ্রুপের অন্য সদস্যরাও। অবশেষে আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা ছয় সদস্যকেই বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয় এবং প্রত্যেককেই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। নাৎসি শাসনে এই আন্দোলন বড় কোনো পরিবর্তন আনতে না পারলেও ছাত্রদের এই সাহসী পদক্ষেপ নাৎসি প্রোপাগান্ডা মেশিনে কিছুটা হলেও ফাটল তৈরি করতে পেরেছিল।

গ্রিনসবোরোর অবস্থান ধর্মঘট, ১৯৬০

সাদা-কালো ভেদাভেদের প্রতিবাদে এই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল নর্থ ক্যারোলিনার উলওর্থ লাঞ্চ কাউন্টারে। মাত্র চারজন কৃষ্ণাঙ্গ ছাত্র দুপুরের খাবার খেতে গিয়ে লাঞ্চ কাউন্টারের সামনে গিয়ে অবস্থান ধর্মঘট শুরু করেন। শত অনুরোধের পরও তারা ওই স্থান ত্যাগ করতে অস্বীকৃতি জানান। পরে এই আন্দোলন মার্কিন নাগরিক অধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নেয়।

১৯৬০ সালে ১ ফেব্রুয়ারি অবস্থান ধর্মঘটে অংশ নেওয়া কৃষ্ণাঙ্গ ওই চার শিক্ষার্থী হলেন- ১৮ বছর বয়সী ইজেল ব্লেয়ার জুনিয়র, ১৯ বছরের ফ্রাঙ্কলিন ম্যাককেইন, ১৭ বছরের জোসেফ ম্যাকনেইল এবং ১৮ বছরের ডেভিড রিচমন্ড। তারা সবাই নর্থ ক্যারোলিনার এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড টেকনিক্যাল স্টে ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী ছিলেন। ধর্মঘট শুরু করার মাত্র তিন দিনের মধ্যেই তাদের সঙ্গে আরও অন্তত ৩০০ শিক্ষার্থী এসে যোগ দেন। শুধু তাই নয়, এ ধরনের অবস্থান ধর্মঘট শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রের আরও ৫০-এর অধিক শহরে। এর ফলস্বরূপ খুব শিগগিরই বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের লাঞ্চ কাউন্টারগুলোতে বর্ণপ্রথা রহিত করা হয়।

এক পর্যায়ে ওই চার শিক্ষার্থীর নেতৃত্বে আন্দোলনের এক অহিংস ছাত্র সমন্বয়ক কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি পরবর্তী সময়ে যানবাহনে বর্ণবৈষম্য দূরীকরণসহ এবং দক্ষিণাঞ্চলে কৃষ্ণাঙ্গদের ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত করায় বড় ভূমিকা রেখেছিল। শুধু তাই নয়, ১৯৬৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আলোচিত নাগরিক অধিকার আইন পাস করতে উলওর্থে চার শিক্ষার্থীর ওই অবস্থান ধর্মঘট অনেক বড় ভূমিকা রেখেছিল।

২০০৫ সালে এক সাক্ষাৎকারে অবস্থান ধর্মঘট শুরু করা চার শিক্ষার্থীর একজন ম্যাককেইন বলেন, “অনিবার্যভাবেই লোকজন প্রায়ই আমাকে বলে- ‘আমি এখন কী করব’?’’

- আমি বলে উঠি, ‘এটা কী ধরনের প্রশ্ন? তোমার চারপাশে তাকাও। একসময় তুমিই দেখতে পাবে- তুমি কী করতে চাও। সাধারণ মানুষের কাছে কখনো প্রত্যাশা কোরো না। কারণ, তারা আসবে না।’

বিশ্ববিদ্যালয় জাগরণ, ১৯৬৮

১৯৬৮ সালে একাধিক মহাদেশে ছাত্র আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল। এসব আন্দোলনে অনেকেই তাদের লক্ষ্যে পৌঁছে, আবার অনেকেই পারেনি। তবে, এসব আন্দোলন পরবর্তী অনেক আন্দোলনকে প্রভাবিত করেছিল।

সে বছরের মার্চে ওয়াশিংটনের কৃষ্ণাঙ্গ হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন ঘেরাও করে সহস্রাধিক শিক্ষার্থী। তাদের প্রথম দাবি ছিল বিশ্ববিদ্যালয় চেয়ারম্যানের পদত্যাগ, দ্বিতীয়ত- পাঠ্যক্রমে আফ্রিকান-আমেরিকান ইতিহাসে জোর দেওয়া, তৃতীয়ত- ছাত্রদের অংশগ্রহণে একটি বিচার বিভাগীয় ব্যবস্থা তৈরি এবং চতুর্থত- ইতিপূর্বের বিভিন্ন আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার। বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ তৃতীয় এবং চতুর্থ দাবিটি মেনে নেয়।

এক মাস পর কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়েও এ ধরনের আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলনের অংশ হিসেবে বিভিন্ন দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকটি ভবন দখলে নেয় শিক্ষার্থীরা। কিন্তু প্রায় হাজার খানেক পুলিশ তাদের উচ্ছেদ করার জন্য নির্মম হামলা চালায়। পুলিশি নির্যাতনের পরও শিক্ষার্থীরা তাদের আন্দোলন চালিয়ে যান। পরবর্তী সেমিস্টারজুড়েই আন্দোলন হয়। বিভিন্ন ভবন দখলমুক্ত করার পরও বিশ্ববিদ্যালয় কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল দুটি। প্রথমত, হারলেমের মর্নিংসাইড পার্কে নির্মিত বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমে স্থানীয় বাসিন্দাদের অবাধ চলাচল নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, অস্ত্র গবেষণা থিংকট্যাংকের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিয়েতনাম যুগের একটি চুক্তি বাতিল করতে হবে।

একই বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আটলান্টিকের অন্য পাড়ে বিশেষ করে ফ্রান্স এবং পোল্যান্ডে ছাত্র অসন্তোষ দানা বেঁধে ওঠে। সরকারি বিভিন্ন সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ১৯৬৮ সালের জানুয়ারিতে পোল্যান্ডের ওয়ারশ’তে ৩০০ শিক্ষার্থী আন্দোলন শুরু করেন। মার্চ মাস নাগাদ ওই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় ২০ হাজার। তবে, এই আন্দোলনটি শেষ পর্যন্ত দমন করতে সক্ষম হয় দেশটির সরকার। এদিকে, ওই বছরের মে মাসে ফ্রান্সে প্যারিসের সরবোনে দাঙ্গা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় প্রায় ২০ হাজার শিক্ষার্থী। ফ্রান্সের শ্রমিক ইউনিয়নগুলোসহ শিক্ষকরাও ছাত্রদের আন্দোলনকে সমর্থন করে ২৪ ঘণ্টার এক ধর্মঘট আহ্বান করেন। টানা কয়েকদিনের আন্দোলনে দেশবাসী নাকাল হলেও তৎকালীন প্রেসিডেন্ট চার্লস দ্য গলের গদি টলাতে ব্যর্থ হন আন্দোলনকারীরা।

জাতিবিদ্বেষ বিরোধী আন্দোলন

১৬ বছর আগে অনুষ্ঠিত গ্রিনসবোরোর অবস্থান ধর্মঘটের মতো ১৯৭০ এবং ১৯৮০’র দশক জুড়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় সোয়েতোর পাবলিক স্কুলগুলোতে বর্ণবৈষম্য বিরোধী এই আন্দোলন সংঘটিত হয়।

১৯৭৬ সালের ১৬ জুন জোহানেসবার্গে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী একটি শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে অংশ নেন। কিন্তু এই আন্দোলন শিগগিরই অশান্ত হয়ে ওঠে যখন পুলিশ তাদের ওপর গুলি এবং কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। দেশটির তৎকালীন সরকার থেকে একটি শিক্ষানীতি তৈরি হয়েছিল। এই শিক্ষানীতি অনুযায়ী, শুধু শ্বেতাঙ্গ শিক্ষার্থীরাই ইংরেজি শিখতে পারবে। আর কালোদের পড়ানো হবে আফ্রিকান ভাষায়। এই ধরনের বৈষম্যমূলক নীতির প্রতিবাদেই শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমেছিল। শ্বেতাঙ্গ শিক্ষার্থীরা উন্নততর শিক্ষা পাবে, পৃথিবী তাদের সামনে খুলে  যাবে, আর কালো শিক্ষার্থীরা বন্দি থাকবে আফ্রিকান ভাষার শেকলে, তা হতে পারে না। ঠিক করা হলো- এক মৌন মিছিল হবে সব স্কুলের শিক্ষার্থীদের নিয়ে। হাতের প্ল্যাকার্ডে লেখা থাকবে– ‘অভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থা চাই’, ‘আমরাও ইংরেজি পড়তে চাই’ ইত্যাদি  স্লোগান।

মিছিল চলাকালে পুলিশ এসে শিক্ষার্থীদের বাধা দেয়। কিন্তু শিক্ষর্থীরা নির্ভয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলে। এ অবস্থায় গুলি ছোড়ে পুলিশ। গুলি খেয়ে প্রথমেই লুটিয়ে পড়েন হেক্টর পিটারসন নামে ১১ বছরের এক কিশোর। শোভাযাত্রা সেদিনের মতো পন্ড হয়ে গেলেও এটি এক দীর্ঘমেয়াদি আন্দোলনে রূপ নেয়। আফ্রিকায় শুরু হয়ে যায় ভাষা বিপ্লব। পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ১৯৯৪ পর্যন্ত চলেছিল। দীর্ঘ ১৮ বছরের এই আন্দোলনই দেশটির বর্ণবিদ্বেষী শাসনব্যবস্থার পতন ঘটায়। নেলসন ম্যান্ডেলা প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। সুদীর্ঘ এই আন্দোলনে দেশটির অন্তত ৫৭৫ জন নারী-পুরুষ-শিশু-কিশোর প্রাণ দিয়েছিল।

তিয়েন আনমেন স্কোয়ার আন্দোলন, ১৯৮৯

১৯৮৯ সালের ১৫ এপ্রিল চীনের সাবেক কমিউনিস্ট পার্টির মহাসচিব ও উদারবাদী রাজনৈতিক ও অর্থনীতি পুনর্গঠনকারী হু ইয়াওবাংয়ের মৃত্যুকে ঘিরে এই বিক্ষোভ পুঞ্জীভূত হতে থাকে। তার স্মরণে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা শোভাযাত্রা নিয়ে তিয়েন আনমেন স্কয়ারে একত্রিত হতে থাকেন। মুদ্রাস্ফীতি, চাকরির সীমিত সুযোগ ও পার্টির অভ্যন্তরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে হু সোচ্চার ছিলেন। বিক্ষোভকারীরা সরকারের স্বচ্ছতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, শিল্প-কারখানায় নিয়োজিত কর্মীদের অধিকারের বিষয়েও দাবি তোলেন। বিক্ষোভের চূড়ান্ত পর্যায়ে তিয়েন আনমেন স্কোয়ারে প্রায় ১০ লাখ লোক সমবেত হন। পেইচিং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই ছিলেন আন্দোলনের নেতৃত্বে।

শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে কয়েক সপ্তাহের গণতন্ত্রকামী আন্দোলন এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে শেষ হয় ১৯৮৯ সালের ৪ জুন। কয়েক হাজার চীনা সৈন্য এদিন তিয়েন আনমেন স্কোয়ারে সমবেত মানুষের ওপর নির্বিচার গুলি চালায়। এতে নিমেষেই কয়েকশো মতান্তরে কয়েক হাজার সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থী নিহত হন। ঠিক কতজন সেদিন প্রাণ হারিয়েছিলেন তার সংখ্যা কখনও প্রকাশিত হয়নি। আন্দোলনের প্রায় ৩০ বছর কেটে গেলেও চীনে এখনো গণতন্ত্র আসেনি।

বিক্ষোভ নস্যাৎ করার পর সরকার বিক্ষোভকারী ও তাদের সহায়তাকারীদের গণহারে গ্রেপ্তার করতে থাকে। বিদেশি সাংবাদিকদের তাদের দেশে ফেরত পাঠায় ও ঘরোয়া গণমাধ্যমে এ বিষয়ে লেখার ওপর কর্র্তৃত্ব আরোপ করে। পুলিশ ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনীকে আরও শক্তিশালী করা হয়।

বিক্ষোভকারীদের প্রতি কোনো প্রকার নমনীয়তা প্রদর্শন করা হয়নি। তবে, এই আন্দোলনের পর দেশটিতে রাজনৈতিক স্বাধীনতায় না হলেও অর্থনৈতিক স্বাধীনতায় উদারনীতি গ্রহণ করা হয়। সারি সারি ট্যাঙ্কের সামনে একা এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে থাকার একটি ঐতিহাসিক ছবি এখনো এই আন্দোলনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

ভেলভেট রিভল্যুশন, ১৯৮৯

বার্লিন ওয়াল গুঁড়িয়ে দেওয়ার ৮ দিন পর পূর্ব জার্মানির সমাজতান্ত্রিক সরকারের মধ্যে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছিল। কারণ প্রতিবেশী দেশ চেকোসেøাভাকিয়ার মানুষ এক আন্দোলনের মাধ্যমে সেদিন তাদের সমাজতান্ত্রিক সরকারের পতন ঘটিয়েছিল। প্রাগ শহরে এই আন্দোলনের শুরুটা করেন কয়েক হাজার শিক্ষার্থী। পরে তা ৫ লাখ মানুষের বিশাল এক গণসমুদ্রে পরিণত হয়। দাঙ্গা পুলিশ বারবার আক্রমণ চালাতে উদ্যত হলেও আন্দোলনকারীরা তাদের শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি অব্যাহত রাখেন। ফলে চেকোসেøাভাকিয়ার কমিউনিস্ট পার্টি ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়। এরই ধারাবাহিকতায় সে বছরের ডিসেম্বরে দেশটির ক্ষমতায় আসেন ভেকলভ হ্যাভেল।

এটা ছিল ইতিহাসের এক ব্যতিক্রম আন্দোলন। লেখক টিমোথি গার্টেন অ্যাশ-এর ভাষ্যে আন্দোলনটি ছিল ‘দ্রুততম, কোনো মারামারি কাটাকাটি ছাড়া, আনন্দময় এবং হাস্যরসপূর্ণ।’ আধুনিক সময়ের কোনো ছাত্র আন্দোলনই এমন সফল এবং সুকোমল হতে পারেনি।

ইরানের ছাত্র বিক্ষোভ, ১৯৯৯

১৯৯৯ সালের জুলাইয়ে কলেজ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কয়েক দফা সংঘর্ষের পর ৮ জুলাই মাঝ রাতের পর ইরানের তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ছাত্রাবাসে অভিযান চালায় দেশটির পুলিশ বাহিনী। সেদিন ঘুমন্ত শিক্ষার্থীদের ওপর এক নৃশংস হামলা চালায় তারা। এতে বেশ কয়েকজন আহত ও এক বহিরাগত শিক্ষার্থী নিহত হলে জনসাধারণের মাঝেও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। ১২৫ জন শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করে সরকারি বাহিনী। কিন্তু তারপরও অন্তত ১০ হাজার শিক্ষার্থী ইরানের রাজপথে নেমে আসেন। স্বল্পতম সময়ের মধ্যেই ইরানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামি এবং সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি পুলিশি অভিযানের সমালোচনা করে বিবৃতি দিতে বাধ্য হন।

আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি পুলিশকে সংযমের পরামর্শ দেন। এমনকি তার ছবি কেউ যদি পুড়িয়েও ফেলে তবুও যেন সংযম দেখানো হয় তার নির্দেশ দেন।

এই আন্দোলনের ফলে এক দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আসে ইরানে। ১৯৭৯ সালে ইরানি বিপ্লবের পর ১৯৯৯ সালে আবারও দেশটির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন শিক্ষার্থীরা। ইরানের সাধারণ মানুষ সরকারি নানা বিধিনিষেধের মধ্য দিয়ে নীরবে জীবন অতিবাহিত করলেও দেশটির শিক্ষার্থীরা এখনো যে কোনো ইস্যুতে প্রতিবাদী অবস্থান নেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত