বাংলাদেশ অধিনায়ক জামাল ভুঁইয়ার কথাগুলো এখনো কানে বাজছে। ম্যাচের আগে দৃঢ় কণ্ঠে জানিয়েছিলেন তারা ভারতের হৃদয় ভেঙে দিতে চান। যোগ করেছিলেন, ভারতকে হারালে দেশের ফুটবলে ঘটবে বড়সড় পরিবর্তন। কলকাতার সল্ট লেকের যুব ভারতী স্টেডিয়ামে আগের দিন বলা কথাগুলোই যেন প্রতিফলিত করছিল এক ঝাঁক লাল- সবুজ সৈনিক। র্যাংকিংয়ে ৮৩ ধাপ এগিয়ে থাকা প্রতিপক্ষের হৃদয় ভাঙার সবরকম আয়োজনই তারা করেছিলেন। কিন্তু নিয়তি বরাবরের মতো এবারও নিষ্ঠুর আচরণ করল বাংলাদেশের সঙ্গে। আগের দুবারের মতো এবারও শেষ মুহূর্তের গোল বাংলাদেশকে দিয়েছে একরাশ হতাশা। প্রতিপক্ষের মাঠে প্রায় ষাট হাজার ভারত সমর্থকের সামনে বুক চিতিয়ে খেলেও কাক্সিক্ষত জয় পায়নি বাংলাদেশ। ৮৮ মিনিটে গোল করে ম্যাচটা কোনোমতে ১-১ ড্র করে মান বাঁচিয়েছে ভারত।
এই ম্যাচে বাংলাদেশ জিততে পারত তিন-চার গোলের ব্যবধানে। কিন্তু ওই যে নিয়তির নিষ্ঠুরতা। বাংলাদেশকে ফের রেখেছে জয়শূন্য। ঠিক যেমনটা হয়েছিল ২০১৩-তে নেপালের কাঠমান্ডুতে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ আর ২০১৪-তে ভারতের গোয়ায় প্রীতি ম্যাচে। কাঠমান্ডুতে এক গোলের লিড নিয়ে বাংলাদেশ যখন উৎসবের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ম্যাচটা যখন শেষ বাঁশির অপেক্ষায়, সেই যোগ করা সময়ে সুনীল ছেত্রীর গোলে ভারত ১-১ করে। পরের বছর সেই সুনীল ছেত্রীরই যোগ করা সময়ের আরেকটি গোল কেড়ে নেয় বাংলাদেশের জয়। আর এবার ছেত্রীর জায়গাটা নিয়ে নিলেন ডিফেন্ডার আদিল খান। ৪২ মিনিটে সাদ উদ্দিনের গোলে এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশ ফের যখন জয়ের দ্বারপ্রান্তে, ঠিক তখনই কর্নার থেকে আদিলের হেড ভেঙে দেয় জামাল ভুঁইয়াদের জয়ের স্বপ্ন।
বিশ্বকাপ বাছাইয়ে বহুদিন জয় পায় না বাংলাদেশ। ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপের বাছাইয়ে খেলা ৮ ম্যাচে থাকতে হয়েছে জয়শূন্য। এবারও প্রথম দু’ম্যাচে আফগানিস্তান এবং কাতারের কাছে হারার পর কাল জিততে মরিয়া ছিল বাংলাদেশ। কিন্তু কখনো দুর্বল ফিনিশিং, কখনো ভারত গোলরক্ষক ও ডিফেন্ডারদের দৃঢ়তা, আবার কখনো সাইডবার বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলেই সব চেষ্টা বিফলে গেছে। প্রতিপক্ষের মাটি থেকে ১ পয়েন্ট নিয়ে ফেরার সান্ত¡নাই কেবল সঙ্গী হচ্ছে তাদের।
ম্যাচটা বাংলাদেশ খেলেছে ঠিক কাতার ম্যাচের কৌশলেই। অপরিবর্তিত একাদশ নিয়ে ৪-১-৪-১ ফরম্যাশনে প্রথমে নিজের ঘর সামলানো। এরপর প্রতি আক্রমণের সুযোগ লাগানোর চেষ্টা। অন্যদিকে হাই প্রেসিং ফুটবল খেলে ভারত চেয়েছে শুরুতেই বাংলাদেশকে ব্যাকফুটে ঠেলে দিতে। তারা আক্রমণ সাজিয়েছে দুই প্রান্ত ব্যবহার করে। কিন্তু ইয়াসিন খান, রিয়াদুল হাসান, রায়হান হাসান এবং রহমত মিয়াকে নিয়ে গড়া বাংলাদেশের রক্ষণ কোনো ছাড় দেয়নি প্রতিপক্ষকে। শুরুতেই বাংলাদেশ পেনাল্টি পেয়ে যেতে পারত। প্রথম মিনিটে বাম দিক দিয়ে বল নিয়ে দ্রুত ঢুকে পড়েছিলেন মোহাম্মদ ইব্রাহিম। তাকে বক্সে রাফ ট্যাকেল করেন ভারত ডিফেন্ডার আনাস এদাথোদিকা। যদিও রেফারির চোখ এড়িয়ে যায় তা। ৩২ মিনিটে প্রতি আক্রমণ থেকে ভারত ডিফেন্ডার আদিলের কাছ থেকে বল কেড়ে নিয়ে বিপলু আহমেদ ডানদিক দিয়ে বক্সে ঢুকে যে শট নেন তা কোনো মতে পা ছুঁয়ে রক্ষা করেন ভারত গোলরক্ষক গুরপ্রিত সিং। দু’মিনিট পর ভারতের ভালো একটি সুযোগ নস্যাৎ করে দেন বাংলাদেশ গোলরক্ষক রানা। রাহুল ভেকের লম্বা থ্রো-ইনে মানভির সিংয়ের ব্যাক হেড ফিস্ট করে কর্নার করেন রানা। ৩৭ মিনিটে রায়হান হাসানের লম্বা থ্রো-ইনে রিয়াদের হেড লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। ৪২ মিনিটে এগিয়ে যায় বাংলাদেশ। সেটা ভারতের আস্থার প্রতীক গোলরক্ষক গুরপ্রিতের ভুলেই। যেই গুরপ্রিত ঠিক আগের ম্যাচেই কাতারের ২৭টি প্রচেষ্টা ঠেকিয়ে নায়ক বনে গিয়েছিলেন সেই তিনিই বামপ্রান্ত থেকে জামাল ভুঁইয়ার লম্বা ফ্রি কিকে ফ্লাইট মিস করে বসেন। সুযোগে আনমার্কড সাদউদ্দিন দারুণ হেডে বল জালে জড়ান।
দ্বিতীয়ার্ধের ৫১ মিনিটে প্রতি আক্রমণ থেকে বিপলুর ডিফেন্স চেরা পাসে জীবনের বাঁ-পায়ের প্লেসিং গুরপ্রিত কোনোমতে কর্নারের বিনিময়ে রক্ষা করেন। ৫৫ মিনিটে ব্যবধান বাড়ানোর সেরা সুযোগ নষ্ট হয় বাংলাদেশের। প্রতি আক্রমণ থেকে বল পেয়ে বক্সের বাম কোনা থেকে ইব্রাহিমের জোরালো শট ক্রসবারে লেগে ফিরে এলে হতাশ হতে হয় বাংলাদেশকে। ৬০ মিনিটে এই ম্যাচে বাংলাদেশের সেরা পারফরমার ইব্রাহিম দারুণ এক গোললাইন সেভ করে দলের জাল সুরক্ষিত রাখেন। অনিরুধ থাপার কর্নারে আনাসের হেড ইব্রাহিম গোললাইন থেকে হেড করে কর্নার করেন। ৭৩ মিনিটে ফের গোলবঞ্চিত হয় বাংলাদেশ। এবারও প্রতি-আক্রমণ থেকে পাওয়া লম্বা বলে জীবন চেয়েছিলেন গুরপ্রিতের মাথার ওপর দিয়ে উড়িয়ে জালে পাঠাতে। কিন্তু আদিল খান গোললাইন থেকে তা ফিরিয়ে ভারতকে রক্ষা করেন। এই আদিল খানই ৮৮ মিনিটে ভারতকে সমতায় ফিরিয়েছেন সতীর্থের কর্নারে লক্ষ্যভেদী হেড করে।
ভারতের হৃদয় হয়তো পুরোপুরি ভাঙতে পারেনি বাংলাদেশ। বদলে দেওয়া জয়টাও হয়তো থেকেছে অধরা। তবে জামালরা এই ড্রয়ে অন্তত ভারতকে নিজেদের পরিবর্তনটা বুঝিয়ে দিয়েছে কড়ায়গন্ডায়।
বাংলাদেশ : আশরাফুল ইসলাম রানা, ইয়াসিন খান, রহমত মিয়া, রিয়াদুল হাসান, রায়হান হাসান (বিশ্বনাথ ঘোষ), জামাল ভুঁইয়া, সোহেল রানা, বিপলু আহমেদ, মোহাম্মদ ইব্রাহিম (রবিউল হাসান), সাদ উদ্দিন, নাবিব নেওয়াজ জীবন (মাহবুবুর রহমান সুফিল)।
ভারত : গুরপ্রিত সিং, রাহুল ভেকে, আদিল খান, অনিরুধ থাপা, আব্দুল সামাদ, সুনীল ছেত্রী, মানভির সিং, উদান্তা সিং, মান্দার রাও, মুহাম্মদ আশিক, আনাস এদাথোদিকা।
