চীন-আমেরিকা বাণিজ্যযুদ্ধের প্রভাবে আরেকটি বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা করছে বিভিন্ন দেশ। ইতিমধ্যে এর প্রভাব দেখা দিয়েছে। আর এ মন্দা থেকে নিজেদের অর্থনীতিকে সুরক্ষা দিতে বিভিন্ন দেশ করপোরেট করহার কমানো, স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়নসহ নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। দেরিতে হলেও বাংলাদেশও পদক্ষেপ নিচ্ছে। করহারে পরিবর্তন না আনলেও আয়ের প্রধান উৎস রপ্তানিতে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি ও রেমিট্যান্সে উৎসাহ জোগাতে টাকার অবমূল্যায়ন শুরু করেছে। যদিও অন্যান্য দেশের তুলনায় অবমূল্যায়নের হার খুবই কম।
তবে দেশের মোট রপ্তানির তুলনায় আমদানি বেশি হওয়ায় টাকা অবমূল্যায়নের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আমদানি ব্যয় বেশি হওয়ায় শিল্পে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। এতে দেশের মানুষের ব্যয় বেড়ে যাবে। মূল্যস্ফীতিও বাড়বে। এলসির পাশাপাশি দেশি কোম্পানির বিদেশি ঋণ পরিশোধের ব্যয়ও বাড়বে। তা সত্বেও গত কয়েক দিনে আন্তঃব্যাংক লেনদেনে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে শূন্য দশমিক ২৩ শতাংশে, যা প্রত্যাশার তুলনায় খুবই কম বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
টাকার অবমূল্যায়নের সুবিধা বেশি পাবে তৈরি পোশাক খাত। এখাতের শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ অনেক দিন ধরেই টাকার অবমূল্যায়নের দাবি জানিয়ে আসছে। সংগঠনটি বলছে, হয় টাকার অবমূল্যায়ন করতে হবে অথবা তাদের জন্য আলাদা বিনিময় হার চালু করতে হবে।
২০১৮-১৯ অর্থবছরের দেশের রপ্তানি আয় হয় ৪ হাজার ৫৩ কোটি ডলার। আর এ সময়ে প্রবাসী আয় আসে ১ হাজার ৬৪২ কোটি ডলার। ফলে রপ্তানি ও রেমিট্যান্স মিলিয়ে বিদেশি মুদ্রার আয় দাঁড়ায় ৫ হাজার ৬৯৫ কোটি ডলার। আর গত অর্থবছরে মোট আমদানির পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৯৯১ কোটি ডলার। ফলে ঘাটতি দাঁড়ায় ২৯৬ কোটি ডলার।
টাকার অবমূল্যায়ন হলে আমদানি ব্যয় বাড়বে, যার প্রভাব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর পড়বে। স্থানীয় শিল্পের পাশাপাশি রপ্তানিমুখী শিল্পের ব্যয়ও বাড়বে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পণ্য আমদানিতে যেসব এলসি খোলা হয়, তার মধ্যে ৩ হাজার ৩২ কোটি ডলার হচ্ছে শিল্পে যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানির জন্য, যা মোট আমদানির ৫২ দশমিক ৫ শতাংশ। এর বাইরে পেট্রোলিয়াম ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য আমদানির জন্য ৪১৬ কোটি ডলারের এলসি খোলা হয়। আর ভোক্তাপণ্য আমদানিতে ৬০২ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে। এছাড়া অন্যান্য খাতে প্রায় ১ হাজার কোটি ডলারের আমদানি হয়েছে।
বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী বিশে^র বিভিন্ন দেশ তাদের স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন করায় চাপের মুখে রয়েছে দেশের রপ্তানি খাত। দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোও টাকার অবমূল্যায়নের দাবি জানিয়ে আসছিল। এমন পরিস্থিতিতে মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের প্রক্রিয়া শুরু করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ডলারের জোগানে রাশ টানা হয়েছে। এ কারণে গত কয়েক দিনে আন্তঃব্যাংক লেনদেনে মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ৮৪ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ৮৪ টাকা ৭০ পয়সায় উন্নীত হয়েছে। যদিও ক্যাসিনো-কা-, স্থানীয় কোম্পানির বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপসহ বিভিন্ন কারণে কার্ব মার্কেটে এ হার ৮৬ টাকা ৬০ পয়সা
ছাড়িয়ে গেছে। তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুদ্রার মান, মূল্যস্ফীতি ইত্যাদি বিবেচনায় ডলারের প্রকৃত বিনিময় হার ৯০ থেকে ৯১ টাকা হওয়া উচিত বলে খোদ বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের রিয়াল ইফেক্টিভ এক্সচেঞ্জ রেটে উল্লেখ করেছে।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, পাশ্ববর্তী দেশ ভারত ২০০৮ সাল থেকে দফায় দফায় রুপির অবমূল্যায়ন করেছে। এ সময়ে মার্কিন ডলারের বিপরীতে দেশটির স্থানীয় মুদ্রা রুপির অবমূল্যায়ন হয়েছে প্রায় ৪৬ শতাংশ। একই সময়ে পাকিস্তানি রুপির অবমূল্যায়ন হয়েছে প্রায় ১০২ শতাংশ। আর এ সময়ে ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশের টাকার অবমূল্যায়ন ২৫ দশমিক ৭ শতাংশ। গত ১০ বছরে ভিয়েতনাম তার মুদ্রার অবমূল্যায়ন করেছে ৩২ শতাংশের বেশি। এছাড়া ইন্দোনেশিয়াসহ উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোও নিজেদের মুদ্রামান কমিয়েছে। ২০১৫ সালের পর ডলারের বিপরীতে ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ অবমূল্যায়ন হয়েছে ইউয়ানের।
এ বিষয়ে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বিশ্বব্যাংকের পরামর্শক ড. জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিনিময় হার ফ্লোটিং রেটে হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে আমরা সেটা দেখতে পাচ্ছি না। টাকার মান ধরে রাখতে বাজারে বড় অঙ্কের ডলারের জোগান দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তারা বিনিময় হার নির্ধারণ করে দিচ্ছে। যদিও তারা সেটি স্বীকার করে না। এতে করে গত এক বছরে টাকা ৫ শতাংশের বেশি অতিমূল্যায়িত হয়ে পড়েছে। যার কারণে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় পণ্যমূল্যে পিছিয়ে পড়ছে আমাদের রপ্তানিকারকরা। তিনি বলেন, ভিয়েতনামও বিনিময় হার নির্ধারণ করে দেয়। কিন্তু চাহিদা ও সরবরাহ বিবেচনায় তাদের বেঁধে দেওয়া হারের মুদ্রার মান ৩ শতাংশ আপ-ডাউন করতে পারে।
জাহিদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক টাকার মান ধরে রাখার বিষয়ে যুক্তি দেখায় যে, টাকার অবমূল্যায়ন হলে আমদানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির হার বাড়বে। কিন্তু আমাদের আমদানির বড় অংশই আসে চীন ও ভারত থেকে, যারা তাদের মুদ্রার অবমূল্যায়ন করেছে। এর ফলে সেসব দেশ থেকে আমদানি হলে খরচও কম হওয়ার কথা। বরং টাকার যৌক্তিক অবমূল্যায়ন হলে রপ্তানি আয় বাড়বে, প্রবাসীরাও সুফল পাবেন, বেশি করে রেমিট্যান্স পাঠাবেন। তাই বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত হবে কার্যকর বিনিময় হার নির্ধারণ করা।
গত ৩ মে থেকে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত ডলারের বিনিময় হার ৮৪ টাকা ৫০ পয়সায় আটকে ছিল, যা গত ৬ অক্টোবর থেকে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে।
২০০৮ সালে ডলারের বিনিময় হার ছিল ৬৭ টাকা ৩৪ পয়সা, যা ২০১২ সালে ৮১ টাকা ৬৪ পয়সায় উন্নীত হয়। এরপর টাকা শক্তিশালী হওয়ায় ডলারের বিনিময় হার ২০১৫ সালে কমে ৭৬ টাকা ৫১ পয়সায় নেমে দাঁড়ায়। এরপর থেকেই ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন ধীরে হতে থাকে। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে ডলারের বিনিময় হার ছিল ৭৮ টাকা ৭০ পয়সা, ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে ৮২ টাকা ৯০ পয়সায় উন্নীত হয়। আর চলতি বছরের জানুয়ারিতে ডলারের বিনিময় হার ৮৩ টাকা ৯৫ পয়সায় দাঁড়ায়।
চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে টাকার মান ধরে রাখতে বাজারে ৮ কোটি ৯০ লাখ ডলার ছাড়ে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে চলতি মাসে ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত ৩ কোটি ডলার বাজারে ছাড়া হয়। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে গড়ে প্রতি মাসে ১৯ কোটি ৫০ লাখ ডলার জোগান দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। টাকার মান ধরে রাখতে গত অর্থবছরে মোট ২৩৪ কোটি ডলার জোগান দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, চলতি প্রথম প্রান্তিকে রপ্তানি আয় কমার পর থেকে ব্যাংকগুলো ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমাতে অনুরোধ জানাচ্ছে। যদিও ৭ অক্টোবর টাকার অবমূল্যায়নের প্রয়োজন নেই বলে জানিয়েছিলেন গভর্নর ফজলে কবির।
