সৃষ্টিকুলে মানুষ যে শ্রেষ্ঠত্বের দাবি করে থাকে তার যৌক্তিকতা নিহিত মনুষ্যত্বের বিকাশে। কেবল মানুষরূপে জন্মগ্রহণ করলেই মনুষ্যত্বের দাবিদার হওয়া যায় না। মানুষ হয়ে উঠতে হয় চিন্তা ও কাজের মধ্য দিয়ে। মানুষের চিন্তা, মানুষের কাজের মধ্য দিয়েই সমাজ-সভ্যতার রূপান্তর ঘটে। উল্টো দিক থেকে দেখলে, একটা সমাজে বিদ্যমান নানা চিন্তা-চেতনায়, নানা কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে ওই সমাজের মানুষদের বাস্তবিক পরিচয় পাওয়া যায়। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, নৈতিকতার স্খলন আর মানবিকতার পতন আজ আমাদের এমন এক সময়ে হাজির করেছে যেখানে পিতা নিজ হাতে খুন করছে সন্তানকে, সন্তান নিজ হাতে খুন করছে মাতাপিতাকে! এই নৃশংসতা আজ এতটাই সর্বগ্রাসী হয়ে গেছে যে কোমলমতি শিশুরাও এই বর্বরতা থেকে রেহাই পাচ্ছে না। প্রতিদিনই শিশুদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন-নিপীড়নের পাশাপাশি দেশে একের পর এক নির্মম শিশু হত্যাকাণ্ড ঘটছে।
বুকে দুটো ছুরিবিদ্ধ পাঁচ বছরের শিশু তুহিনের ঝুলন্ত লাশের ছবিটা যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখেছেন; তাদের অনেকেরই হয়তো রাতে ঘুম হয়নি, অনেকেই চোখের জল ফেলেছেন, অনেকেই অব্যক্ত কান্নায় নিজের ভেতর নিজে দুমড়ে মুচড়ে গিয়েছেন। সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে নির্মম এই হত্যাকাণ্ডের শিকার তুহিন একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির ছাত্র ছিল। রবিবার রাতের আঁধারে ঘুমন্ত তুহিনকে ঘর থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয়েছে। পরদিন ভোরে বাড়ির পাশে একটি গাছের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় তুহিনের ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ সময় তার কান ও লিঙ্গ কাটা এবং পেটে দুটি বড় আকৃতির ছুরি গাঁথা অবস্থায় পাওয়া যায়। তুহিন রাজানগর ইউনিয়নের কেজাউড়া গ্রামের আব্দুল বাসিতের ছেলে। খবরের এটুকু পড়েই মেনে নেওয়া কঠিন। কিন্তু মানুষ যখন জানতে পারে যে, নিষ্পাপ তুহিনকে হত্যায় তারই পরিবারের সদস্যরা জড়িত বলে পুলিশ অনুমান করছে, তখন আর কোনোই সান্ত্বনা থাকে না। মানুষ আজ এতটাই অমানুষ হয়ে গেছে যে, পারিবারিক শত্রুতার জের ধরে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পারে! পরিবারের সদস্যদের হাতেই হোক বা অন্য কোনো দুর্বৃত্তের হাতে, এমন বর্বর হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া জরুরি।
যে শিশুরা এভাবে নির্যাতিত হচ্ছে তার কষ্ট কি আমরা অনুভব করতে পারি? যে মায়ের কোল খালি হচ্ছে, যে বাবার বুক খালি হচ্ছে তাদের বেদনার ভার কি আমরা উপলব্ধি করতে পারি? সেটা পারলে তো সমাজের এই নির্মম ব্যাধি সারাতে আজ সবারই সোচ্চার হওয়ার কথা। আমরা কি সেটা পারছি। সত্যটা আমাদের স্বীকার করতেই হবে, আমরা পারছি না। দেশে আইনকানুন আছে, আদালত-কাঠগড়া আছে; কিন্তু শিশু নির্যাতনের, শিশুদের ওপর নানারকম ভয়াবহ সহিংসতার অবসান হচ্ছে না কিছুতেই। কেবল দেশের আইনই নয়, জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ আছে। অথচ কোনো সনদই শিশুদের রক্ষা করতে পারছে না। রাষ্ট্র কিংবা রাষ্ট্রসংঘের ঘোষণা আর বিদ্যমান বাস্তবতার যে বিস্তর ফারাক তার এক প্রতীকী দৃষ্টান্ত বলা যেতে পারে তুহিন হত্যাকাণ্ডকে। কেননা, কাকতালীয় হয়ে থাকলেও এটাই সত্য যে, বিগত ৭ অক্টোবর থেকে দেশব্যাপী যখন ‘বিশ্ব শিশু দিবস ও শিশু অধিকার সপ্তাহ-২০১৯’ পালিত হচ্ছিল ঠিক সেই সপ্তাহান্তেই সুনামগঞ্জে শিশু তুহিনকে নৃশংসভাবে হত্যা করে গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়।
এবারের বিশ্ব শিশু দিবস ও শিশু অধিকার সপ্তাহের প্রতিপাদ্য ছিল ‘আজকের শিশু আনবে আলো, বিশ্বটাকে রাখবে ভালো’। যে শিশুদের বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, তারা কীভাবে আলো আনবে? কীভাবে বিশ্বটাকে ভালো রাখবে? দেশে শিশু অধিকারের ভয়াবহতার একটা চিত্র পাওয়া যাবে ‘বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম’-এর পরিসংখ্যান থেকে। বেসরকারি সংস্থাটির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০১৮ সালে সারা দেশে ৪ হাজার ৫৬৬টি শিশু বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার ৩৫৪টি শিশু অপমৃত্যুর শিকার হয়েছে এবং ৮১২ শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এরমধ্যে ২০১৮ সালে হত্যার শিকার হয়েছে ৪১৮টি শিশু, যা ২০১৭ সালে ছিল ৩৩৯টি। অর্থাৎ আগের বছরের তুলনায় শিশুহত্যা বেড়েছে ২৩ দশমিক ৩০ শতাংশ। হত্যার শিকার ৪১৮টি শিশুর মধ্যে ৮১টি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর নিহত অবস্থায় পাওয়া গেছে, ৫৩টি শিশু বাবা-মায়ের হাতে খুন হয়েছে, ৩১টি শিশুকে পিটিয়ে মারা হয়েছে এবং ৬টি শিশুকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
এই নির্মম বাস্তবতায় চোখ বুজে থাকলে কোনো সমাধান আসব না। শিশু নির্যাতন এবং শিশুহত্যা বন্ধে একদিকে যেমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি, অন্যদিকে তেমনি সমাজ থেকে এই বর্বরতা বন্ধে প্রয়োজন সামাজিক জাগরণ। এই নৃশংসতা বন্ধ করতে না পারলে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না। সমাজের বোধোদয় ঘটবে, শিশু হত্যার বিক্ষোভে আজ এই দেশ কেঁপে উঠবে, জেগে উঠবে, সেটাই কাম্য।
