গাজীপুরে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্তের জন্য সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত দুই তরুণের লাশ ২২ ঘণ্টা ধরে পড়ে ছিল। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে নিহতদের স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবরা গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে হাসপাতালে হামলা চালিয়ে এক চিকিৎসককে লাঞ্ছিত করেছে। এ সময় বিক্ষুব্ধরা আবাসিক মেডিকেল অফিসারের কক্ষ ও মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষের অফিসের জানালার কাচ ও ফুলের টব ভাঙচুর করে। হামলায় অংশ নেওয়া তিনজনকে আটক করে পুলিশে দিয়েছে মেডিকেল কলেজটির শিক্ষার্থীরা।
হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক প্রণয় ভূষণ দাস দেশ রূপান্তরকে জানান, গত সোমবার দুপুরে হাসপাতালের মর্গে দুটি মরদেহ আসে। বিষয়টি তিনি মঙ্গলবার সকালে জানতে পারেন। দুপুর ১২টার দিকে তিনি মরদেহ দুটির ময়নাতদন্তের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এ সময় ১৫-২০ যুবক একসঙ্গে তার কার্যালয়ে ঢুকে কর্তব্যরত চিকিৎসককে খুঁজতে থাকে। নিজেকে চিকিৎসক পরিচয় দিলে ওই যুবকরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাকে মারধর শুরু করে। হামলাকারীরা তার কার্যালয়ের টেবিল ভাঙচুর ও কাগজপত্র তছনছ করে। এ সময় অফিসসহায়ক জাহিদ বাধা দিলে তাকেও মারধর করা হয়।
প্রণয় ভূষণ আরও জানান, উত্তেজিত যুবকদের হাত থেকে রক্ষা পেতে তিনি দৌড়ে দ্বিতীয় তলায় অধ্যক্ষের অফিসে চলে যান। সেখানেও ওই যুবকরা গিয়ে তাকে লাঞ্ছিত করে এবং অধ্যক্ষের অফিসের জানালা ও ফুলের টব ভাঙচুর করে। পরে তিনি অন্য একটি কক্ষে ঢুকে দরজা বন্ধ করে রক্ষা পান।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, হাসপাতালে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনদের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে রোগীদের নিয়ে নিরাপদ দূরত্বে সরে যান। এ সময় রোগী ও স্বজনদের মাঝে ভীতিকর অবস্থার সৃষ্টি হয়।
এদিকে হাসপাতালের চিকিৎসককে লাঞ্ছিত এবং কলেজের আসবাবপত্র ভাঙচুরের খবর পেয়ে মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। তারা ধাওয়া দিয়ে তিন হামলাকারীকে আটক করেন। তারা হলো অন্তর (১৭), শান্ত (২০) ও রোহান (১৮)। খবর পেয়ে গাজীপুর সদর থানা পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে আসে। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ দ্রুত মরদেহ দুটির ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করে। এরপর স্বজনরা লাশ নিয়ে হাসপাতাল এলাকা ত্যাগ করলে পরিস্থিতি শান্ত হয়।
মর্গে দীর্ঘ সময় লাশ পড়ে থাকা নিহত সজীবের চাচা জাহিদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হামলার ঘটনার সঙ্গে আমাদের কোনো স্বজন জড়িত নয়। কারা হামলার সঙ্গে জড়িত তা আমরা জানি না। দুর্ঘটনায় সজীব নিহত হওয়ার পরপরই বেলা ৩টার দিকে লাশ মর্গে নেওয়া হয়। রাত ১০টা পর্যন্ত অপেক্ষা করার পরও লাশের ময়নাতদন্ত হয়নি। মর্গ থেকে আমাদের জানানো হয়, মঙ্গলবার সকালে লাশের ময়নাতদন্ত হবে। কিন্তু দুপুর প্রায় ১টা বাজলেও লাশের ময়নাতদন্ত হচ্ছিল না। এ নিয়ে উপস্থিত সবার মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। পরে সোয়া ১টার দিকে ডাক্তার এসে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করেন। আমরা লাশ নিয়ে বাড়ি ফিরে আসি।’
মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. আসাদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঘটনার পর বিকেলে হাসপাতালের চিকিৎসকসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে এ বিষয়ে মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পক্ষ থেকে মামলা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
সদর থানার ওসি মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘লাশের ময়নাতদন্ত করতে বিলম্ব হওয়ার অভিযোগে বিক্ষুব্ধ স্বজনরা হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. প্রণয় ভূষণ দাসের ওপর হামলা চালিয়েছে। তিন হামলাকারীকে মেডিকেল কলেজের ছাত্র, দায়িত্বরত আনসার সদস্য ও কর্মচারীরা মিলে আটক করেছে। এ বিষয়ে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ লিখিত অভিযোগ দিলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এর আগে গত সোমবার দুপুরে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ভোগড়া বাইপাস মোড়ে লরিচাপায় মোটসাইকেল আরোহী সজীব সরকার (১৭) এবং অনূর্ধ্ব-১৮ ক্রিকেট দলের গাজীপুরের অধিনায়ক জয়দেব নাথ (১৭) নিহত হয়। ওইদিন দুপুরে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠায়।
